দীপংকর হালদার
বাঙালি বরাবরই এক অদ্ভুত আত্মশ্লাঘায় ভুগতে ভালোবাসে। ‘হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে…’ গোছের সেই শতাব্দীপ্রাচীন প্রবাদটি আউড়ে আমরা আজও অবচেতনভাবে মনে করি, পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব ভারতে আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। ওডিশা বলতে আমাদের চোখে ভাসে শুধু দিঘা-পুরীর সমুদ্র সৈকত আর জগন্নাথ মন্দির। আর অসম মানে তো কেবল কামাখ্যা আর কাজিরাঙ্গার জঙ্গল। একসময় এই দুই রাজ্যের মানুষকে আমরা সস্তায় শ্রমিকের জোগানদার হিসেবেই দেখে এসেছি। কিন্তু আভিজাত্যের সেই ঠুলিটা এবার চোখ থেকে খুলে ফেলার সময় এসেছে। কারণ, যে প্রতিবেশীদের আমরা এতদিন কিছুটা করুণা বা তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখে এসেছি, নীরবে এবং নিঃশব্দে তারাই আজ অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে বাংলাকে শুধু টেক্কা দেওয়াই নয়, রীতিমতো গোল দিচ্ছে। মাথাপিছু আয় থেকে শুরু করে কলকারখানার বৃদ্ধি- সব দিক থেকেই বাংলা আজ পূর্ব ভারতের এক ক্লান্ত এবং পিছিয়ে পড়া রাজ্য।
কোনও রাজ্যের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী, তা শুধু তার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের আকার বা জিএসডিপি দিয়ে মাপা যায় না। কারণ, যে রাজ্যের জনসংখ্যা বেশি, তার অর্থনীতির আকার স্বাভাবিকভাবেই বড় হবে। আক্ষরিক অর্থে বাংলার জিএসডিপি এখনও অসমের প্রায় তিনগুণ এবং ওডিশার দ্বিগুণ। কিন্তু এই সুবিশাল আকারের আড়ালে যে চরম স্থবিরতা লুকিয়ে আছে, তা প্রকট হয়ে যায় যখন আমরা ‘মাথাপিছু আয়’ বা পার ক্যাপিটা ইনকামের দিকে তাকাই। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিমাপের এই আসল সূচকেই বাংলার কঙ্কালসার চেহারাটা আজ সর্বসমক্ষে উন্মোচিত।
পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের সাম্প্রতিকতম ডেটা অন্তত সেই রূঢ় বাস্তবই তুলে ধরছে। ২০১১-’১২ সালের দিকেও মাথাপিছু আয়ের নিরিখে অসম বা ওডিশার চেয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেইসময় বাংলার মাথাপিছু আয় ছিল ৫১,৫৪৩ টাকা। যেখানে ওডিশা ছিল ৪৮,৩৮৭ এবং অসম ছিল মাত্র ৪১,১৪২ টাকায়। কিন্তু গত এক দশকে এই ছবিটা আমূল বদলে গিয়েছে। ২০২৪-’২৫ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ওডিশার মাথাপিছু আয় রকেটের গতিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬,২২৪ টাকায়! অসমও এক বিশাল লাফ দিয়ে পৌঁছে গেছে ৮৫,৯৮৮ টাকায়। আর বাংলা? ধিকিধিকি এগিয়ে বাংলার মাথাপিছু আয় ঠেকেছে মাত্র ৮২,৭৮১ টাকায়। অর্থাৎ, যে রাজ্যগুলোর দিকে আমরা উন্নাসিক দৃষ্টিতে তাকাতাম, আজ তাদের সাধারণ মানুষের গড় আয় একজন বাঙালির চেয়ে অনেকটাই বেশি। অসম এবং ওডিশা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কম বেস থেকে শুরু করেও যদি সরকারের নীতি এবং সদিচ্ছা সঠিক থাকে, তবে দুরন্ত গতিতে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
মাথাপিছু আয়ের এই উলটপুরাণ কোনও জাদুমন্ত্রে ঘটেনি, এর নেপথ্যে রয়েছে ধারাবাহিক শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঠিক গতিপথ। গত এক দশকে অসম এবং ওডিশা বারবার বাংলার চেয়ে বেশি হারে আর্থিক বৃদ্ধি নথিবদ্ধ করেছে। ২০১৫-’১৬, ২০২২-’২৩ এবং ২০২৩-’২৪ সালে অসম জোড়া অঙ্কের আর্থিক বৃদ্ধি দেখেছে। ওডিশার বৃদ্ধির গ্রাফে ওঠানামা থাকলেও, করোনা অতিমারির ধাক্কা সামলে ২০২১-’২২ সালে তারা ১৬.৪ শতাংশের এক বিস্ময়কর বাউন্স-ব্যাক করে। সেখানে বাংলার পারফরমেন্স অত্যন্ত ম্যাড়ম্যাড়ে। অতিমারির পর একবার ঘুরে দাঁড়ালেও, বর্তমানে রাজ্যের আর্থিক বৃদ্ধি মূলত জাতীয় গড়ের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, নিজস্ব কোনও চমক দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির এই ফারাকটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে শিল্পের পরিসংখ্যানে। বাংলা যখন শিল্পায়নের স্বপ্ন ভুলে কেবল অনুদান আর খয়রাতির রাজনীতিতে মশগুল, তখন পড়শি রাজ্যগুলো নিঃশব্দে শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ অর্থবর্ষের মধ্যে অসমে কারখানার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ! এটি সর্বভারতীয় গড়ের (১৩ শতাংশ) চেয়ে বহুগুণ বেশি। অন্যদিকে, খনি এবং মেটালভিত্তিক শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ টেনে ওডিশা তাদের কারখানার উৎপাদন মূল্য বাড়িয়েছে অভাবনীয় ২৯৮ শতাংশ! আর এই একই সময়ে বাংলায় কারখানার সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ১১ শতাংশের সামান্য নীচে, যা জাতীয় গড়ের চেয়েও কম। যদিও কারখানার মোট উৎপাদনের অঙ্কে বাংলা এখনও ওডিশা বা অসমের চেয়ে এগিয়ে (গত দশকে যা দ্বিগুণ হয়েছে), কিন্তু বৃদ্ধির হার বা মোমেন্টামের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট যে, বাংলার শিল্পক্ষেত্র কার্যত তার সমস্ত ধার হারিয়ে ফেলেছে।
পড়শি রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলার এই আকাশপাতাল ফারাকটা আরও মর্মান্তিকভাবে ফুটে উঠেছে সদ্য প্রকাশিত নীতি আয়োগের ‘ফিসক্যাল হেলথ ইনডেক্স ২০২৫’ বা রাজকোষ স্বাস্থ্য সূচকের রিপোর্টে। দেশের ১৮টি প্রধান রাজ্যের ওপর হওয়া এই সমীক্ষায় ভারতের রাজ্যগুলোর অর্থনীতির আসল স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। আর সেই রিপোর্ট কার্ড বাংলার বর্তমান সরকারের জন্য শুধু লজ্জাজনকই নয়, ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত। অরবিন্দ পানাগারিয়ার নেতৃত্বে প্রকাশিত এই রিপোর্টে ফিসক্যাল হেলথে বা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলায় দেশের মধ্যে এক নম্বর বা শীর্ষস্থান দখল করেছে ওডিশা (স্কোর ৬৭.৮)। ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাট, এমনকি ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যও প্রথম পাঁচে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিয়েছে। ওডিশা আজ দেশের কাছে এক আদর্শ মডেল। তাদের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ, ঋণের স্থায়িত্ব এবং পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ দেশের মধ্যে সেরা।
আর এই তালিকার একেবারে তলানিতে, অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা রাজ্যগুলোর ক্যাটিগোরিতে জায়গা পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। সঙ্গী হিসেবে রয়েছে ঋণে জর্জরিত পঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরল। নীতি আয়োগ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, বাংলার মূল সমস্যা হল একদিকে তাদের নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের চরম ব্যর্থতা, আর অন্যদিকে ঋণের পাহাড়। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হল ব্যয়ের গুণমান বা ‘কোয়ালিটি অফ এক্সপেন্ডিচার’। ওডিশা বা অসম যেখানে তাদের বাজেটের একটা বড় অংশ খরচ করছে রাস্তা, ব্রিজ, হাসপাতাল বা শিল্পের পরিকাঠামো তৈরিতে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান এবং আয় বাড়ায়; সেখানে বাংলা মেতে আছে অনুৎপাদক খাতে দেদার খরচে। পরিকাঠামো তৈরির বদলে ধার করে অনুদান বিলির এই সস্তা পপুলিজমই বাংলার অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার এই অর্থনৈতিক অধঃপতনের কারণ লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সর্বগ্রাসী ভোটব্যাংককেন্দ্রিক অর্থনীতির মডেলে। ওডিশা বা অসম সরকার প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য সস্তা হাততালির চেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সংস্কার অনেক বেশি জরুরি। বাংলায় শিল্পের জন্য জমির অভাব, কাটমানি সংস্কৃতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং সর্বোপরি শিল্পপতিদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন বিরূপ মনোভাব- এই নেতিবাচক ইকো সিস্টেম রাজ্যের অর্থনৈতিক কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে। ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট’-এর চোখধাঁধানো মঞ্চ থেকে লাখো কোটি টাকার বিনিয়োগের যে ফানুস ওড়ানো হয়, তা যে আদতে কতটা ফাঁপা, তা নীতি আয়োগ এবং মোসপি-র এই রূঢ় রিপোর্টগুলোই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বাঙালির এই আত্মতুষ্টির ঘুম না ভাঙলে আগামীদিন আরও অন্ধকার। ওডিশা বা অসমের এই উত্থান কোনও সাময়িক ঘটনা নয়; এটি ধারাবাহিক আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দূরদর্শী নীতির ফসল। বাংলার নীতিনির্ধারকদের এটা বুঝতে হবে যে, মানুষের পকেটে মাসের শেষে কিছু নগদ টাকা গুঁজে দিয়ে হয়তো সাময়িক ভোট কেনা যায়, কিন্তু রাজ্যের অর্থনীতিকে চিরকাল ভেন্টিলেশনে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। আজ বাংলার যে তরুণরা কাজের খোঁজে বেঙ্গালুরু, পুনে বা হায়দরাবাদ ছুটছেন, খুব দ্রুতই তাঁদের হয়তো কাজের তাগিদে ভুবনেশ্বর বা গুয়াহাটির ট্রেন ধরতে হবে। সময় থাকতে পরিকাঠামো এবং শিল্পে জোর না দিলে এবং ঋণের মায়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি না করলে, অচিরেই বাংলা পরিণত হবে পূর্ব ভারতের এক স্থায়ী বৃদ্ধাশ্রমে।
(লেখক অর্থনীতিবিদ)
