ঔদ্ধত্যেই কেরলে ধূলিসাৎ লাল নিশান

ঔদ্ধত্যেই কেরলে ধূলিসাৎ লাল নিশান

শিক্ষা
Spread the love


অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসের এক ভ্যাপসা সকাল। তিরুবনন্তপুরমের আকাশে তখন আসন্ন বর্ষার গন্ধের সঙ্গে মিশে এক নতুন স্বপ্ন। অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া মার্কসবাদী তাত্ত্বিক নেতা ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ— যিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বিলিয়ে দিয়েছিলেন দেশের কাজে— তিনি সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া, বৈষম্যে জর্জরিত এক প্রজাতন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারের শপথ নিচ্ছিলেন। সেদিন কেরলের ‘বামপন্থী’ হওয়ার অর্থ ছিল একটা স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষদের জন্য লড়াইয়ের ময়দানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। তাদের আনা ভূমি ও শিক্ষা সংস্কার এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, মাত্র দু’বছরের মাথায় নেহরুর কেন্দ্রীয় সরকার ভয়ে পেয়ে সেই সরকারকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হয়।

তার ঠিক ৬৯ বছর পরের ঘটনা। ২০২৬ সালের মে মাসের এক তপ্ত সকাল। তিরুবনন্তপুরমের একেজি সেন্টারের ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন এক চরম রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির সাক্ষী। ইতিহাসের চাকা তার চূড়ান্ত পাকটি খেয়ে ফেলেছে। কেরলের সাধারণ ভোটাররা যে শুধু লেফট ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন তা নয়; আক্ষরিক অর্থে তাঁরা বাম শিবিরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছেন। ১৪০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অনায়াসে মেজরিটির গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি নিঃশব্দে নেমোম, কাজাকুট্টম এবং চাথান্নুরে খাতা খুলেছে। আর সিপিএমের নিজস্ব আসন সংখ্যা ৬২ থেকে তলানিতে এসে ঠেকেছে মাত্র ২৬-এ। সেইসঙ্গে ১৩ জন বিদায়ি মন্ত্রীর লজ্জাজনক হারের মধ্যে দিয়ে ভারতের বুকে শেষ বামপন্থী রাজ্য সরকারেরও পতন ঘটে গেল।

এই হার নিছক কোনও চেনা ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ হাওয়া বা ডানপন্থীদের রাজনৈতিক চমক নয়। এক দশক একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকার ফলে শ্রমিকশ্রেণির এই দল, পরিণত হয়েছিল চূড়ান্ত আমলাতন্ত্রে। সোজা কথায়, তারা আর ‘বামপন্থী’ ছিল না।

এসি ঘরে নেতারা

এই রাজনৈতিক স্খলন বুঝতে হলে, আমাদের নজর ঘোরাতে হবে, রাজ্য সচিবালয়ের সামনের রোদে পোড়া পিচের রাস্তার দিকে। লাল পতাকা ওড়ানো একটি সরকারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এটাই যে, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দিন-রাতের অবস্থান ধর্মঘটটি করেছিলেন খোদ শ্রমজীবী মহিলারাই। আর তা হয়েছিল একটি কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধেই।

‘কেরল মডেল’-এর মেরুদণ্ড যে আশাকর্মীরা, যাঁরা কোভিড অতিমারির দিনগুলোতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছিলেন, তাঁরা টানা ২৬৬ দিন রাস্তায় বসেছিলেন। তাঁরা মাসে মাত্র ৭,০০০ টাকা বেতনের বদলে ২১,০০০ টাকার ন্যূনতম বেতনের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু, টেবিলের ওপারে চেয়ারে বসা নেতারা তাঁদের দেখলেন নিছক এক ‘উপদ্রব’ হিসেবে। এই ধর্মঘটকে তাঁরা দাগিয়ে দিলেন ‘কংগ্রেসের চক্রান্ত’ বলে! ১০ মাসের হাড়ভাঙা আন্দোলনের পর, রাজ্য সরকার তাঁদের দিকে ছুড়ে দেয় মাত্র ১,০০০ টাকার বেতন বৃদ্ধি। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী থেকে নার্স— সবাইকেই এই আমলাতন্ত্রের শিকার হতে হয়।

কৃষকদের ক্ষোভ

এই বিশ্বাসঘাতকতার শিকড় ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছিল কৃষি বলয়ের গভীরেও। ট্রাভাঙ্কোরের রাবার বলয়ে একসময়ের বাম দুর্গে, এখন শুধুই চাপা ক্ষোভ। ২০২১ সালের ইস্তাহারে সরকার বুক বাজিয়ে বলেছিল, প্রাকৃতিক রাবারের ন্যূনতম সহায়কমূল্য হবে প্রতি কেজিতে ২৫০ টাকা। অথচ, ২০২৬ সালের ভোটের দিন সেই দাম এসে ঠেকেছিল কেজিতে ২০০ টাকার আশপাশে। ব্যাংকের ঋণের চাপে জর্জরিত কৃষক যখন দিশেহারা, সরকার তখন ব্যস্ত কেন্দ্রের সঙ্গে এক্তিয়ার নিয়ে আইনি তর্কে। উত্তরের ওয়েনাডের চিত্রটাও একই। এর পাশাপাশি রয়েছে রাজ্যে কর্মসংস্থানে ভাটা। ভারতের সবচেয়ে শিক্ষিত রাজ্য হওয়ার পরও, কেরলে আজ ঘটে চলেছে ব্রেনড্রেন। বাম সরকারের ‘কেরল নলেজ ইকোনমি মিশন’ পাঁচ বছরে ২০ লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিলেও, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন ২৯.৯ শতাংশ যুব বেকারত্বের এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান মাথায় নিয়ে। তরুণীদের ক্ষেত্রে এই বেকারত্বের হার আরও ভয়াবহ— ৪৭.১ শতাংশ। জাতীয় গড়ের প্রায় তিনগুণ। এই তরুণরা আর কোনও বিপ্লবের অপেক্ষায় থাকেননি; তাঁরা শুধুই মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে যাওয়ার টিকিট কেটেছেন।

পাহাড়প্রমাণ ঋণ

প্রকৃত শিল্পনীতির অভাব ঢাকতে চোখধাঁধানো ইনভেস্টর সামিট বা লগ্নিকারীদের সম্মেলন করা হয়েছে। কিন্তু, রাজ্যের কোষাগারের ছিদ্র ততদিনে বিশাল আকার নিয়েছে। রাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪.৮২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ক্যাগের রিপোর্ট বলছে, ‘কিফবি’-র মাধ্যমে বাজেটের বাইরে আরও ৩২,৯৪২ কোটি টাকার হিসাববহির্ভূত ঋণ বিজয়ন সরকারের। এই আর্থিক গড়মিল ঢাকতে প্রাক্তন পিনারাই বিজয়ন সরকার, বিতর্কিত ‘মশালা বন্ড’-এর আশ্রয় নেয়— যা এখন ইডি’র আতশকাচের তলায়।

এর মাঝেই গত জুলাই মাসে কোট্টায়াম মেডিকেল কলেজের ছাদ ভেঙে এক রোগীর মৃত্যু প্রমাণ করে দেয় ভেতর থেকে কতটা পচে গিয়েছে প্রশাসন। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীণা জর্জ, যিনি প্রথমে দাবি করেছিলেন যে ওই ভবনটি অব্যবহৃত ছিল, তিনি আরানমুলা কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। আর এই সমস্ত ব্যর্থতার দায় সরকার নিয়ম করে চাপিয়ে গিয়েছে দিল্লির ঘাড়ে।

দুর্নীতির ফাঁস

এই প্রাতিষ্ঠানিক পতনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পিনারাই বিজয়নের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ব্যক্তিপুজো। ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পর তিনি তাঁর প্রথম মন্ত্রীসভার সমস্ত অভিজ্ঞ নেতাদের সরিয়ে দিয়ে একঝাঁক নতুন এবং অপেক্ষাকৃত জুনিয়ার মন্ত্রীদের নিয়ে আসেন, যাঁদের প্রধান যোগ্যতা ছিল নেতার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। কমিউনিস্টদের যে চিরাচরিত যৌথ নেতৃত্বের পরম্পরা ছিল, তাকে প্রতিস্থাপন করা হয় একটি কর্পোরেট স্টাইলের স্বৈরতন্ত্র দিয়ে। সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি পিনারাই বিজয়নের সেই বিখ্যাত তাচ্ছিল্যভরা মন্তব্য— ‘কাদাক্কু পুরাত’ (বেরিয়ে যাও) হয়ে উঠেছিল জবাবদিহিহীন এক সরকারের সিগনেচার টিউন।

আর যখন সিএমআরএল-এক্সালজিক কেলেঙ্কারি সামনে এল, দলের শেষ সম্বল নৈতিক পুঁজিটুকুও কর্পূরের মতো উবে গেল। সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিসের চার্জশিটে অভিযোগ উঠল যে, মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ে বীণা বিজয়নের আইটি কোম্পানিতে একটি খনি সংস্থা থেকে ২.৭ কোটি টাকার বেনামী লেনদেন হয়েছে, যার বিনিময়ে কোনও পরিষেবাই দেওয়া হয়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল শবরীমালা সোনা চুরির কেলেঙ্কারি, যার জেরে সিপিএমের এক প্রবীণ নেতাকে জেলে যেতে হয়। সাধারণ মানুষের দল হিসেবে পরিচিত বামেরা তখন দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিপতিদের থেকে আর আলাদা কিছু রইল না।

আদর্শগত আত্মসমর্পণ

সম্ভবত দলের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ক্ষতটা তারা নিজেরাই তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ দেখে ভয় পেয়ে সিপিএম ‘সফট হিন্দুত্ব’-এর দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। সংখ্যাগুরুকে খুশি করতে তারা নায়ার সার্ভিস সোসাইটির তোষামোদ শুরু করে এবং একটি ‘গ্লোবাল আয়াপ্পা কনক্লেভ’-এর আয়োজন করে। ঠিক একই সময়ে, মুনামবামে যখন ৪০০ একর জমির ওপর ওয়াকফ বোর্ডের দাবির কারণে ৬০০টি খ্রিস্টান মৎস্যজীবী পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়ে, তখন বাম সরকার কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে। চরম দক্ষিণপন্থীদের অনুকরণ করতে গেলে তা আদতে দক্ষিণপন্থীদেরই মান্যতা দেয়। ফলস্বরূপ ২০২৬ সালে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং হিন্দু— তিনটি সম্প্রদায়ই তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এই চরম কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাতটা এল খোদ সিপিএমের ক্যাডারদের ভেতর থেকেই। কান্নুরের মতো প্রথাগত বাম দুর্গ— যেমন পায়ান্নুর, তালিপরম্বা এবং আম্বালাপুঝায় দলের পোড়খাওয়া নেতারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান এবং জয়লাভ করেন। তাঁরা ভোটারদের কাছে বামপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করার ডাক দেননি; তাঁরা ডাক দিয়েছিলেন এই ‘দলতন্ত্র’ বা মেশিনের হাত থেকে বামপন্থাকে বাঁচানোর।

১৯৬৯ সালের নভেম্বরের পর এই প্রথমবার, ভারতের মানচিত্রে এমন কোনও রাজ্য রইল না, যেখানে বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকল। ২০১১ সালে বাংলা হাতছাড়া হয়, ২০১৮ সালে ত্রিপুরাও দখল করে নেয় বিজেপি। আর আজ, শেষ দুর্গটিও হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। ১৯৫৭ সালে কেরলের মানুষ কমিউনিস্টদের ভোট দিয়েছিলেন কারণ, সেদিন দলটা ভূমিহীন কৃষক, দলিত শ্রমিক এবং খেতখামারে কাজ করা মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আর ২০২৬ সালে সেই কেরলই তাদের ছুড়ে ফেলে দিল কারণ, ক্ষমতার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে দলটা কবে যেন সেই মাটির কাছ থেকে দূরে সরে এসে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের রঙিন কাচের পেছনে নিজেদের বন্দি করে ফেলেছে। তাদের নিজেদের হাতেই অত্যন্ত সন্তর্পণে, একটু একটু করে অবনমিত হয়েছে এই লাল নিশান।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *