চিরদীপা বিশ্বাস
হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে মেসেজ— ‘এই নাটক ফাটক করে হবে টা কী বলতো?’ এমন তাচ্ছিল্যভরা কথা মাথা গরম করার পক্ষে যথেষ্ট। তবে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কথা না বাড়িয়ে নিজের মস্তিষ্ক শীতল রাখার চেষ্টাই করলাম। বস্তুত, মুখে বুলি ফোটার আগে থেকেই যাদের ‘নাটক-ফাটক’, ‘নাচ-ফাচ’ বা ‘গান-ফান’ -এর সঙ্গে হৃদ্যতা, তারা জীবনে ঠিক কতবার এমন উক্তি শোনে তার হিসেব থাকে না। আক্ষেপের বিষয়, স্কুলের অঙ্কের ব্যাচে বা কলেজের ভরা ক্লাসরুমেও শিক্ষিত ও সম্মাননীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে এই ‘ফ’কারান্ত শব্দগুলো মাঝেমাঝেই অত্যন্ত সহজাত হয়ে পড়ে।
সমাজের বাঁধাধরা গণ্ডির চক্রব্যূহে আটকে আমরা ভুলে যাই, এই ‘ফাটক-ফাচ-ফান’ নিতান্তই কেবল বিনোদনের জন্য নয়। বরং এটি সমাজের এক সুস্পষ্ট আয়না। এই আয়না এতটাই তীক্ষ্ণ প্রতিবিম্ব ফোটায় যে, আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে খোদ গোরা সরকার ‘নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন’ করে এর কণ্ঠরোধ করতে বাধ্য হয়েছিল। ‘গজদানন্দ’ বা ‘যুবরাজ’ -এর মতো ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক নাটক— নিন্দুকদের ভাষায় সেই ফাটকের প্রভাব এতটাই ভয়ানক ছিল যে, ১৮৭৬ সালে তা প্রদর্শনের স্বাধীনতা খর্ব করার সিদ্ধান্ত নেয় ইংরেজরা। তারও আঠারো-উনিশ বছর আগেকার যুগান্তকারী সৃষ্টি ‘নীলদর্পণ’ বা শ্রীরামকৃষ্ণের ‘লোকশিক্ষের ক্ষেত্র’-এর কথা ভুলি কী করে! তবেই ভাবুন, এসবের গুরুত্ব কতটা।
সমগ্র ভারতবর্ষে ‘আইপিটিএ’ (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন)-এর হাত ধরে আসা বিপ্লবের ঢেউয়ের কথা কমবেশি সকলেরই জানা। তা সত্ত্বেও আমরা আজও একে বিনোদনের ফচকেমির চোখেই দেখি। বর্তমানে ‘স্টার স্টাডেড’ ফাটক দেখতে আমরা হল ভরাই ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশেরই মন পড়ে থাকে কেবল সেলফি তোলার প্ল্যানিংয়ে। পাশাপাশি আরও একটি দৃশ্য চোখে পড়ে। ধরুন, মঞ্চে টানটান ক্লাইম্যাক্স সিন অভিনীত হচ্ছে। ঠিক এমন সময় হঠাৎ দর্শকাসন থেকে রিংটোন বেজে উঠল— ‘সাইয়ারা তু তো বদলা নেহি হে…’। সত্যিই আমাদের এই উদাসীনতা বদলাবে, সেই সাধ্য কার! মঞ্চে অভিনয় চলাকালীন এমন বিঘ্ন ঘটার পর শিল্পীরা মাঝপথে অভিনয় থামিয়ে দেন। দর্শকদের কাছে করজোড়ে বিনম্র অনুরোধ করার পরও আমাদের টনক নড়ে না, এদিক-ওদিক টুকটাক রিংটোন বাজতেই থাকে। অথচ অবাক করা বিষয়, সিনেমা হলে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় কি এই রিংটোন আমাদের এতটা বিরক্ত করে? সেখানে কি আমরা অনেক বেশি সুশৃঙ্খল থাকি না? এই দ্বিচারিতা আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক মননের অভাবকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ভেবে দেখুন, এই ‘ফাটক’ করে নাট্যকর্মীরা পানটা কী? সমাজের চোখে হয়তো কিছুই না, কিন্তু নিজেদের জীবনে এর গুরুত্ব অনেকটা। অসীম আত্মবিশ্বাস, মনঃসংযোগ, যূথবদ্ধতা, সদর্থক চিন্তা আর জীবনভরের শিক্ষা পান তাঁরা। তাই প্রতি বছর ২৭ মার্চ ‘বিশ্ব নাট্য দিবস’ অনেক আশা নিয়ে আসে বিশ্বের নানা মঞ্চে চরিত্র হয়ে ওঠা অগণিত মানুষের বুকে। তাঁদের অভিনয় দুটো মানুষের হৃদয় স্পর্শ করলে, দশজনকে হাসালে বা একজনকে ভাবালে— সেটাই চরম প্রাপ্তি। তাই সেলফির মোহ ছেড়ে এমনভাবে নাটক দেখুন, যা আপনাকে ভাবায় এবং সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন জাগায়। কয়েক দশকে অনেক কিছু বদলেছে, তবে কী বদলায়নি সেটাও ভাবুন। সেইমাফিক নিজের ‘টিনের তলোয়ার’-কে শান দিয়ে চকচকে রাখুন, দরকার পড়বে।
(লেখক সংস্কৃতিকর্মী। কোচবিহারের বাসিন্দা।)
The publish উদাসীনতা ও অবজ্ঞার আড়ালে বিপন্ন নাট্যমঞ্চ appeared first on Uttarbanga Sambad.
