তরাই-ডুয়ার্সের চা শ্রমিক সমাজের দ্রুত বদলে যাওয়া জীবিকার প্রকৃত মাঠসমীক্ষা।
কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য
বাংলা তথা হিমালয়ের পাহাড়তলির সেই স্বপ্নময় ও নস্টালজিক চা বাগানগুলোতে এখন যথেষ্ট দুর্যোগই, আর্থসামাজিক ও কর্পোরেট সংকটের ঘনঘটা এবং কালোমেঘ। চা বাগানের নতুন যুগের আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে, যার ফলে বাগানগুলো এখন প্রায় কিশোর ও তরুণহীন। ওরা বাইরে গিয়ে কী করছে আমরা দেখছি না, কিন্তু চোখের সামনে চা বাগানের আদিবাসীরা পাথর ও বালি খাদানের হোলটাইমার শ্রমিক হয়ে যাবে, এটা ঠিক সহ্য করা কঠিন। অথচ অত্যন্ত নির্মম হলেও ঠিক এই ঘটনাটিই আজ আমাদের দেখতে হচ্ছে। নদী লাগোয়া আদিবাসী চা শ্রমিক পরিবারের অনেকেই এখন পাথরশ্রমিক হয়ে যাচ্ছে।
যদিও সার ও নানা কীটনাশক তরলের কবলে পড়ে চা বাগানের কাজ পুরোপুরি স্বাস্থ্যকর নেই, তবু তরাই ও ডুয়ার্সের চা বাগানের কাজে সবুজ ও অক্সিজেনের একটা প্রভাবশালী ছদ্মবেশ আছে। সবুজ সুরময়ী চা গাছ, তার পাতা, কুড়ি ও বাগানের ছায়াগাছগুলোর একটা অদ্ভুত সম্মোহন আছে। সেই সবুজ ও শ্যামলিমার জাদুতে সব দুঃখ যেন ঘুচে যায়। না হলে দীর্ঘ দেড়শো বছর পার হলেও এই শিল্পক্ষেত্রটিতে মোটামুটি একটি পরিবেশবান্ধব পরিস্থিতি কোনওমতে টিকে থাকত না।
কিন্তু সংকোশ থেকে মেচি অবধি নদী লাগোয়া বাগানগুলোর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য খাতে বইছে। এই খাতটি নদীখাত এবং তা এক সাংঘাতিক পাথর ও বালিখাত। সংকোশ থেকে শুরু করে রায়ডাক, কালজানি, তোর্ষা, ডিমডিমা, মূর্তি, তিস্তা, মহানন্দা, বালাসন ও মানঝা প্রভৃতি নদীর উপকূলে যেসব চা বাগান আছে, সেখানকার আদিবাসী বা নেপালিভাষী চা শ্রমিক পরিবারের বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চায়ের কাজের পাশাপাশি, এমনকি চায়ের কাজ পুরোপুরি ত্যাগ করে নদীতে বালি ও পাথর উত্তোলনের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। উত্তরবঙ্গজুড়ে পাথর, বালি বা বেড মেটিরিয়ালের রাক্ষুসে বাজারই এর প্রধান কারণ। শিলিগুড়ির কাছে খাপরাইল সেনাছাউনির পাশে বালাসন নদীর উপকূলে মাটিগাড়া ব্লকের সওয়াশো বছরের প্রাচীন পুটিনবাড়ি চা বাগানে ঘটমান এই পেশান্তরের ঘটনাটি বিস্ময়কর। এই ঘটনা সরেজমিনে দেখে এবং পুটিনবাড়ি বাগানে কয়েকদিন ধরে হাউস টু হাউস সমীক্ষা করে এই লেখকের বিষাদ বেড়েছে কি না না বলা গেলেও অভিজ্ঞতা অনেক বেড়েছে।
২০২২ সালে এই প্রতিবেদকের সমীক্ষা অনুযায়ী এই চা বাগানে বসবাসকারী মোট পরিবারের সংখ্যা ১৫৭। এদের মধ্যে ওরাওঁরাই সর্বাধিক, প্রায় ৮৫টি পরিবার। এছাড়া আছেন মুন্ডা, পাইক, মালপাহাড়িয়া, লোহার ও খাড়িয়া প্রভৃতি অন্যান্য ঝাড়খণ্ডি সম্প্রদায়ের মানুষ। মজার বিষয় হচ্ছে এদের মধ্যে মাত্র ২৪টি পরিবার এখন শুধুমাত্র চা বাগানের কাজের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ পুটিনবাড়িতে চা আর প্রধান জীবিকা নয়, তা এখন বহু পরিবারের আংশিক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। বাকি ১৩৩টি পরিবার আংশিক চায়ের কাজে যুক্ত থেকে চা বাগানের বাইরে অন্য কাজ করে দিন গুজরান করেন। আসলে উত্তরবঙ্গজুড়ে বহু ছোট ছোট গ্রামগঞ্জ শহর বা আধাশহর হচ্ছে আর সেখানকার ম্যানুয়াল লেবার মার্কেট প্রসারিত হচ্ছে। বাগানে ২৫০ টাকা মজুরির বিপরীতে বাইরে উপার্জন বেশি হওয়ায় নদীও এখন এক বড় শ্রমবাজার।
পুটিনবাড়িতে বয়স্ক, শিশু, ছাত্রছাত্রী ও অসুস্থ বাদে মোট জনসংখ্যার ৪৭.১৬ শতাংশ অর্থাৎ ৬৫৮ জন কর্মী উপার্জন করেন। এই কর্মীদের মধ্যে ২৪৬ জন বালাসন নদীতে বালি ও পাথর শ্রমিকের কাজ করেন, যার অনুপাত মোট শ্রমশক্তির ৩৭.৩৮ শতাংশ, যা নেহাত কম নয়। কর্মীদের ৩৯০ জন চা বাগানের কাজে এখনও যুক্ত আছেন, ১২ জন চাকরি এবং ১০ জন বাগানের বাইরে অন্যান্য কাজ করেন। চা বাগানের কাজে যেখানে ২৫০ টাকা দৈনিক মজুরি, সেখানে বাগান লাগোয়া বালাসন নদী থেকে বালি ও পাথর উত্তোলনের কাজে দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা রোজগার করা যায়। একজন আদিবাসী কিশোর ট্র্যাক্টর ড্রাইভারের কাজ করে প্রতি ট্রিপে ২০০ টাকা হিসেবে দিনে ১০০০ টাকা রোজগার করে। বাগানের চারটি বা পাঁচটি বাচ্চা বাচ্চা আদিবাসী ছেলে এরকম বালি ও পাথরের ট্র্যাক্টর চালায়।
দুবরাজ লোহার অবসরপ্রাপ্ত চা শ্রমিক। তিনি তাঁর সেভেন ও এইট পাশ দুই ছেলে ত্রিনাথ ও অবিনাশকে নিয়ে রোজ নদীতে পাথর শ্রমিকের কাজ করতে যান। এরকম আরেক অবসরপ্রাপ্ত মহিলা চা শ্রমিক হলেন ৬৫ বছরের প্রবীণা পরদেশি মুন্ডা। তিনিও তাঁর দুই ছেলে ২৬ বছরের অমিত ও ২০ বছরের রোহনকে নিয়ে রোজ পাথর তুলতে নদীতে যান। অমিত ক্লাস টেন পাশ। এরকম ৪৯ বছরের তারসিউস ওরাওঁ, ৩০ বছরের তরুণ বাবলু মুন্ডা এবং এইট পাশ দুই ভাই উত্তম ও সুনীল মুন্ডা এখন পুরোপুরিই পাথর শ্রমিক হয়ে গিয়েছেন। পুটিনবাড়ি চা বাগানে অনেক সিনিয়ার পাথর শ্রমিক আছেন, যাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন ৫০ বছরের রোশনবাবু। জাতিতে ওরাওঁ এই মানুষটি অন্তত ২০ বছর ধরে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, কুয়াশা ও শীতে বালাসনের পাথর ও বালি তুলছেন। বেশ বয়স্ক সিলবানুস ওরাওঁ ১৫ বছর ধরে পাথর শ্রমিক। সবাই বলা যায় নদীতে হোলটাইমার। এঁদের মনের ভেতরটা দেখতে না পেলেও মুখে তো পাথর ও বালির অমলিন হাসি লেগে থাকে। আমন মালপাহাড়িয়া ও উমা মালপাহাড়িয়াও ৫ থেকে ৭ বছর নদীর জীবনে আছেন। উমার বয়স ২৮ বছর, তিনি এক তরুণী গৃহবধূ এবং ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করে গত ৫ বছর ধরে এই কাজ করছেন। সম্প্রতি বালি ও পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও এই লেখা তৈরির সময় খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে বালাসন নদীজুড়েই লুকিয়ে চুরিয়ে এই বালি কাণ্ড ও পাথর কাণ্ড চলছেই।
পুটিনবাড়ি চা বাগানে ১৫৭টি পরিবারে মোট জনসংখ্যা ১৩৯৫ এবং তারা সবাই আদিবাসী। মজার বিষয় হচ্ছে এঁদের মধ্যে ৬৫.৭৪ শতাংশই সাক্ষর এবং কমবেশি লেখাপড়া করেছেন। এঁদের মধ্যে ১৩ জনের পড়াশোনা এইট থেকে টুয়েলভ ক্লাস পর্যন্ত। পুটিনবাড়িতে ৬ বছর অবধি বয়সের শিশু আছে মাত্র ৮৮ জন, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ। এই অনুপাতটি জেলার শিশু অনুপাতের চাইতে বেশ কম।
এখন প্রশ্ন হল, চা বাগানে যে কীটনাশক বিষ ছেটানো হয়, সম্ভবত তার চাইতেও ভয়াবহ নদীর বেড থেকে তোলা বালি ও পাথরের সূক্ষ্ম ধূলিকণা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি কোনও সাধারণ জীবাণু বা ব্যাকটিরিয়া নয়, বরং অত্যন্ত বিষাক্ত এবং অতিক্ষুদ্র খনিজ ক্রিস্টালাইন সিলিকা কণা। দীর্ঘশ্বাস বা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে এই কণা শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। এই সিলিকা ডাস্ট মানুষের চুলের চাইতেও ১০০ গুণ ছোট হতে পারে, যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছায় এবং সেখানে জমা হতে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, সিলিকা কণা ফুসফুসে প্রবেশ করার পর তা আর বের হতে পারে না। এর ফলে ফুসফুসের ভেতরের কোষগুলো শক্ত বা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় এবং ফুসফুসের অক্সিজেন শোষণ করার ক্ষমতা কমে যায়। এর থেকে পরবর্তীকালে শরীরে টিবি বা সিওপিডির মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। একসময় উত্তরবঙ্গের চা বাগান ছিল এই অঞ্চলের শ্রমজীবনের পরিচয়। আজ বেশি আয়ের আশায় তরুণরা সবুজ ছেড়ে ধূসর নদীতে নামছে, কিন্তু বিনিময়ে তারা বয়ে আনছে এক অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। সবুজ বাগান থেকে বালাসনের এই যাত্রা কেবল পেশা বদলের গল্প নয়, বরং উত্তরবঙ্গের এক বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের দলিল। যা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। অত্যন্ত হতাশাজনক।
(লেখক সামাজিক-নৃতত্ত্বের গবেষক)

