ছিন্ন-মূল

ছিন্ন-মূল

ব্লগ/BLOG
Spread the love


পশ্চিমবঙ্গের পালাবদলের গত দুই সপ্তাহে তৃণমূল কংগ্রেসের যে ছবিটা জনমানসে ভেসে উঠছে, তা আক্ষরিক অর্থে নজিরবিহীন। যে দলে এখনও ৮০ জন বিধায়ক, রাজ্যের সিংহভাগ পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং জেলা পরিষদ রয়েছে, এমনকি রাজ্য থেকে নির্বাচিত লোকসভার ৪২ জনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ যাদের হাতে, সেই তৃণমূল কংগ্রেস রাতারাতি যেন গর্তে সেঁধিয়ে গিয়েছে।

পাড়ায় পাড়ায় দাপুটে নেতা-কর্মীরা হয় গা-ঢাকা দিয়েছেন, নয়তো লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছেন। ভোটের লড়াইয়ে হারজিত গণতন্ত্রের অঙ্গ, কিন্তু হারের পর এমন আকস্মিক ও সর্বাত্মক নিষ্ক্রিয়তা কখনও সংগঠিত রাজনৈতিক দলের লক্ষণ হতে পারে না। তৃণমূলের এই দশাকে ‘মুষলপর্ব’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন অনেকে। দলের অন্দরে ও বাইরে এখন প্রশ্ন উঠছে- ২৮ বছরের পুরোনো তৃণমূলের মূল চালিকাশক্তি তাহলে কী ছিল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার একমাত্র অ্যাজেন্ডা নিয়ে দলটির জন্ম হয়েছিল। ২০১১ সালে সেই লক্ষ্য পূর্ণ হওয়ার পর গত ১৫ বছর তৃণমূল সরকার টিকে ছিল শুধুমাত্র দান, খয়রাতি, ভাতা, অনুদান এবং পুলিশ-প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে। এই সময়ে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা তো বটেই, পাড়ায় পাড়ায় যে নব্য তৃণমূলিদের উত্থান হয়েছিল, তাঁদের বেশিরভাগের সম্পত্তি ফুলেফেঁপে কলাগাছ হয়েছে।

নবান্নের মসনদ হাতছাড়া হতেই তৃণমূলের যাবতীয় ক্ষমতার দম্ভ ঝরা পাতার মতো ঝরে পড়েছে। যাতে তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে। দলের গায়ে লজ্জার কালি লাগিয়েছেন ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র এলাকার এই বিধানসভায় পুনর্নির্বাচনের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে জাহাঙ্গির আচমকা সরে দাঁড়িয়েছেন।

এই সেই প্রার্থী, যিনি ভোটের মুখে নিজেকে ‘পুষ্পা’ চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করে দাপট দেখিয়েছিলেন। তাঁর আকস্মিক পলায়ন দলের কর্মীদের মনোবলকে তলানিতে ঠেকিয়েছে। ফলতা আসনটি অভিষেক গড়ের অন্তর্গত হওয়া সত্ত্বেও প্রচারপর্বে তিনি একবারের জন্যও যাননি। সেনাপতি যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকেন, সেখানে সাধারণ সৈন্যদের মনোবল ভাঙা তো অবধারিত।

রাজনীতিতে পরাজয়ের পর ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস নতুন নয়। গত বিধানসভা নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস শূন্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের এভাবে গর্তে লুকিয়ে পড়তে দেখা যায়নি। শাসকের দাপটের মধ্যেও তারা যেটুকু গণতান্ত্রিক পরিসর পেয়েছে, তার মধ্যে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছিল। রাজপথে আন্দোলন জারি রেখেছিল। ফলস্বরূপ এবার বিধানসভা ভোটে খাতা খুলতে পেরেছে।

কিন্তু তৃণমূল বিপর্যয়ের মুখে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদাকেই কালিমালিপ্ত করছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ভোট চুরি বা ভোট পরবর্তী হিংসার তত্ত্ব খাড়া করে দায় এড়াতে চাইছে। কিন্তু তৃণমূলের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া গভীর ক্ষত নিয়ে দলনেত্রী এখনও পর্যালোচনা করতে রাজি নন। তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরা তো বটেই, দলের বেশ কিছু বিধায়ক প্রশ্ন তুলছেন দলের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে।

বেশিরভাগের নিশানা অভিষেক এবং আইপ্যাক। ১৯৯৮ থেকে মাঠে-ময়দানে রাজনীতি করে উঠে আসা নেতাদের সরিয়ে আইপ্যাক এবং অভিষেকের কর্পোরেট মডেলে দল চালানোকে বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। এখন দলনেত্রীর কড়া নির্দেশ সত্ত্বেও দলের ভেতরের কোন্দল থামছে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভার্চুয়ালি বার্তা দিচ্ছেন, বৈঠকে বসছেন ঠিকই। কিন্তু রাস্তায় বেরোচ্ছেন না।

বিরোধী আসনে বসে তৃণমূল যেন আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। কোথায় ভুল হয়েছিল, কী কী ত্রুটিবিচ্যুতি হয়েছিল তা স্বীকার করে জনাদেশ মেনে ফের রাস্তায় না নামলে কি আর প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা যায়? মানুষের রায়কে অবজ্ঞা এবং অগ্রাহ্য করে গণতন্ত্রে টিকে থাকা যায় না। অহংকার ও দম্ভ ঝেড়ে ফেলে সত্যিটা স্বীকার না করলে, তৃণমূলের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

The put up ছিন্ন-মূল appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *