গুরুদায়িত্ব কাঁধে এক আধুনিক ‘হ্যামলেট’

গুরুদায়িত্ব কাঁধে এক আধুনিক ‘হ্যামলেট’

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


অনমিত্র বিশ্বাস

গান্ধিজি তাঁর সাড়ম্বর বৈরাগ্যের আবহে একদা ঘোষণা করেছিলেন, ‘জওহরলালই আমার উত্তরাধিকারী।’ কিন্তু এই উত্তরাধিকার বা যৌবরাজ্য লাভের পথ নেহরুর জন্য খুব একটা মসৃণ ছিল না; বরং এই উচ্চাসনে বসার জন্য তাঁকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল নিজের অনেক মৌলিক আদর্শ ও যুক্তিবাদের কঠিন জমি। নেহরুর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মতামত মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে সবক্ষেত্রে হুবহু মেলেনি— এমনকি যখন তিনি জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির পদে আসীন ছিলেন, তখনও তাঁদের চিন্তার সমান্তরাল রেখাগুলো এক বিন্দুতে মেলেনি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিচারণায় এই দ্বন্দ্বের এক নিখুঁত বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। সুভাষের মতে, নেহরুর সামনে তখন স্পষ্টত দুটি পথ খোলা ছিল। প্রথমত, নিজের সমস্ত যুক্তিচেতনা বিসর্জন দিয়ে পুরোপুরি ‘গান্ধি উইং’-এর একজন অনুগত ও অন্ধ সদস্যে পরিণত হওয়া; অথবা স্পষ্ট ভাষায় গান্ধির তথাকথিত খামখেয়ালিপনার বিরোধিতা করা। নেহরু এর কোনওটিই বেছে নেননি। তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছিলেন। যতদূর সম্ভব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার যে স্বভাবনিহিত গণতান্ত্রিক নমনীয়তা তিনি প্রদর্শন করেছিলেন, তা অনেক সময় ব্যবহারিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক অনন্য মহিমা লাভ করেছিল। তবে এই অন্তর্নিহিত দোটানাই পরবর্তীকালে তাঁর শাসনকাল ও ব্যক্তিগত ইমেজের ওপর গভীর ছায়া ফেলেছিল।

সুভাষ-নেহরু সংঘাত ও ইতিহাসের এক অলঙ্ঘনীয় স্ববিরোধ

জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরুর সম্পর্ক এক বিশাল ও জটিল অধ্যায়। সুভাষচন্দ্র যখন কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তখন গান্ধিজি তাঁকে একপ্রকার ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করেছিলেন। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে নেহরুর মধ্যস্থতার সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। পরিণতিতে সুভাষকে বেছে নিতে হয়েছিল অজ্ঞাতবাসের অনিশ্চিত পথ। এরপর মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে সারথি করে তিনি যখন ‘আধমরা’ ভারতীয় রাষ্ট্রকে আঘাতের পর আঘাতে জাগিয়ে তোলার সংকল্পে স্বদেশের দিকে ধেয়ে আসছেন, তখন ১৯৪৩ সালে কলকাতার এক জনসভায় নেহরুর কণ্ঠে ঝরে পড়েছিল কঠোর প্রতিরোধ। নেহরু ঘোষণা করেছিলেন, তিনি তাঁর শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও সুভাষকে রুখে দেবেন। স্বাধীন ভারতের প্রেক্ষাপটে সুভাষকে নিয়ে তাঁর এই প্রাক্তন সহকর্মীর আচরণ ছিল প্রবলভাবে স্ববিরোধী। কমনওয়েলথ বা ডমিনিয়নের প্রতি দায়বদ্ধতার দোহাই দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের একজন সৈনিককেও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। যদিও পেনশনের ব্যবস্থার জন্য নেহরু ব্যক্তিগতভাবে কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাস্তবে খুব সামান্যই ফলপ্রসূ হয়েছিল। এমনকি ১৯৬১ সাল পর্যন্ত নেহরুকে জনসমক্ষে এটি স্পষ্ট করতে হয়েছিল যে, সরকারি কোনও কার্যালয়ে সুভাষের প্রতিকৃতি রাখা আইনত অপরাধ বা বেআইনি কিছু নয়।

শাহনওয়াজ কমিটি ও ষড়যন্ত্রের মেঘপুঞ্জ

১৯৫৬ সালে সুভাষচন্দ্রের রহস্যময় অন্তর্ধানের কিনারা করতে অথবা এই বিষয়ে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক কী হবে তা নির্ধারণ করতে শাহনওয়াজ কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটির ধুলোমাখা পুরোনো ফাইলের স্তূপ থেকে একটি চাঞ্চল্যকর চিঠির হদিস পাওয়া যায়। আজাদ হিন্দ ফৌজের এক প্রাক্তন সৈনিক তাঁর প্রাক্তন সেনানায়ক শাহনওয়াজ খাঁ-কে এই চিঠিটি লিখেছিলেন। চিঠির সারমর্ম ছিল প্রবল আবেগ ও অসংলগ্ন কিছু প্রশ্নের সমাহার। যেমন— ‘আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে নেতাজি, আমাদের প্রিয় নেতাজি, অমন সামান্য একটা কারণে মারা যেতে পারেন?’ সেই সৈনিকের লেখায় সুদূরপরাহত কনস্পিরেসি থিওরির পাশাপাশি নেহরুর বিরুদ্ধে এক ধরনের বিষোদ্গার ছিল। ইঙ্গিত এমনও ছিল যে, নেতাজির নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে নেহরুর হাত থাকা অসম্ভব নয়। পরিশেষে তাঁর আকুল অনুরোধ ছিল, এই চিঠিটি যেন চূড়ান্ত রিপোর্টে স্থান পায়। কিন্তু বেচারা সৈনিক জানতেন না যে, লালকেল্লার ঐতিহাসিক বিচারপর্ব থেকে জীবিতাবস্থায় বের হওয়ার পরেই শাহনওয়াজ খাঁ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এরপর থেকে তিনি একনিষ্ঠ গান্ধিবাদী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করবেন। আজাদ হিন্দের সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়কে তিনি পরিত্যক্ত পাদুকার মতো পেছনে ফেলে এসেছিলেন। ফলে সেই আবেগি চিঠিটিকে তৎক্ষণাৎ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার একাধিক যুক্তি ছিল। চিঠিতে কমিটির অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় কোনও প্রামাণ্য তথ্য ছিল না, ছিল কেবল এক বিশ্বস্ত সৈনিকের আক্ষেপ। অথচ সেই তুচ্ছ চিঠির সূত্র ধরেও নেহরুকে কোনওদিন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি।

আদর্শগত দ্বিধা ও একনায়কতন্ত্রের ভয়াল ছায়া

নেহরু স্বাধীনতার প্রথম ‘চৌকিদার’ হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেই সময়ে একজন সাধারণ নাগরিক কোনও জোরালো প্রমাণ ছাড়াই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলার সাহস পেতেন— এই গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির জন্য নেহরুকে কিছুটা বাহবা দিতেই হয়। এমনকি অভিযোগগুলো যদি সত্যিও হয়, তবুও তাঁর এই প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতা ছিল অনন্য। বলা হয়, মহম্মদ বিন তুঘলক নাকি আইন করেছিলেন যে প্রজারা ইচ্ছা করলে সুলতানের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এই সুযোগে অনেকেই মামলা করে জয়ী হত, কারণ অভিযোগকারী হেরে গেলে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। নেহরুর ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তাই। দক্ষিণে ও বামে— উভয়পক্ষই নেহরুকে তাঁদের রাজনৈতিক ন্যারেশনে ‘খলনায়ক’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে মূলত তাঁরই দেওয়া প্রশ্রয়ে। তবে নেহরুর এই অতি-ঔদার্য ভারতবর্ষের ক্ষতি করেনি, এমনটা বলা কঠিন। ১৯৫২ সালের নির্বাচনে তড়িঘড়ি করে সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগ না করে যদি সুভাষ-প্রকল্পিত ‘কন্ট্রোলড প্লেবিসিট’ বা নিয়ন্ত্রিত জনমতের পথ অনুসরণ করা হত, তবে ১৮ শতাংশ সাক্ষরতার এই দেশটির হয়তো দীর্ঘমেয়াদি উপকার হত। মুসলিম লিগকে পুনরায় ভারতীয় নির্বাচনে লড়তে দেওয়া, কাশ্মীরের সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাকে ৩৭০ ধারা দিয়ে সুরক্ষিত করা কিংবা চিন ও পাকিস্তানের রণলিপ্সুতার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা— এমন অনেক দায়ভারই নেহরুর কাঁধে আজও চাপানো হয়। এর অধিকাংশের উৎস ছিল অন্যের চোখে নিজেকে মহৎ প্রতিপন্ন করার এক নিরন্তর চেষ্টা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, নেহরু যদি সেই ধাতের না হতেন এবং একজন কঠোর ডিক্টেটরের মতো আচরণ করতেন, তবে কি তা ভারতের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক হত? মহৎ একনায়কতন্ত্রও অনেক সময় পরবর্তীকালের কোনও কুৎসিত স্বৈরাচারের পূর্বসূরি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রেনকোজি মন্দির এবং অমীমাংসিত ইতিহাসের উপসংহার

নেহরুর প্রধান ত্রুটি ছিল ঔদার্য এবং প্রতিক্রিয়ার মধ্যবর্তী এক গভীর সংশয়। তিনি ছিলেন অনেকটা বুদ্ধের সমসাময়িক বিম্বিসারের মতো, যিনি পুত্র অজাতশত্রুর বিদ্রোহের মুখে বুদ্ধের পরামর্শ মেনে তাকে কঠোর দণ্ড দিতে পারেননি, আবার সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে তার উচ্চাশাও প্রশমিত করতে পারেননি। নেহরুও সারাজীবন ডেনমার্কের সেই রাজপুত্র হ্যামলেটের মতো এক দোটানায় ভুগেছেন— যার কাঁধে পিতৃঋণের গুরুদায়িত্ব কিন্তু মনে চিরন্তন প্রশ্ন, ‘টু বি অর নট টু বি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকদের ভূমিকা নিয়ে তিনি কখনও সুভাষের মতো স্পষ্ট হতে পারেননি। সুভাষ বলেছিলেন, ভারতীয় সৈনিকরা মরতে হলে স্বাধীনতার যুদ্ধে মরবে; অন্যদিকে সাভারকার ও শ্যামাপ্রসাদ চেয়েছিলেন বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে থেকে অস্ত্রচালনা শিখে নিতে। নেহরু এর কোনওটিই জোর গলায় বলতে পারেননি। ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রতি তাঁর ঘৃণা ছিল রোমান্টিক ইংলিশ মূল্যবোধে জারিত, আবার ব্রিটিশ শৃঙ্খলের বিনিময়ে তিনি জিন্নাহর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কৌশল শিখতেও রাজি ছিলেন না। মণিপুরের জঙ্গলে যখন আজাদ হিন্দ সৈনিকরা ক্ষুধা ও ম্যালেরিয়ায় ধুঁকছিল, তখন তাঁদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে বিশ্বাসঘাতকতার প্ররোচনা দেওয়া লিফলেট ফেলার পেছনেও নেহরুর এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সায় ছিল। স্বাধীনতার পর মাউন্টব্যাটনকে দিয়ে আজাদ হিন্দ স্মৃতিসৌধে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ানো ছিল তাঁর এক প্রকার অদ্ভুত প্রায়শ্চিত্ত। অথচ সুভাষের মৃত্যুসংবাদে তিনি ‘দুঃখিত’ ও ‘নিশ্চিন্ত’— এই দুই বিপরীতধর্মী অনুভূতির কথা স্বীকার করেছিলেন। এক গুরুর দুই শিষ্য, অনেকটা ভীম-দুর্যোধন বা স্ট্যালিন-ট্রটস্কির মতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। নেহরু হয়তো চেয়েছিলেন সুভাষের সদ্গতি ঘটুক বীরের মতো, যাতে তাঁকে নিজের হাতে কোনও বিসদৃশ কাজে লিপ্ত হতে না হয়।

(লেখক আইআইটি ভিলাই-এ অঙ্কের গবেষক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *