চরম অবক্ষয়

চরম অবক্ষয়

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে পালাবদলের পর দলবদলের হিড়িক আদতে নীতি ও মতাদর্শের চরম অবক্ষয়ের নগ্নরূপ। তৃণমূলের রাজ্যসভার তিন প্রাক্তন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিকবড়াইক আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হাত থেকে তাঁদের পদ্মপতাকা নেওয়ার দৃশ্যটি নিছক একটি দল থেকে অপর দলে নাম লেখানো নয়, বরং রাজনীতিতে সুবিধাবাদী প্রবণতার জীবন্ত দলিল।

একদা যাঁরা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদধন্য বলে পরিচিত ছিলেন, বাংলার মসনদে পরিবর্তনের পর তাঁরা জার্সি বদল করলেন। দুর্নীতি নিয়ে কঠোর ভাষায় তাঁরা নিশানা করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। অথচ আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন তৃণমূল জেলা সভাপতি প্রকাশ চিকবড়াইকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে পদ্ম শিবিরে সাদরে বরণ করা হয়েছে এবং রাজ্যসভা উপনির্বাচনে প্রার্থীও।

এতে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে বিজেপির অন্দরেও। কারণ, রাজ্যজয়ের পর শমীক ঘোষণা করেছিলেন, বিজেপির তৃণমূলিকরণ হবে না। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তৃণমূলের দুর্নীতি এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন। সেই তৃণমূলের কালিমালিপ্ত নেতাদের বিজেপিতে ঠাঁই নেই। তবে ‘ভালো তৃণমূল’-এর জন্য দরজা খোলা বলে ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন।

সুখেন্দু, সুস্মিতাদের দলে নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভালো তৃণমূলের জন্য দলের দরজা খুলতে চলেছে। ‘প্রত্যেকেরই একটা অতীত থাকে’ মন্তব্য করে শমীকের যুক্তিজালে স্পষ্ট, নীতি-আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে, নিখাদ সুবিধাবাদের জয়গান গাইবে পদ্ম শিবির। এও মেনে নিলেন, ক্ষমতা বিস্তার করতে আদর্শের চেয়ে সংখ্যাতত্ত্ব অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এখন গেরুয়া শিবিরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে পৌঁছোতে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ভাঙিয়ে একের পর এক সাংসদকে নিজেদের দিকে টানছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব। এই প্রক্রিয়া নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে বিজেপির রাজনৈতিক সততা এবং এতদিনের ঘোষিত অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।

ভারতীয় রাজনীতিতে ‘আয়ারাম গয়ারাম’ সংস্কৃতির ইতিহাস দীর্ঘ। তবে তা উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে বেশি দেখা যেত। এখন সেই ব্যাধি বাংলায় শিকড় গেড়েছে। সম্প্রতি আপের রাঘব চাড্ডা সহ একাধিক সাংসদের বিজেপিতে যোগদান প্রমাণ করে যে, এই সুবিধাবাদের ব্যাধি কেবল পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। আমজনতার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, এই সমস্ত রাজনৈতিক ডিগবাজির মূলে রয়েছে নিখাদ ব্যক্তিগত স্বার্থ, সংসদীয় পদ রক্ষা এবং ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার আকুল বাসনা।

এই রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ভারতের তথা পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে ক্রমাগত কলুষিত ও মূল্যহীন করে তুলছে। সাধারণ ভোটাররা যে নির্দিষ্ট দল, প্রতীক এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর আস্থা রেখে তাঁদের বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিলেন- আমজনতার সেই রায় ও বিশ্বাসকে এভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো শুধু অনৈতিক নয়, বরং চরম অপরাধ। এতে ভোটাধিকারের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সুস্থ নীতি, সুস্থ বিতর্ক ও আদর্শের স্থান দখল করেছে ক্ষমতার নগ্ন লোভ এবং দলবদলের খেলা। প্রথমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬০ জন তৃণমূল বিধায়কের বিদ্রোহ এবং নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করে ক্ষমতার সমান্তরাল অক্ষ তৈরির চেষ্টা, তারপর লোকসভার ২০ জন সাংসদের এনডিএ-তে মিশে যাওয়ার কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং সবশেষে তিন প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদের পদ্ম শিবিরে নতুন ইনিংস শুরু- সব মিলিয়ে চরম নীতিহীনতা ও আদর্শহীনতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে।

দলীয় আনুগত্য এখন কাচের মতো ভঙ্গুর এবং ক্ষমতার হাওয়া যেদিকে বয়, নেতাদের আনুগত্যের পাল সেদিকেই ঘোরে। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামীদিনে সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের বীতশ্রদ্ধা ও অনাস্থা আরও তীব্র হবে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *