- ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়
সিনেমার জন্মলগ্ন থেকেই নানা বাঁক নিয়েছে ছায়াছবি। প্রাথমিকভাবে চলচ্চিত্র ছিল নিঃশব্দ এবং নির্বাক। ক্রমে সে নিবিড় এক সম্পর্কের সূত্রে জড়িয়ে নিয়েছে শব্দকে, পরে হয়ে উঠেছে সবাক। যখন সেলুলয়েডে ছবি করতে এলাম তখন শুনলাম ছবি ও শব্দ একত্রিত করে যে ফিল্ম স্ট্রিপ রসায়নাগারে প্রস্তুত হয় তাকে ম্যারেড প্রিন্ট বলে। অর্থাৎ শব্দগ্রহণ ও চিত্রগ্রহণ আলাদা করে নিষ্পন্ন হওয়ার পরে এরা যেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাই বলা হয় ম্যারেড প্রিন্ট।
সিনেমার প্রথম যুগে এই শব্দ আসে কিছু যন্ত্রানুষঙ্গে সংগীতের সুর নিয়ে কিংবা নানাবিধ জাগতিক শব্দজুড়ে। যাকে ফিল্মের ভাষায় বলা হয় অ্যাম্বিয়ঁস সাউন্ড। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র নির্মাতারা আবিষ্কার করেন যে, যেমন যেমন ছবি এগোচ্ছে ঠিক সেই অনুযায়ী যদি শব্দ গেঁথে দেওয়া যায় তবে পরিস্থিতি আরও বাস্তবসম্মত হয়। সৃজনশীল চলচ্চিত্রকাররা এরপর শুরু করেন নানা সব পরীক্ষানিরীক্ষা। যা দেখছি তার হুবহু শব্দ প্রক্ষেপণ না করে যদি অন্য এমন শব্দ, এমন সংগীত রাখা যায় তবে এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে ছবিকে, তার অভিঘাত আরও বাড়িয়ে তোলা যেতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ ধরা যায়, কোনও এক গ্রাম্য দৃশ্যে একজন মহিলা বাড়ির উঠোনে কাজ করছেন। হঠাৎ এক দাঁড়কাকের কর্কশ কা-কা ডাক ব্যবহার করলেন নির্মাতা। দর্শকের মন আচমকা কেঁপে উঠল এক অজানিত অমঙ্গলের সম্ভাবনায়। যেমন ধরা যাক এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়ার মধ্যে উড়োজাহাজের বা রেলগাড়ির বা ঘড়ির টিকটক শব্দ ব্যবহারের চল আছে সিনেমায়।
এতটা গৌরচন্দ্রিকা করতেই হল এই কারণে যে, সিনেমায় শব্দ মায় আবহ সম্পর্কে স্বল্পপরিসরে একটা ধারণা প্রথমেই দিয়ে রাখা ভালো। যেহেতু আমার বিষয় হল চলচ্চিত্রে শব্দের ব্যবহার বা আরও পরিষ্কার করে বললে ঋত্বিককুমার ঘটকের চলচ্চিত্রে শব্দ-আবহ ও সংগীতের ব্যবহার। শুরুতেই লিখে রাখা প্রয়োজন যে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সংগীত ও আবহের যে আঙ্গিক তা অন্য কোনও ভারতীয় চলচ্চিত্রকারের মধ্যে দেখা যায়নি। তার মূল কারণ হল ঋত্বিক তাঁর ছবির প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবহার করেছেন সমাজ-সংস্থার নিদারুণ সংকটের প্রেক্ষিতে ও রাজনৈতিক অবস্থানের নিরিখে। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সেই কারণেই প্রতিফলিত হয়েছে এক দ্বন্দ্বমূলক অভিজ্ঞান।
কখনো-কখনো সমালোচিত হয়েছেন যে, শব্দ ব্যবহারে তিনি ছিলেন থিয়েট্রিকাল বা অতি নাটকীয়। এমনকি সংলাপের ক্ষেত্রেও তা মনে করেন অনেকে। মনে রাখা দরকার যে, ঋত্বিকের শিল্প সন্ধান শুরুই হয়েছিল নাটক দিয়ে। তিনি যা শিখেছিলেন তা ওই নাটকেরই শিক্ষা, যার প্রলম্বিত ছায়া পড়েছিল তাঁর বোধ ও মননে। যা ক্রমে তাঁর ছবিতে ব্যাপ্তি পায়। ফলে সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছিলেন মেলোড্রামা ও নাটুকে সংলাপ। ফিল্মের চিরাচরিত ব্যাকরণ ভেঙে তৈরি করেছিলেন এক নিজস্ব আঙ্গিক। মধ্যবিত্ত মানসিকতায় ধাক্কা দিতে চেয়েছিলেন। নিটোল গল্পকে ভেঙে তাঁর নির্মিত পাত্রপাত্রীকে রেললাইনের শেষ প্রান্তে দ্রুত ট্র্যাকশটে ব্যাক টু ক্যামেরা শট নিয়ে জুড়ে দিয়েছিলেন ‘দোহাই আলি’ সুরশব্দে পূর্ববঙ্গের জেলেদের গানের বাঙ্ময় আবহ। অবহেলিত, দ্বিধাগ্রস্ত, অবদমিত মানুষের ভাষা (কোমল গান্ধার)। তিনি মনে করতেন, সিনেমা সব সময়েই সমালোচনামূলক। দেশ-দশের কাণ্ডজ্ঞান আদৃত রাজনৈতিক দিশা থাকতে হবে একজন চলচ্চিত্রকারের। ঋত্বিক কোনও আড়াল না রেখেই বলেছেন, শিল্পের শেষ কথা হচ্ছে মানুষ। বলেছেন, পলিটিকাল ছবি করা আসলে শেষপর্যন্ত মেরুদণ্ডের প্রশ্ন।
ফিল্ম আলোচকদের অনেকেই ঋত্বিক ঘটকের আগে-পরে সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের নাম লিখে দেন। তুলনামূলক আলোচনারও চেষ্টা করেন কেউ কেউ। প্রকৃতপক্ষে এই তুলনা খুব একটা কার্যকর বলে মনে হয়নি। সত্যজিতের ছবি সবসময়ই একটা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে রচিত হয়েছে। ছবিতে ক্যামেরা, সম্পাদনা, আবহ সবই ছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাপ্রসূত।
যা কিছু পরীক্ষামূলক কাজ তিনি করেছেন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিত্রনাট্য তৈরি করার সময়েই মোটামুটি স্থিরীকৃত থাকত। তাঁর স্টোরি বোর্ডগুলোর ডিটেলিং দেখার ও সিনেমার ছাত্রদের শেখার মতো। মৃণাল সেনও অনেকটাই তাই। তবে সংগীত ও আবহ নিয়ে তিনি তেমন পরীক্ষামূলক কাজ করেছেন বলে মনে হয় না। তাঁর ছবিতে সংগীতের ব্যবহার খুবই পরিমিত। অতি সামান্য বললেও অত্যুক্তি হবে না। অন্যদিকে, ঋত্বিক তাঁর ছবিতে ছিলেন আগাগোড়া এক্সপেরিমেন্টাল, বেপরোয়া। ক্যামেরা থেকে, ডায়ালগ থেকে, আবহ ও সংগীত থেকে সমস্ত ক্ষেত্রেই একথা সত্য। প্রতি মুহূর্তে ধারাবাহিক ছাঁচ ভেঙে এক ধরনের ডায়ালেকটিক্যাল উপস্থাপনা হাজির করেন তিনি। ওই যে লিখেছি, অধিকাংশ সময়েই একধরনের থিয়েট্রিকস এবং অনির্দেশ্য (আনপ্রেডিক্টেবল) অবস্থা তৈরি করেন। তা যেমন ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় প্রত্যাখ্যাত নীতার সিঁড়ি দিয়ে নামার দৃশ্যে চাবুকের শব্দ ব্যবহারের কথাই হোক কিংবা ‘সুবর্ণরেখা’য় সীতা ও অভিরামের দৌড়ের সঙ্গে বেজে ওঠা দুরন্ত সেতারের গৎ হোক। ‘ আজ ধানের খেতে রৌদ্র ছায়া’ গানটির ব্যবহার তো কালজয়ী। ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমায় ভূতের নৃত্যের আবহ সংগীতও ছিল দুঃসাহসিক। এই ছবিতেই তিনি দু’দুটো গানের ব্যবহারকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন। একটি রবীন্দ্রসংগীত ‘কেন চেয়ে আছো গো মা’ ও অন্যটি ফকিরী গান ‘নামাজ আমার হইল না আদায়।’
একদিকে যেমন রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করেছেন তিনি তেমনই লোকসংগীতের ব্যবহার ঋত্বিককে অনন্য করেছে। আবার তাঁর বিভিন্ন ছবিতে রেখেছেন ভারতীয় রাগসংগীতের অনবদ্য সমস্ত সুর। এই সমস্ত সংগীতের সঙ্গে দৃশ্যের সম্পৃক্ততা একধরনের ধ্রুপদি গাম্ভীর্য প্রদান করেছে। এই সমস্ত গান ও সুর ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি বিবেচনা করেছেন স্থান-কাল ও সামাজিক বাস্তবতাকে দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। ব্যবহার করেছেন গণসংগীত তথা মাস সং। শুধু বৃষ্টির শব্দ, রান্নার শব্দ, গাড়ির শব্দ নয়, অবাঞ্ছিত প্রোজেক্টরের আওয়াজ কিংবা ক্যানেস্তারা, ভাঙা যন্ত্রপাতির শব্দও অনায়াসে ব্যবহার করেছেন তিনি আবহ হিসাবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘দৃশ্যচরিত্রের সারির পাশাপাশি বহমান শব্দচিত্রের সারির পুরোটাই মিউজিক ট্র্যাক হিসেবে গণ্য করা দরকার।’ ঋত্বিক বর্তমানের তথা যাবতীয় পারিপার্শ্বিক শব্দকে বাস্তবতায় বা প্রয়োজনে পরাবাস্তবতায় প্রতিস্থাপিত করেছেন তাঁর নানা চলচ্চিত্রে। সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি সহায়তা নিয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরী, ওস্তাদ বাহাদুর খান, ওস্তাদ আলি আকবর খানের মতো দিকপাল সংগীতজ্ঞদের।
এই নিবন্ধ শেষ করার পথে ঋত্বিকের প্রিয় ছাত্র শব্দ গ্রাহক ভাস্কর চন্দভারকরের একটি লেখা থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি রাখছি যাতে শব্দ সম্পর্কে ঋত্বিকের গভীর অনুধাবন সম্পর্কে পাঠক অবহিত হতে পারেন। ভাস্কর চন্দভারকর লিখেছেন, ‘চলচ্চিত্রে সংগীতের ব্যবহার সম্বন্ধে যারা শিখতে চাইছে এমন ছাত্রদের কাছে ঋত্বিক ঘটকের বেশিরভাগ ছবি আদর্শপাঠ। সংগীতের অতুলনীয় ব্যবহার হয়েছে এমন চলচ্চিত্রের তালিকা তৈরি করতে বসলে ঋত্বিকদার ‘মেঘে ঢাকা তারা’ থাকবে সবার ওপরে। আর তাঁর ‘সুবর্ণরেখা’ বোধহয় দ্বিতীয় স্থান নেবে। সৃজনশীলতা ও কল্পনাময়তার রত্নভাণ্ডার-স্বরূপ তাঁর সাউন্ড ট্র্যাকগুলি দারুণ শিক্ষামূলক। শব্দগ্রহণের ওপর তাঁর শক্তিশালী দখল ও নিয়ন্ত্রণের পরিচয় দেয় ‘মেঘে ঢাকা তারা’। শব্দগ্রহণ একজন সংগীতজ্ঞের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রে।’ অথচ ঋত্বিক সম্পর্কিত বাংলা ভাষায় আলোচনার ক্ষেত্রে এই বিষয়টিই অত্যন্ত কম গুরুত্ব পেয়েছে।
