- শুভময় সরকার
বছর কয়েক আগের এক অপরাহ্ণ। শীতের আমেজভরা দিন শেষে রাতের অপেক্ষায় শহর কলকাতা। দমদম রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক কবিবন্ধু ডাইনে-বাঁয়ের বড় বড় আবাসন আর দোকানপাট দেখিয়ে বলেছিল- ওদিকে বিজয়গড় আর এদিকে দমদম, উদ্বাস্তু আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ঘটনাক্রমে আমার বন্ধু আজন্ম দমদমেরই বাসিন্দা, সেই উদ্বাস্তু অঞ্চলেরই। বয়সের কারণেই দেশভাগ এবং তার পরবর্তী সময়ের উদ্বাস্তুস্রোত ওর প্রত্যক্ষ করা হয়নি তবে ধীরে ধীরে আমূল বদলে যাওয়া একটা অঞ্চলের প্রত্যক্ষদর্শী। এরপর আমার অনিবার্য প্রশ্ন ছিল, উদ্বাস্তু আন্দোলনের সেই ইতিহাস কি আজ এই প্রজন্মের কাছে আদৌ প্রাসঙ্গিক, কারণ যাঁরা লড়েছিলেন সেই লড়াই, আশ্রয়হীনতা থেকে আশ্রয়-সন্ধানের যে লড়াই, সেই লড়াইয়ের কথা পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়েছিলেন কি সেই লড়াকু মানুষগুলো…! আর ঠিক এখানেই আসছে সেই অমোঘ প্রশ্ন, এই বহুজাতিক সময়ে এবং ভুবনায়নোত্তর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দেশভাগের যন্ত্রণা আমাদের কতটা তাড়িত করে…! এসব ডিসকোর্সের মাঝে যাঁকে ছাড়া একটা সময়ের দলিল অসম্পূর্ণ, তিনি ঋত্বিককুমার ঘটক, যিনি নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্রের এক নিজস্ব ভাষা। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের তিন মায়েস্ত্রোর অন্যতম তিনি, যাঁর সম্পর্কে অপর মায়েস্ত্রো সত্যজিৎ রায় বিশ্বাস করতেন, বাকিদের থেকে তিনি আলাদা কারণ ঋত্বিক ছিলেন হলিউড প্রভাবমুক্ত। তাঁর সিনেমার নির্মাণশৈলী সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব।
প্রসঙ্গক্রমে অপর এক কবিবন্ধু আশিস দে সরকারের কবিতার কয়েকটি পংক্তি মনে পড়ছে – “সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে একটি শালিক / নীচে ক্ষমতার খাকি রঙ, ঝলসানো মুরগি, কার্তুজ / কলোনির কাদা স্মৃতির রক্তে গাঢ়, আঠালো। / কলোনি,/ একটি মেয়ের হাওয়াই-এর ফিতে ছিঁড়ে যায় / ছিঁড়ে যায় একটি দেশ… ”! মনে পড়ছে ‘কোমল গান্ধার’-এ বেদনার সেই আর্ত প্রলাপ – ‘এমন কোমল দেশটারে ছাইর্যা, আমার নদী পদ্মারে ছাইর্যা আমি যামু ক্যান?’ সেই দ্বিখণ্ডিত দেশ আর ছিন্নমূল মানুষকে নিয়ে বহু প্রশ্ন আজ এতগুলো যুগ পেরিয়েও উত্তরহীন রয়ে গেল, উত্তর মেলে না। ঋত্বিকের সিনেমা নেহাতই সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কি দেখব আমরা? অন্তত আমি সেভাবে দেখি না। কেবলমাত্র এক উচ্চমার্গের শিল্পকর্ম হিসেবেও আমি দেখি না, বরং শিল্পের দীক্ষিত, স্বীকৃত চোখে তাঁর সিনেমার কিছু ত্রুটি, অগোছাল দৃশ্য নির্মাণ চোখে পড়ে কিন্তু তিনি যে আমার কাছে আসেন ভিন্ন এক ডকুমেন্টেশন নিয়ে, ভিন্ন এক দলিলের সন্ধান দেন তিনি যেখানে মানুষের বেদনা, দেশভাগের ক্ষত, সমাজবাস্তবতা সব নিয়েই তাঁর সৃষ্টি হয়ে ওঠে এক গভীর আর্তনাদ, হাহাকার। মহাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই পৃথিবীর অন্যতম, সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম মাইগ্রেশন। ভুবনায়ন-পরবর্তী সময়ের পৃথিবীতে আজ অভিবাসন, রাজনীতি, পরিবেশ ও পরিচয়ের সংকটের সময়ে ঋত্বিকের সিনেমা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। শুধু প্রাসঙ্গিক নয়, অনেক বেশি অর্থবহ।
ঋত্বিকের সিনেমার কেন্দ্রে মূলত রয়েছে ‘দেশভাগ, বাস্তুচ্যুতি ও পরিচয়ের সংকট’। এক্ষেেত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’কে আমরা উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারি। যে সময়টাকে সিনেমায় ধরার চেষ্টা করেছেন ঋত্বিক, সেই জীবন বাঙালির ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর ‘কোমল গান্ধার’ নিয়ে ঋত্বিক নিজে কী বলছেন দেখি– “I attempted to place layer upon layer, allegory upon allegory, to see if I may contact that nice fact of unification in a flash of lightning someplace”. বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার, যন্ত্রণা আর ফেলে আসা স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকার সেই নিবিড় অনুভবকে ছুঁতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক আর সেক্ষেত্রে শিল্পের জন্য শিল্প তত্ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন তাঁর নিজস্ব পথ, নিজস্ব পরিসর। আজ ঠিক এই মুহূর্তের পৃথিবীতে বাস করে আমরা বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, সিরিয়া, প্যালেস্তাইন বা আফ্রিকার বহু দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সঙ্গে একাকার হয়ে সেই অস্তিত্বহীনতা থেকে আশ্রয়-সন্ধানের যাত্রাপথকে অনুভব করতে পারি হয়তো-বা। ঋত্বিক আমাদের সেই উপলব্ধির জায়গাটাকে তীব্র, তীক্ষ্ণ করে তুলেছেন। তাঁর ক্যামেরা শুধুমাত্র এক যন্ত্র নয়, যান্ত্রিকতা ছাড়িয়ে ক্যামেরা হয়ে ওঠে সময়ের ভাষ্যকার। সফদার হাসমি এ নিয়ে বড় সুন্দর করে বলেছিলেন –‘ঋত্বিকই প্রথমবার দেখিয়েছিলেন যে সিনেমার ক্যামেরা কেবল এক বাধাহীন আড়ি পাতার যন্ত্র নয় বরং সে হতে পারে একাধারে একজন ভাষ্যকার, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সমালোচক এবং কবি।’ আসলে ঋত্বিক নেহাতই এক Viewer হয়ে থাকতে চাননি, হতে চেয়েছিলেন সাক্ষী আর তাঁর ক্যামেরার লেন্স লিখে ফেলছিল সময়ের দলিল, ইতিহাসের এক উত্তরহীন অধ্যায়ের ডকুমেন্টেশন।
কিন্তু সেই ডকুমেন্টেশনে কি শুধু দেশভাগ, উদ্বাস্তু এবং এক অস্থির সময়? নিঃসন্দেহে তাঁর সিনেমায় দেশভাগ এবং ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণা এক বড় পরিসরে চিত্রায়িত হয়েছে কিন্তু তাঁকে এটুকুতে বেঁধে ফেললে পরিচালক এবং সামাজিক চিন্তক হিসেবে ফ্রেমবন্দি করে ফেলা হবে। তিনি নিজে তো কোনও নির্দিষ্ট ফ্রেমে থাকতেই চাননি। তাঁর ন্যারেটিভ স্টাইল, চিত্রনাট্য, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল কোথাও পরিচিত ছক মানেননি, ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছেন। শিল্পের দৃষ্টিভঙ্গিতে তা কতটা সঠিক, সেটা বিচার্য নয়, সে ধৃষ্টতাও আমার নেই কিন্তু দর্শক হিসেবে আমি অনুভব করি তিনি ক্যামেরায় ধরে ফেলছেন বৃত্ত থেকে বৃত্তান্তরে ছড়িয়ে পড়া ক্রাইসিসকে, সেখানে দেশভাগ, উদ্বাস্তুর পাশাপাশি নারীও হয়ে উঠছে এক বিষয়। ঋত্বিকের সিনেমায় সামাজিক পটভূমি মূলত সাতচল্লিশের দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে উদ্বাস্তু, অভিবাসন এবং ‘সাংস্কৃতিক শূন্যতার বিকার’। সেই প্রেক্ষাপটে নারী এক অদ্ভুত সংকটের মুখোমুখি হয়। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা কিংবা ‘সুবর্ণরেখা’র সীতা কেবলমাত্র সিনেমার দুটি চরিত্র নয়, সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির বা চরিত্রের সীমানা পেরিয়ে তারা হয়ে উঠেছে পরিবার, দেশ, সংস্কৃতি, ভাঙনের প্রতীক, ‘mom archetype’ কিংবা ‘lady as nation’. এই আধুনিক, উত্তরাধুনিক কিংবা উত্তরাধুনিক-পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে নারীর সামাজিক অবস্থান, তার id নিয়ে যখন এত চর্চা, ঠিক তখনই ঋত্বিকের সিনেমার নারী চরিত্ররা সেই ডাইমেনশনে এসে আমাদের মুগ্ধ করে। খুব সাদামাঠাভাবে উপস্থাপন নয়, এক জটিল আবর্তে তাঁর নারীরা কখনও ‘voice’ পায়, কখনও বা ‘নীরব, নির্যাতিতা’। নীতার সেই কথাগুলো স্মরণ করি – “কখনও কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনি, আর সেটাই তো আমার পাপ”…! ঋত্বিকের সিনেমার নারীরা কাজ করে, সিদ্ধান্তও নেয়, সামাজিক কর্তব্য করে কিন্তু পিতৃতান্ত্রিকতার চাপে শেষপর্যন্ত তাদের ‘fullest freedom’ প্রায়শই প্রতিহত হয়। পরিবার, পরিস্থিতি, সংস্কৃতির বন্ধনে শেষ অবধি সীতাকে আত্মহত্যা করতে হয়। নারী নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের ভাবনা সম্পর্কে আরও বিশ্লেষণাত্মক হলে বোঝা যায় তিনি মিথ, লোককাহিনী, সাংস্কৃতিক প্রতীকের সঙ্গে সংযোগ রেখেই উপস্থাপন করেছেন তাঁর নারীচরিত্রগুলো। তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা কখনও ‘Mom Goddess’, কখনও বা ‘দেশ’ কিংবা ‘ভূমি’। তবে নারীকে প্রতীক হিসেবে উপস্থাপনার ব্যাপারে কিছু গবেষক একটু ভিন্নভাবেও দেখেছেন, এই প্রতীকীকরণের ফলে নারীর নিজস্ব স্বর কি উপেক্ষিত হচ্ছে…! এ মতকেও আরেকদল সমালোচক অবশ্য নস্যাৎ করে দিয়েছেন। সে আলোচনার পরিসর ভিন্ন, আমার সে স্পর্ধাও নেই।
একটি স্বীকারোক্তি জরুরি, সিনেমা নিয়ে ভালো লাগার শুরু ছাত্রজীবনেই, ফলত ম্যাটিনি, ইভনিং কিংবা নাইট শো-তে নিয়মিত চালু বাণিজ্যিক মেইনস্ট্রিম ছবি দেখার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই সমান্তরাল সিনেমা দেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। সে তালিকায় সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক থেকে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ হয়ে ঋতুপর্ণ কিংবা আরও কেউ কেউ। এঁদের কারও কারও সিনেমা দেখেই আমি হয়তো-বা below performing স্টাইলের কিঞ্চিৎ ভক্ত, তাই সামগ্রিক মুগ্ধতা নিয়েও ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় অনেকক্ষেত্রেই ওভার-অ্যাক্টিং কিংবা মেলোড্রামার আধিক্য পীড়া দিয়েছে একসময়। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে বুঝতে পেরেছি এটা সুচিন্তিত। তিনি একদম দেশজ মাটির গন্ধকে তুলে আনতে চেয়েছেন, দেশজ উপাদানে যাবতীয় আরবান এলিটিজমকে কোথাও এক সচেতন উপেক্ষা করতে চেয়েছেন, ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেলোড্রামাটিক উপস্থাপনা জরুরি হয়েছে, অন্তত তিনি সেভাবেই রিয়েক্ট করতে চেয়েছেন, সরাসরি ছুঁয়ে ফেলতে চেয়েছেন মানুষের নিরাশ্রয়তাকে। ‘অযান্ত্রিক’-এ সেই কিশোর যখন জিজ্ঞেস করে বিমলের ‘জগদ্দল’ গাড়িটি কতদিন থেকে তার কাছে আছে, উত্তরে বিমল বলছে – ‘মা যেবার গেল, জগদ্দল সেবার এলো’। শুরু থেকে বিমলের চরিত্রে কালী ব্যানার্জির অভিনয় কখনও সামান্য ওভার-অ্যাক্টিং মনে হলেও, আচমকা এমন মৃদুস্বরের জবাবে অদ্ভুত এক distinction তৈরি করে ঋত্বিক আমাদের বিষণ্ণ করলেন, মুগ্ধ করলেন এবং সেই আশ্রয়সন্ধানের ইশারাও দিলেন।
ফিরে আসি সেই শুরুর প্রসঙ্গে। হ্যাঁ, ঋত্বিককুমার ঘটক আজ শুধু প্রাসঙ্গিকই নন, অনিবার্য, নইলে এই প্রজন্ম, আগামী প্রজন্ম যে ছিন্নমূল হয়েই থাকবে, নতুন শিকড় যে গজাবেই না।
