কণ্ঠে শাস্ত্র, গানে হৃদয়ের অনুরণন

শিক্ষা
Spread the love


সুরের আকাশে কিছু কণ্ঠ থাকে, যাদের উপস্থিতি সময়ের সীমানা মানে না। মান্না দে তেমনই এক শিল্পী। শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন অনুশীলনকে তিনি মিলিয়েছিলেন জনপ্রিয় গানের সহজ আবেদনে; তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিষাদ, হাসি আর স্মৃতি পেয়েছে আলাদা ভাষা। কিন্তু গানের বাইরেও ছিলেন এক সংবেদনশীল মানুষ, নিজের কাজ নিয়ে সংশয়ী, শেখার প্রতি নিবেদিত, সহশিল্পীর প্রতিভায় অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাশীল। জীবনদর্শন, সাধনা ও অসংখ্য শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে জড়িয়ে থাকা তাঁর গান আজও ফিরিয়ে আনে হারানো সময়ের আলো, আর মনে করায়, সত্যিকারের শিল্পী কখনও ফুরিয়ে যান না। প্রয়াণদিবসের পরদিন আজকের উত্তর সম্পাদকীয়তে তাঁকে নিয়ে জোড়া প্রতিবেদন।

শেখর কর

গানের প্রসঙ্গ উঠলেই ‘স্বর্ণযুগের গান’ কথাটি ফিরে আসে। সেই সময়ের সংগীতের নস্টালজিয়া থেকে আমরা সহজে মুক্ত হতে পারি না। মান্না দে-র গায়কির স্বাতন্ত্র্য ছিল, শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন ব্যাকরণকে জনপ্রিয় গানের আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারা। তাঁর কণ্ঠে কারিগরি দক্ষতা কখনও অনুভূতির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়নি, বরং অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করেছে। এইখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য।

প্লেব্যাক গানে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগ আসে ‘তমন্না’ ছবিতে, যেখানে সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈত গান গেয়েছিলেন। মুম্বইয়ে শচীন দেব বর্মনের সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতজীবনে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরে শচীন দেব বর্মনের সুরে ১৯৫০ সালের ‘মশাল’ ছবির ‘উপর গগন বিশাল’ গানটি তাঁকে নতুন পরিচিতি দেয়। এরপর ‘আওয়ারা’, ‘পরিণীতা’, ‘দো বিঘা জমিন’ ও ‘শ্রী ৪২০’-এর মতো ছবিতে তাঁর গান ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দি চলচ্চিত্রে কখনও নায়ক, কখনও পার্শ্বচরিত্রের ঠোঁটে তাঁর কণ্ঠ আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি করত। বলরাজ সাহানি, মেহমুদ কিংবা প্রাণের পর্দার চরিত্র অনুযায়ী গায়নভঙ্গি বদলানোর ক্ষমতা তাঁর ছিল। স্বচ্ছতা বজায় রেখেও কণ্ঠের চরিত্রে এই পরিবর্তন তাঁর দক্ষতার প্রমাণ।

কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে সংগীতের প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার পরে মান্না দে উস্তাদ আমান আলি খান ও উস্তাদ আবদুর রহমান খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন। ভিন্ডিবাজার ঘরানার গায়নরীতি তাঁকে স্বরের বিস্তার, অলংকার ও তালবোধ সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়। শাস্ত্রীয় শিক্ষার প্রভাব তাঁর গানে শুধু জটিল তান বা দ্রুত স্বরপ্রয়োগে সীমাবদ্ধ ছিল না। শব্দের উচ্চারণ, সুরের প্রবাহ এবং গানের মেজাজ বুঝে কণ্ঠের ভঙ্গি বদলানোর মধ্যেও সেই শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায়।

‘কেতকী গুলাব জুহি’ এই দক্ষতার উদাহরণ। ১৯৫৬ সালের ‘বসন্ত বাহার’ ছবিতে শংকর জয়কিষনের সুরে শৈলেন্দ্রের কথায় তৈরি গানটি বসন্তবাহার রাগের আবহে, একতালের ছন্দে গাঁথা। পণ্ডিত ভীমসেন যোশির সঙ্গে যুগলবন্দিতে মান্না দে-র কাজ ছিল শুধু উঁচু স্বরে গাওয়া নয়। দুই কণ্ঠের পালাবদল, তানের বিস্তার, স্বরের স্থিরতা এবং সুরের নাটকীয় ওঠানামা গানটিকে স্মরণীয় করেছে। জটিল সংগীতের ভিত অটুট রেখেও শ্রোতার কাছে সুরকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা এখানে স্পষ্ট।

