উত্তরেও হৃৎকম্প, নদী ঘুরলেই ডুববে জনপদ

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

নদীকে আমরা চিনি তার আজকের পথ দিয়ে। কিন্তু নদী নিজে তার পথকে চেনে না। পলি জমে নদীর তলা উঁচু হলে, এক পাড়ে ক্ষয় বাড়লে কিংবা প্রবল বন্যার জল পুরোনো কোনও নীচু পথ খুঁজে পেলে নদী হঠাৎ অন্যদিকে সরে যেতে পারে। ভূবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলে ‘চ্যানেল মাইগ্রেশন’ বা ‘অ্যাভালশন’। গবেষণার তথ্য বলছে, উত্তরবঙ্গের তিস্তা, তোর্ষা, কালজানি, মহানন্দার মতো নদীগুলি ধীরে ধীরে গতি পরিবর্তন করছে। গত কয়েক দশকে নদীর পাড় কয়েকশো মিটার পর্যন্ত সরে গিয়েছে। কোথাও নদী সরেছে দুই কিলোমিটারেরও বেশি। গবেষকরা বলছেন, আজ নদী যেখানে, কাল সেখানেই থাকবে- উত্তরবঙ্গের নদীগুলি এমন নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। ফলে অদৃশ্য বিপদ মাথায় নিয়েই বাড়ছে নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহর, জনবসতিগুলি।

চলতি বছর ২৮ মে আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা ‘ডিসকভার জিওসায়েন্স’-এ ‘তোর্ষা-কালজানি অন্তর্বর্তী অঞ্চলে নদীর পার্শ্বীয় গতিপথ পরিবর্তন এবং তার ফলে ভূমির ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তনের মূল্যায়ন’ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের চার গবেষক কাজটি করেছেন। তাঁরা ১৯৭৩ থেকে ২০২৩, অর্থাৎ ৫০ বছরের পরিবর্তন খতিয়ে দেখেছেন। তোর্ষা-কালজানির মাঝের প্রায় ৮৪৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে উপগ্রহ চিত্র, ভৌগোলিক তথ্যপ্রযুক্তি, সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং সংখ্যাভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও নির্দিষ্ট করে তোর্ষার ৯৯ কিলোমিটার এবং কালজানির প্রায় ৯৮ কিলোমিটার অংশকে পাঁচটি করে ভাগ করা হয়। তোর্ষায় ৪৬টি এবং কালজানিতে ৪৭টি নির্দিষ্ট ছেদবিন্দু ধরে নদীর পাড়ের অবস্থান মাপা হয়েছে। ১৯৭৩, ১৯৯১ এবং ২০২৩ সালের উপগ্রহ চিত্র একের উপর এক বসিয়ে দেখা হয়েছে কোথায় নদী সরে গিয়েছে, কোথায় জমি কেটেছে এবং কোথায় নতুন পলি জমেছে। মাঠে গিয়ে তথ্য মিলিয়েও দেখা হয়েছে। গবেষণায় চমকপ্রদ একাধিক তথ্য উঠে এসেছে। তোর্ষার একটি নির্দিষ্ট ছেদবিন্দুতে ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নদীর বাঁ পাড়ের সরণ ২,০৮৫.৪০ মিটার অর্থাৎ প্রায় ২.১ কিলোমিটার। কালজানির সর্বোচ্চ ডান পাড়ের সরণ ১৯৭৩ থেকে ১৯৯১-এর মধ্যে ৭৬৩.২৪ মিটার। অর্থাৎ কয়েক দশকের ব্যবধানে নদী তার পাড়ের অবস্থান বদলাচ্ছে। আরও ভয়াবহ হল জমির হিসাব। ১৯৭৩ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে তোর্ষার একটি উচ্চক্ষয়প্রবণ অংশে নদী কেড়ে নিয়েছে প্রায় ৩৯১.৪৮ হেক্টর জমি। কালজানির সবচেয়ে অস্থিতিশীল অংশে ক্ষয়ের পরিমাণ ২৭৬.২৫ হেক্টর।

৫০ বছরে তোর্ষা-কালজানির মাঝের ভূদৃশ্যও আমূল বদলেছে। ১৯৭৩ সালে গবেষণা এলাকার ৪৯.৬৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৪২১.৫৬ বর্গকিলোমিটার ছিল ঘন সবুজে ঢাকা। ২০২৩ সালে তা নেমে হয়েছে মাত্র ১৪.৮৬ শতাংশ বা ১২৬.৩৬ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ পাঁচ দশকে ঘন উদ্ভিদের আওতা কমেছে ২৯৫.২০ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে, কৃষিজমি বেড়েছে ১৫৭.৭৪ বর্গকিলোমিটার। গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং জমির ব্যবহার পরিবর্তন একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।

