মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিকে কেন্দ্র করে নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) মধ্যে ব্যাপক অশান্তি শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের স্বৈরাচারী মনোভাব মেনে নিতে নারাজ ন্যাটোর অন্য শরিকরা। গ্রিনল্যান্ড এব্যাপারে নিজেদের কঠোর মনোভাব ইতিমধ্যে আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছে। সামরিক তৎপরতাও শুরু করেছে দেশটি। গ্রিনল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়েছে ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, বেলজিয়াম সহ ইউরোপের নানা দেশ। ইউরোপীয় সেনারা ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছাতে শুরু করেছেন।
সম্প্রতি মার্কিন ডেল্টা ফোর্স রাতের অন্ধকারে তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় হানা দিয়ে সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাসের প্রাসাদ থেকে অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গিয়েছিল। মাদক-সন্ত্রাসের অভিযোগে ইতিমধ্যে তাঁদের বিচারও শুরু হয়েছে মার্কিন আদালতে। এমনিতে ইজরায়েলকে সঙ্গী করে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা বহুদিন ধরে খবরদারি চালিয়ে আসছে।
এখন আবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজর পড়েছে খনিজসমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ডে। কয়েক শতাব্দী ধরে গ্রিনল্যান্ড শাসন করছে ডেনমার্ক। ১৯৭৯ সাল থেকে স্বশাসিত হলেও গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ডেনমার্কের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসেন। সেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমেরিকার নজর পড়ায় এখন শুধু ন্যাটো নয়, ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবের নিন্দায় সোচ্চার হয়েছে সারা বিশ্ব।
রোজ যিনি দেশে দেশে যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেন, নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করেন, সেই ট্রাম্পের একের পর এক দেশে দাদাগিরি চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বজুড়ে। প্রতিবাদে এই মুহূর্তে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ন্যাটো ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে।
কয়েকদিন আগে হোয়াইট হাউসে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের দুই বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বিদেশসচিব মার্কো রুবিও এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। দুই বিদেশমন্ত্রী হাজার চেষ্টা করেও রুবিও এবং ভ্যান্সকে গ্রিনল্যান্ড দখলের মার্কিন পরিকল্পনা থেকে টলাতে পারেননি। বৈঠক পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে বৈঠকের কিছুক্ষণ আগে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস ফ্রেডেরিক নিলসেন কার্যত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনকে পাশে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি আমেরিকা এবং ডেনমার্কের মধ্যে কোনও একটি দেশকে বেছে নিতে বলা হয়, আমি সবসময় ডেনমার্ককে বেছে নেব।’
এত সবের পরেও ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রশ্নে অনড় আছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাফ কথা, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার দরকার। তাঁর এই একগুঁয়েমি মনোভাবে অবশ্য ট্রাম্পকে ন্যাটো সামরিক জোটে একঘরে করে দিয়েছে। ন্যাটোর জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল। ১২টি দেশ মিলে গঠন করেছিল ন্যাটো।
ঠান্ডা যুদ্ধ যতদিন চলেছে, ততদিন ন্যাটো ছিল সোভিয়েত রিপাবলিকের নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ চুক্তির প্রধান প্রতিপক্ষ। সোভিয়েতের পতনের পর ন্যাটো পূর্ব ইউরোপের বহু দেশকে জোটের সদস্য করে নেয়। প্রধানত রুশ আগ্রাসন থেকে রক্ষা এবং ইউরোপ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ইউরোপীয় দেশগুলির সামরিক জোটের প্রয়োজন অনুভব করেছিল তারা। সেই চাহিদা মিটিয়েছে ন্যাটো।
আজ গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে আসরে নেমে পড়েছে ইউরোপের বহু রাষ্ট্র। ট্রাম্পের যুক্তি, রাশিয়া এবং চিন অনেক আগে থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা এঁটেছে। এই অবস্থায় আমেরিকা হস্তক্ষেপ না করলে রুশ ও চিনা কবজায় গ্রিনল্যান্ডের চলে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওই অভিযোগ অবশ্য ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে মস্কো ও বেজিং।
আমেরিকা নতুন করে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহী। কিন্তু ট্রাম্পের ভূমিকায় সকলে হতাশ। কয়েক মাস আগে ন্যাটোর বিরাট আর্থিক দায়ভারের সিংহভাগ বহনে অক্ষমতা জানিয়ে ট্রাম্প সামরিক জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন। আজ সেই জোটে নিজেই কোণঠাসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
