দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবসময়ই সংবেদনশীল বিষয়। হিসেবের বাইরে নানাবিধ অদৃশ্য সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল এই সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষের বিস্মৃত হওয়া কঠিন। বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের সহযোগিতা পেয়েছে, ইতিহাস তার সাক্ষী।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্ধ ভারত বিরোধিতার কারণে সেই সম্পর্কে প্রবল বিদ্বেষের কুয়াশা তৈরি করেছে। তারেক রহমানের জমানায় সেই কুয়াশা কাটবে কি না, তা সময় বলবে। তবে ভারত তারেকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলায় আগ্রহী, ব্রিকস সম্মেলন এবং দ্বিপাক্ষিক সফরে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোয় তা স্পষ্ট। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্ক এখন নজিরবিহীন ও জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে সেদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ কূটনৈতিক মহল্লায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ঢাকা সফর এই টানাপোড়েন ও পর্দার পিছনের কূটনীতিকে আরও স্পষ্ট করেছে। হাসিনা সরকারের পতন এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণ পদ্মাপারে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশের ফেরত চাওয়ার দাবি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জট এখন। নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে হাসিনার অডিও ভাষণ এতে নতুন করে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিকে ব্যবহার করে হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রচার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার নামান্তর।
তিক্ততা এবং অবিশ্বাসের এই বাতাবরণে ভারত সরকারের নতুন পদক্ষেপ সুচিন্তিত এবং বাস্তবমুখী কূটনৈতিক কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। তারেককে ভারতে আসার আমন্ত্রণ বা ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে যোগদানের বার্তা সেই বাস্তববাদী নীতির প্রকাশ। ভারতের বিদেশমন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, এই আহ্বানের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বা সাম্প্রতিক অডিওবার্তার কোনও সম্পর্ক নেই।
এর মূল উদ্দেশ্য হল আঞ্চলিক স্থায়িত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। বাংলাদেশে বিএনপির প্রভাবকে মাথায় রেখে নয়াদিল্লি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যোগাযোগের পথ সুগম করতে চাইছে। অন্যদিকে, ‘র’ প্রধানের বাংলাদেশ সফরের নেপথ্যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড যেন ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হতে পারে- সেটি নিশ্চিত করা নয়াদিল্লির মূল অগ্রাধিকার।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এখন তিনটি ভিন্ন মাত্রা। প্রথমত, ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বৃদ্ধি, হাসিনাকে কেন্দ্র করে টানাপোড়েন ও ভিন্নমুখী অবস্থান কূটনৈতিক সম্পর্কে দৃশ্যমান শৈত্য এনে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অচলাবস্থা থাকলেও দুই দেশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। খাদ্যপণ্য আমদানি, বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং ট্রানজিট ইত্যাদি বন্ধ করা কোনও পক্ষের জন্য সহজ নয়।
তৃতীয়ত, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে দুই দেশ একে অপরের পরিপূরক। প্রতিবেশী বদলানো যায় না- যা কূটনীতির চিরন্তন সত্য। আবেগে ভেসে বা সাময়িক রাজনৈতিক লাভের জন্য দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক সম্পর্কে স্থায়ী ফাটল ধরালে উভয় দেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। দু’দেশেরই উচিত, বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ, যা নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না।
অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি না করে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে জটিলতা নিরসনের পথে পা বাড়ানো উচিত বাংলাদেশেরও। তারেককে ভারতের আমন্ত্রণ প্রমাণ করে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পথ এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি। পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখে এক টেবিলে বসে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরির ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ার অনাগত দিনের স্থিতিশীলতা।