২০২৩ সালে কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষকের একটি গবেষণাপত্র এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় ১৯৯০, ২০১০ ও ২০২০ সালের ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহ চিত্র ব্যবহার করে জলপাইগুড়ির তিস্তার গতিপথ, নদীর বাঁক, শাখা-প্রশাখা এবং জমির ব্যবহারের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় তিস্তাকে নিম্ন অববাহিকায় ধারাবাহিকভাবে গতিপথ বদলানো একটি অত্যন্ত গতিশীল নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর গতিপথ পূর্বদিকে সরে যাওয়ার প্রবণতাও পাওয়া যায়। পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের বিভাগীয় প্রধান শশাঙ্ক গায়েনের কথা, ‘আমরা ক্রমেই ভয়ংকর বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নদী নিয়ে কার্যত ছেলেখেলা হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত আর সময় নষ্ট না করে পদক্ষেপ করা।’

তিস্তাকে নিয়ে আরও পিছনে তাকালে ছবিটি আরও পরিষ্কার হবে। তিস্তা নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কিথ রিচার্ডস এবং তাঁর সহকর্মীদের একটি গবেষণাপত্র ২০২১ সালে ‘দ্য জিওগ্রাফিক্যাল জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয়। তাঁরা ১৭৬৫-১৭৭৭ সালের জেমস রেনেলের মানচিত্র, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জেলা প্রশাসকদের নথি এবং ১৮০৭-১৮১১ সালে তিস্তা অঞ্চলে ঘোরা ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন বুকাননের দিনলিপি মিলিয়ে দেখেছেন। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় তিস্তার গতিপথে বড়সড়ো পরিবর্তন ঘটে এবং নদীটির নতুন গতিপথ ব্রহ্মপুত্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়।

একাধিক গবেষক তাঁদের ব্যাখ্যায় বলেছেন, হিমালয় থেকে সমতলে নেমে আসা নদী প্রচুর পলি বহন করে। সেই পলি নদীর নিজের খাতেই জমতে থাকে। নদীর তলদেশ ধীরে ধীরে উঁচু হলে এক সময় প্রবল বন্যার জল পাশের অপেক্ষাকৃত নীচু জায়গায় উঠে গিয়ে নতুন পথ তৈরি করতে পারে। আর সেই নতুন পথটি অনেক সময় বহু পুরোনো নদীখাতও হতে পারে। ফলে আজ যে জমিতে বসতি, চা বাগান বা চাষ হচ্ছে, অতীতে সেটিই নদীর পথ ছিল কি না তা জানা বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্য বলছে, নিশ্চিন্ত নয় মহানন্দাও। ২০২২ সালে ‘এসএন অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত হয় উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষকের একটি গবেষণাপত্র। গবেষণায় ১৯৭৫ সালের সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মানচিত্র এবং ১৯৯১ ও ২০১৯ সালের মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থার উপগ্রহ চিত্র ব্যবহার করা হয়। ১৯৯১ থেকে ২০১৯, ২৮ বছরে গবেষণাধীন অংশে মহানন্দা নদীপাড়ের সরণ ৭.৭২ থেকে ৪১১.১৬ মিটার পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। গবেষকদের ব্যবহৃত ‘ব্যাংক ইরোশন হ্যাজার্ড ইনডেক্স’-এ মহানন্দাপাড়ের বহু জায়গা উচ্চ থেকে অতিউচ্চ ঝুঁকির বলে চিহ্নিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক আরও একটি গবেষণায় বিপদের ভবিষ্যৎ মাপার চেষ্টা হয়েছে। ২০২৫ সালে মডেলিং আর্থ সিস্টেমস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষকের গবেষণাপত্র বড় বিপদের কথা শুনিয়েছে। গবেষকরা ১৯৭২ থেকে ২০২৪, ৫২ বছরের উপগ্রহ চিত্র নিয়ে মহানন্দার ২০টি অংশ বিশ্লেষণ করেছেন। ‘ডিজিটাল শোরলাইন অ্যানালিসিস সিস্টেম’ ব্যবহারের মাধ্যমে সরণ-হার এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল ব্যবহার করে তাঁরা ২০৩৪ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য নদীপথ পরিবর্তন অনুমান করেছেন। তাতে বহু জায়গায় মহানন্দার গতিপথ পরিবর্তনের প্রবল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিপদ শুধু নদীর আজকের নয়। বিপদ লুকিয়ে আছে নদীর আগামী পথেও। নদী গবেষকরা বলছেন, উত্তরবঙ্গের জন্য শুধু বন্যার মানচিত্র যথেষ্ট নয়। দরকার নদী কোথায় সরে যেতে পারে, কীভাবে ক্ষতি করতে পারে তার আলাদা মানচিত্র। গবেষক অম্বরীশ কার্জির কথা, ‘তিস্তার পুরোনো খাত, তোর্ষার ৫০ বছরের গতিপথ, কালজানির ক্ষয়প্রবণ অঞ্চল, মহানন্দার সম্ভাব্য পরিবর্তন সব একসঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ, নদী যখন পথ বদলায়, তখন শুধু জল আসে না। নদীর সঙ্গে সরে যায় জমি, রাস্তা, সেতু, কৃষি, বসতি এবং মানুষের ঠিকানা। আগে থেকে জেনে পদক্ষেপ করলে সেই ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *