গুন্ডাদমন ও বাস্তবতা

গুন্ডাদমন ও বাস্তবতা

শিক্ষা
Spread the love


সমাজবিরোধী দমনে বিধানসভায় একটি বিল এনেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনে অনুমোদিতও হয়ে গিয়েছে। বিলটি এতটাই কঠোর যে আইন প্রণীত হলে সমাজবিরোধী বা আইনভঙ্গকারীদের কাছে যথেষ্ট ভীতিপ্রদ হওয়ার সম্ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গ নিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী নিয়ন্ত্রণ বিলটি অনুমোদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে বিতর্কও উত্থাপিত হয়েছে। কারণ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে অসাধু এবং ক্ষমতালিপ্সু প্রশাসকের হাতে আইনটির অপপ্রয়োগের যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে, যা সমাজের পক্ষে মোটেও মঙ্গলদায়ক হবে না।

এই বিলে গুন্ডা বা সমাজবিরোধী বলতে তাঁকেই চিহ্নিত করা হয়েছে, যিনি একা বা কোনও সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে নিয়মিত তোলাবাজি, জমি দখল, বেআইনি খনি বা বালি খাদান চালানো কিংবা অস্ত্র বা মাদক পাচার করে থাকেন এবং সমাজে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেন। এই আইনের বলে সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে কোনও বিচার ছাড়াই সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে।

জেলা শাসক বা পুলিশ কমিশনার চাইলে কোনও চিহ্নিত অপরাধীকে নির্দিষ্ট জেলা বা এলাকা থেকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করতে পারবেন। তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলামের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায় করাও যেতে পারে। এমনকি গুরুতর সমাজবিরোধী হিসেবে চিহ্নিতরা নিজেদের পছন্দমতো বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন না। এই আইনের অধীনে সমস্ত অপরাধ হবে জামিন অযোগ্য।

বিলটি বিধানসভায় পেশ হওয়ার অব্যবহিত পরেই যে প্রশ্নটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে, তা হল, এই বিলের প্রয়োজনীয়তা কেন হল? রাজ্য সরকারের যুক্তি, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সমাজবিরোধী এবং অপরাধীরা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকছিল না। অতএব, একটি কঠোর আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

সরকারের যুক্তি স্বীকার করে নিলেও বলা যায়, ভারতীয় দণ্ড সংহিতায় বর্তমানে একাধিক এমন আইন রয়েছে যা সমাজবিরোধী বা অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সক্ষম। কাজেই নতুন আইন প্রবর্তনের তেমন কোনও কারণ দেখা যাচ্ছে না। বরং এই আইন প্রবর্তিত হলে সমাজবিরোধী দমনে কতখানি কার্যকরী হবে, তা এখনই না বোঝা গেলেও সমাজে এই আইন যে ভীতি এবং শঙ্কার পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে, সেকথা অনায়াসে বলা যায়।

ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা প্রতিটি নাগরিককে বেঁচে থাকার এবং স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। বিনা বিচারে এক বছর আটকে রাখার মতো কঠোর নিয়ম মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে। পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, সেই একই অভিযোগ এই আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগের সময়ে উঠতে পারে।

বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, আন্দোলনকারী বা ছাত্র নেতাদের বিরুদ্ধে এই আইন ব্যবহার করা হতে পারে। ফলে রাজ্যের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আহত হওয়ার শঙ্কা থাকবে। যে কোনও অভিযুক্তের নিজের পছন্দের আইনজীবী পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই বিলে সে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়, এই আইনের বলে স্বেচ্ছাচারী এবং উদ্ধত পুলিশ এবং প্রশাসনিক আধিকারিকরা সংবিধান বহির্ভূত ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারেন। তার ফলে যে কোনও সাধারণ মানুষ এই আইনের অপব্যবহারের শিকার হতে পারেন। আইনের শাসনের অর্থ, প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার সুনিশ্চিত করা। কিন্তু যদি আইন সেই অধিকারকেই লঙ্ঘন করে, তাহলে ভবিষ্যতে তা অপশাসনে পরিণত হয়। তার ফল সরকারের পক্ষে ভালো হয় না।

গণতন্ত্রের মূল শর্ত সরকার এবং বিরোধী সমালোচকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতার সেতু রচিত হওয়া। সেই সেতু যদি ভঙ্গুর হতে থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। সদ্য গঠিত রাজ্য সরকারের এই কথাটি মাথায় রাখা দরকার।

The publish গুন্ডাদমন ও বাস্তবতা appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *