উত্তরে শঙ্কা, তবুও হিমন্তের চালে নয়া অস্ত্র মমতার

উত্তরে শঙ্কা, তবুও হিমন্তের চালে নয়া অস্ত্র মমতার

শিক্ষা
Spread the love


গৌতম সরকার

ঘরপোড়া গোরু উত্তরবঙ্গ। শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। অসমের ভার যে বইতে হয় উত্তরবঙ্গকেই। প্রাদেশিকতা, জাতিবিদ্বেষকে কেন্দ্র করে বহুবার এরকম ঘটেছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-র মধ্যে অসমে বারবার বঙ্গাল খেদা আন্দোলনের ঢেউ উত্তরবঙ্গে শরণার্থী স্রোত ডেকে এনেছে। আবার ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮-এর মাঝে বোড়ো ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দাঙ্গার জেরে পশ্চিমবঙ্গ শরণার্থীর ভার সামলেছে। ভিনরাজ্যের সমস্যা বলে কিন্তু ঝেরে ফেলার জো নেই।

আশঙ্কার কারণ, নতুন করে ঘৃণার আগুনের আঁচ মালুম হচ্ছে অসমে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার (Himanta Biswa Sarma) সাম্প্রতিক মন্তব্যে বিদ্বেষের মশাল। এসআইআর শুরুর সময় বাংলার বিজেপি নেতাদের প্রচার ছিল, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের মোক্ষম সুযোগ এসেছে। তবে তাঁদের মুখে অন্তত আশ্বাস ছিল, ভারতীয় মুসলমানদের চিন্তা নেই। যা অনেকবার স্পষ্ট করে বলেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।

হিমন্তের কথায় সেই ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। অসমে এসআইআর (SIR) নয়, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী (এসআর) শুরু হওয়ার মুখে। সেই সংশোধনীতে অসমের মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বাঙালি মুসলমানদের কষ্ট দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন বিজেপি কর্মীদের। বাঙালি মুসলমানদের অসমে পরিচিতি মিয়াঁ সম্প্রদায় নামে। এই মিয়াঁদের কষ্ট দিতে তাঁদের নাম দলে দলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রচুর সংখ্যায় ফর্ম-৭ জমা দিতে বলছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফর্মে বাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট তেমন কোনও কারণ উল্লেখ থাকছে না অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

অথচ নির্বাচন কমিশন ওই বাঙালি মুসলমানদের সেভাবে নোটিশ দেয়নি। কিন্তু হিমন্তের প্রকাশ্য ঘোষণা, ‘যেভাবে হোক, মিয়াঁ মুসলমানদের কষ্ট দাও। কষ্ট পেলে ওঁরা অসম ছেড়ে চলে যাবেন। আমরা কিছু লুকোচ্ছি না। আমি মিয়াঁদের কষ্ট দেওয়ার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করছি।’ লক্ষ্য করা যেতে পারে, তিনি বলছেন, কষ্ট পেলে মিয়াঁরা অসম ছেড়ে চলে যাবেন। তাঁরা ভারতীয় হলে যাবেন কোথায়? বাংলাভাষীর বাস পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথায়!

অস্বীকার করায় জায়গা নেই যে, বাংলার মতো অসমে অনুপ্রবেশ সমস্যা ভীষণ। অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে অসমে বসবাস করেন। তবে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর বা মালদায় বসবাসকারী সব মুসলমান যেমন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী নন, অসমে নিশ্চয়ই তাই। কিন্তু হিমন্ত ভারতীয়-বাংলাদেশি বাছবিচার না করে সব ‘মিয়াঁ’কে তাড়াতে চান। সেটা তাঁর দলের অ্যাজেন্ডা। অসমে ভোটে জিততে মেরুকরণের কৌশলও।

যতই একদল হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখুন, সংবিধান অনুযায়ী কাগজে-কলমে দেশটার চরিত্র এখনও ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মের ভিত্তিতে এদেশ থেকে কাউকে বিতাড়নের সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই। নেই বলেই অসম ও বাংলার অনেক বাসিন্দাকে গোপনে রাতের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল সীমান্তের ওপারে। ভারতীয় নাগরিকত্ব যে তাঁদের অনেকের আছে, তা স্পষ্ট বীরভূমের সোনালি বিবিকে ভারত সরকার ফেরাতে বাধ্য হওয়ায়।

হিমন্তের বিদ্বেষ কিন্তু শুধু নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে থেমে নেই। অসমবাসীকে তাঁর পরামর্শ, ‘যদি কোথাও রিকশাভাড়া ৫ টাকা হয়, রিকশাওয়ালা মিয়াঁ মুসলমান হলে তাঁকে ৪ টাকা ভাড়া দিন।’ যে কোনওভাবে বাঙালি মুসলমানকে চাপে রাখার এই কৌশল সংবিধান অনুযায়ী নাগরিক অধিকারের তো বটেই, জীবিকায় সমান অধিকারের পরিপন্থী। এভাবে জীবিকায় ধর্মভিত্তিক বিভেদ তৈরি হচ্ছে। এই ‘কষ্ট দেওয়া’র প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিলে ভারতীয় নাগরিক বাঙালি মুসলমানদের উত্তরবঙ্গ ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না।

বাংলাদেশি চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। যা বিজেপি নেতারা আগাম ঘোষণা করলেও পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ এখনও হয়নি। অসমে হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই ‘কষ্ট দিয়ে’ এই উৎখাতের পরিকল্পনা। যার ভার বহন করতে হতে পারে বাংলাকে। সীমানা বন্ধ করে বাংলা কি পারবে শরণার্থী স্রোত আটকাতে? খোলা সীমানায় তা অসম্ভব। এতে বাংলায় আর্থিক, সামাজিক, জনবিন্যাসগত চাপ বাড়বে নিশ্চয়ই।

প্রশ্নটা ভিন্ন- হিমন্তের এই পরিকল্পনা কি শেষবিচারে তৃণমূলকে সুবিধা করে দেবে না? পাশের রাজ্যে স্বধর্মীয়দের ওপর এই নির্যাতন স্বাভাবিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি মুসলমানদের রুষ্ট করবে, শঙ্কিত করবে। তৃণমূলের প্রতি অনেক মুসলমানের ক্ষোভ থাকলেও সেক্ষেত্রে মুসলিম ভোট এককাট্টা করার সুযোগ পেয়ে যাবে বাংলার শাসকদল। হিমন্তকে দিয়ে কি সেই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে বিজেপি?

ভোলার উপায় নেই যে, এই হিমন্ত একবার দার্জিলিংয়ে উড়ে এসে বাংলার তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকরের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রুদ্ধদ্বার ‘সৌজন্য’ বৈঠক করিয়েছিলেন। তাতে ধনকরের উপরাষ্ট্রপতি পদ পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। দলের সর্বভারতীয় নেতা যশবন্ত সিনহাকে উপরাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করলেও পরে পিছিয়ে গিয়েছিল তৃণমূল। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি নিগ্রহ, বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে দিল্লি পুলিশের বয়ান, বাঙালি মনীষীদের নাম উচ্চারণে গণ্ডগোল ইত্যাদিতে এমনিতেই তৃণমূল প্রচারের অনেক সুবিধা পেয়ে গিয়েছে।

খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র (Amit Shah) রবীন্দ্রনাথ ‘সান্যাল’ উচ্চারণ কিংবা বিজেপির নবনির্বাচিত সভাপতি নীতিন নবীনের মুখে রবীন্দ্রনাথের ‘শান্তি’তে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ইত্যাদিতে বিজেপিকে বাঙালি বিরোধী বলে প্রচার করার মোক্ষম সুযোগ হাতের সামনে পেয়ে গিয়েছে তৃণমূল। এসআইআর-এ মানুষের হয়রানি সর্বভারতীয় শাসকের বিরুদ্ধে বাংলার বাসিন্দাদের উষ্মা আরও বাড়িয়েছে। হিমন্তের ‘মিয়াঁ’ মুসলমানকে কষ্ট দেওয়ার ডাক কি তাহলে তৃণমূলের হাতে আরেকটা অস্ত্র তুলে দিল? যে অঙ্কে ভোটমুখী অসম বিজেপিরই থাকবে, বাংলা তৃণমূলের?

প্রশ্নটা জটায়ুর ভাষায়, হাইলি সাসপিশাস মশাই, হাইলি সাসপিশাস!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *