দেশে হিমবাহ হ্রদগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরিতে সফল ইসরোর অধীন ‘ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার’। সংস্থা সিকিমকে দিয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হিমবাহ-হ্রদ প্রোফাইলিং প্রযুক্তি প্যাকেজ ‘সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং’। এদিকে দেশের ৬০টি হ্রদে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের।
চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ মধুসূদন কর্মকার বলেন, “ভারতের উপগ্রহগুলো এখন হ্রদ শনাক্ত করতে এবং বড় আকারের হ্রদের পরিমাপ নিয়মিতভাবে নিতে সক্ষম। উপগ্রহের মাধ্যমে দেখা সম্ভব হচ্ছে কোনও হ্রদের আয়তন বেড়েছে কি না। রাডারের সাহায্যে পাহাড়ের ঢালের নড়াচড়াও শনাক্ত করা যাচ্ছে।”
আরও পড়ুন:
নজরদারি বাড়াতে দেশের হিমবাহ হ্রদগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করেছে ইসরো-র অধীন ‘ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার’। মূলত ২০১৬-২০১৭ সালের উচ্চ-রেজোলিউশনযুক্ত উপগ্রহ চিত্র ব্যবহার করে হিমালয় সংলগ্ন নদী অববাহিকাগুলোতে অন্তত ০.২৫ হেক্টর আয়তনের ২৮ হাজার ৪৩টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত এবং মানচিত্রভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৭০টি হ্রদ ভারতের ভেতরে এবং ২০ হাজার ৪৭৩টি হ্রদ সীমান্ত এলাকায় রয়েছে। গবেষকদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতের ভিতরে থাকা হ্রদগুলোর বিন্যাস অসম। চিহ্নিত হ্রদগুলোর মধ্যে লাদাখে রয়েছে ৩ হাজার ২১৯টি, অরুণাচল প্রদেশে ২ হাজার ১৮৮টি, সিকিমে ৭৩৩টি, জম্মু ও কাশ্মীরে ৫৪৬টি, হিমাচল প্রদেশে ৫৩৭টি এবং উত্তরাখণ্ডে ৩৪৭টি। ১৯৮৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চিহ্নিত হ্রদগুলোর মধ্যে ১০ হেক্টরের চেয়ে বড় আয়তনের ২ হাজার ৪৩১টি হ্রদের তথ্য সংগ্রহ করেছে ইসরো।
দেখা গিয়েছে, ১৯৮৪ সালের পর থেকে ৬৭৬টি হ্রদের আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হিমবাহ গলা জলে আয়তনে বেড়ে যাওয়া এই হ্রদগুলোর মধ্যে ১৩০টি ভারতে রয়েছে। এগুলো রীতিমতো বিপজ্জনক। ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর রাতে সিকিমের দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয়ের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নেমে আইআইটি ভুবনেশ্বরের বিশেষজ্ঞ অসীম সাত্তারের নেতৃত্বে একদল গবেষক জেনেছেন ওই বিপর্যয় প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পড়ার সাধারণ ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। প্রায় ১৪.৭ মিলিয়ন ঘনমিটার হিমবাহ ধসে দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদে পড়েছিল। এর ফলে প্রায় ২০ মিটার উঁচু সুনামির মতো ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। সেই ঢেউ হ্রদের সামনের দিকের বাঁধের উপর আছড়ে পড়ে ভেঙে দেয়। হ্রদ থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনমিটার জল বেরিয়ে আসে। সেই জলস্রোত নিচের দিকে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি ও মাটি নিয়ে নামে। সেটা তিস্তা দিয়ে প্রবাহিত হয়। আইআইটি ভুবনেশ্বরের গবেষণায় ধরা পড়েছে লোনার্ক হ্রদের কিছু অংশ কয়েক বছর থেকে সরে আসছিল।
কার্যত দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয়ের পর ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি ১৯৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের তালিকা তৈরি করে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার অরুণাচল প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম এবং উত্তরাখণ্ডের জন্য ১৫০ কোটি টাকার ‘জাতীয় হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয়ের জেরে হড়পা বানের ঝুঁকি প্রতিরোধ কর্মসূচি’ অনুমোদন করে। সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের ৪৭টি বাঁধ চিহ্নিত করে যেগুলো দেশের ভিতরের হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয়ের জেরে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এদিকে বিপর্যয় এড়াতে চলতি বছরের জুন মাসে ‘সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং’ সিকিমকে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হিমবাহ হ্রদ প্রোফাইলিং প্রযুক্তি প্যাকেজ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে উঁচু এলাকার হ্রদের গভীরতা মাপা এবং ত্রিমাত্রিক আয়তনের প্রোফাইলিংয়ের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় জলযান। এর আগে মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ এবং সিকিমের ৩০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাটি অন্তত ৬০টি হ্রদের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করার নির্দেশ দেয়। সেই কাজ চলছে।
সিকিমের বিপজ্জনক হ্রদ নিয়ে গবেষণারত ভূগোলের গবেষক তথা চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ মধুসূদন কর্মকার বলেন, “ভারতের উপগ্রহগুলো এখন হ্রদ শনাক্ত করতে এবং বড় আকারের হ্রদের পরিমাপ নিয়মিতভাবে নিতে সক্ষম। উপগ্রহের মাধ্যমে দেখা সম্ভব হচ্ছে কোনও হ্রদের আয়তন বেড়েছে কি না। রাডারের সাহায্যে পাহাড়ের ঢালের নড়াচড়াও শনাক্ত করা যাচ্ছে। ক্ষেত্র সমীক্ষায় দলগুলো হ্রদের গভীরতা মাপতে পারছে। কিন্তু বিপদের কারণ হয়েছে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং হিমবাহ ধস।” তিনি জানান, গবেষকরা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেন না কোনও হিমবাহ হ্রদ ঠিক কবে বা কখন ভেঙে পড়বে। এটি হলো ক্রমাগত এমন সব পরিবর্তনের খোঁজ করা যেটা বেড়ে চলা বিপদের ইঙ্গিত দিতে পারে মাত্র। তাই সতর্কতা একমাত্র আত্মরক্ষার উপায়।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