 

স্মরণীয় কুড়ি

১। তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়
২। এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি
৩। আবার হবে তো দেখা
৪। কে প্রথম কাছে এসেছি
৫। আমি যামিনী তুমি শশী হে
৬। আমি যে জলসাঘরে
৭। আমি তার ঠিকানা রাখিনি
৮। হয়তো তোমারই জন্য
৯। ললিতা গো, ওকে আজ চলে যেতে বল না
১০। কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
১১। কসমে ওয়াদে পেয়ার ওয়াফা সব
১২। তু প্যায়ার কা সাগর হ্যায়
১৩। ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায় আমি বসে আছি

১৪। অ্যায় মেরে প্যায়ারে ওয়াতন
১৫। পুছো না ক্যায়সে ম্যায়নে রৈন বিতায়ি
১৬। লাগা চুনরি মে দাগ
১৭। অ্যায় মেরি জহরা জবিন
১৮। এক চতুর নার করকে শৃঙ্গার
১৯। জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি
২০। ইয়ারি হ্যায় ইমান মেরা

১৯৬৩ সালের ‘দিল হি তো হ্যায়’ ছবির ‘লাগা চুনরি মে দাগ’ রাগভিত্তিক গানের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রোশনের সুরে সাহির লুধিয়ানভির কথায় ভৈরবী আশ্রিত এই গানে গভীর আবেদনমূলক অনুষঙ্গ, আত্মজিজ্ঞাসা এবং অন্তর্লীন বেদনা মিলেমিশে আছে। মান্না দে শব্দের উচ্চারণকে স্পষ্ট রেখেছেন, আবার স্বরের বাঁক ও অলংকারে আবেগের সূক্ষ্ম পরিবর্তনও প্রকাশ করেছেন। ১৯৬৮ সালের ‘মেরে হুজুর’ ছবির ‘ঝনক ঝনক তোরি বাজে পায়েলিয়া’য় দরবারি কানাড়ার গাম্ভীর্য, নৃত্যছন্দ এবং কণ্ঠের নিয়ন্ত্রিত দ্রুততা একত্র হয়েছে। শংকর জয়কিষনের সুরে হসরত জয়পুরীর কথার সঙ্গে তাঁর গায়কির সংযোগ গানটির নাটকীয়তা বাড়িয়েছে।

‘পড়োসন’ ছবির ‘এক চতুর নার’ মান্না দে-র অন্য এক দিক সামনে আনে। কিশোরকুমারের সঙ্গে দ্বৈত গানে শাস্ত্রীয় কারুকাজের সঙ্গে হাস্যরস, দ্রুত ছন্দ ও অভিনয়ধর্মী গায়ন মিশে যায়। নানা সুরের বাঁক থাকা সত্ত্বেও গানটি ভারী হয়ে ওঠে না। ১৯৪১ সালের ‘ঝুলা’ ছবিতে অশোককুমারের গাওয়া গানের সূত্র ধরে ‘পড়োসন’-এর সংস্করণে কথার পরিবর্তন হয়, আর রাহুল দেব বর্মনের সুর গানটিকে নতুন পরিচিতি দেয়। অন্যদিকে, ১৯৬৪ সালের ‘দুজ কা চান্দ’ ছবির ‘ফুল গেন্দওয়া না মারো’য় রোশন ও সাহিরের সৃষ্টিতে ভৈরবী আশ্রিত সুর কোমলতা ও আবেদন তৈরি করে।

১৯৭১ সালের ‘জানে অনজানে’ ছবির ‘ছম ছম বাজে রে পায়েলিয়া’য় শংকর জয়কিষনের সুর, এসএইচ বিহারীর কথা এবং আধাশাস্ত্রীয় গায়নের ছন্দ লক্ষণীয়। ১৯৭৬ সালের ‘মেহবুবা’ ছবির ‘গোরি তোরি পৈজনিয়া’য় আরডি বর্মনের সুরে আনন্দ বক্সীর কথা পেয়েছে ধ্রুপদি ঢঙের পরিবেশনা। অন্তরার ‘ঘর সে নিকলতি হ্যায় তু’ অংশে পঞ্চম স্বরের উঁচু প্রয়োগ বিশেষভাবে নজর কাড়ে। দ্রুত স্বর ওঠানামা, মুরকি এবং ছন্দের ভিতর দিয়ে সুরের সৌন্দর্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে মান্না দে-র দক্ষতা স্পষ্ট। পর্দার অভিনয়ের সঙ্গে কণ্ঠের ভঙ্গি মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও গানগুলিকে প্রাণবন্ত করেছে।

ভজনের ক্ষেত্রে তাঁর কণ্ঠে থাকত সংযত নিবেদন, গজলে শব্দের সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা, আর কাওয়ালিতে ছন্দ ও সুরের বাড়তে থাকা গতি। প্রতিটি গানে একইরকম অলংকার ব্যবহার না করে গানের ধরন অনুযায়ী কণ্ঠের রং বদলাতেন তিনি। ফলে শ্রোতা শুধু সুরের কারুকাজ শুনতেন না, গানের বক্তব্যও অনুভব করতে পারতেন। এই সচেতনতা তাঁর জনপ্রিয় গানের ভিতকেও দৃঢ় করেছে।

বাংলা গানের ক্ষেত্রেও তিনি এক ছাঁচে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, দর্শন, হাস্যরস ও খেলাধুলোর বিষয় তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে আলাদা রূপ। ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বলো’, ‘হায় হায় গো, রাত যায় গো’, ‘তুমি আর ডেকো না পিছু ডেকো না’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়’, ‘চাঁদের আশায় নিভায়ে ছিলাম’ এবং ‘এ জীবনে যত ব্যথা পেয়েছি’ গানে স্বরের আবেগ ও কথার ব্যঞ্জনা আলাদা করে ধরা পড়ে। গানের মেজাজ অনুযায়ী কণ্ঠের কোমলতা, গতি কিংবা আবেগের তীব্রতা বদলাতে পারতেন তিনি।

সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটিতে মান্না দে-র কণ্ঠের নাটকীয়তায় কফি হাউসের আড্ডা, বন্ধুত্ব ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আশ্চর্যের বিষয়, গানটি রেকর্ড করার আগে মান্না দে কখনও কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যাননি। পরে অবশ্য সেখানে গিয়েছিলেন। ক্যানসারে আক্রান্ত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার গানটির শেষ স্তবক লেখার সময় শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতা বজায় রেখেছিলেন। প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য শহর ছাড়ার পথে হাওড়া স্টেশনে বসে তিনি গানের শেষ স্তবকের কয়েকটি পংক্তি সিগারেটের খাপের উলটোপিঠে লিখে সুপর্ণকান্তির কাছে পাঠান। পরে মুম্বইয়ে গানটির রেকর্ডিং হয়। স্মৃতিমেদুর কথার সঙ্গে মান্না দে-র কণ্ঠের নাটকীয়তা মিলে গানটিকে বাংলা আধুনিক গানের এক স্মরণীয় সৃষ্টি করে তুলেছে।

‘এক দিন রাত্রে’ ছবির ‘এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়’ গানে কৌতুকময় স্বরভঙ্গির সঙ্গে ছবি বিশ্বাসের অভিনয় স্মরণীয়। গানটির নানা তাৎক্ষণিক ভঙ্গির সঙ্গে পর্দার অভিনয়কে মিলিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। ফুটবল নিয়ে তাঁর গাওয়া ‘সব খেলার সেরা’ যেমন বাঙালির মাঠের আবেগকে উদ্দীপ্ত করেছে, তেমনই ১৯৮০ সালের ১৬ অগাস্ট ইডেন গার্ডেন্সে পদপিষ্ট হয়ে ষোলো দর্শকের মৃত্যুর পর ‘খেলা ফুটবল খেলা’য় কণ্ঠে ধরা পড়ে শোক। সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথার এই গান আনন্দের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে ফুটবলপ্রেমীদের বেদনা বহন করে।

মান্না দে-র সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি গানের প্রয়োজন বুঝে নিজের গায়কির ধরন বদলাতে পারতেন। রাগাশ্রিত সৃষ্টিতে সংযম, কৌতুকের গানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, আর আবেগঘন গানে পরিমিত স্বরপ্রয়োগ তাঁর কণ্ঠকে বহুমাত্রিক করেছে। শাস্ত্রীয় তালিম তাঁকে নিয়মের মধ্যে স্বাধীনতা দিয়েছিল। তাই তাঁর গানে তান, মুরকি, তাল, লয় ও উচ্চারণ কখনও আলাদা প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়ায় না; সবই গানের ভাবকে স্পষ্ট করার উপায়। জটিল সুরকে শ্রোতার অনুভবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার এই ক্ষমতাই মান্না দে-র গায়কিকে প্রজন্ম পেরিয়ে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

(লেখক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী ও সংগীতশিল্পী।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *