উত্তরবঙ্গের প্রকাশনায় সম্ভাবনা ও সংকট

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


সুরজিৎ বণিক

বাংলা প্রকাশনার কথা উঠলে এখনও কলকাতার কলেজ স্ট্রিট, পুরোনো প্রকাশনা সংস্থা, ছাপাখানা, বইয়ের দোকান, পরিবেশক এবং কলকাতা বইমেলার কথা মনে পড়ে। তবে উত্তরবঙ্গে গত কয়েক দশকে তৈরি হয়েছে নিজস্ব পাঠক, লেখক, প্রকাশক ও বই বিক্রির পরিসর। এটাও ঘটনা যে উত্তরবঙ্গের বহু লেখক, গবেষক কিংবা বিষয় কলকাতার প্রকাশকদের কাছে পৌঁছায়। ফলে প্রশ্নটি এখন উত্তরবঙ্গে পাঠক আছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল, উত্তরবঙ্গে টেকসই প্রকাশনা ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব কি না।

শিলিগুড়িতে উত্তরবঙ্গ বইমেলা এবং বিভিন্ন জেলায় বইমেলা যে পরিসর তৈরি করে দিয়েছে, তা এই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। ২০২৪ সালের ৪২তম উত্তরবঙ্গ বইমেলায় ৯৪টি স্টল ছিল এবং আয়োজকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী আগের বছরের মেলায় প্রায় ৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। বড় প্রকাশকরাও উত্তরবঙ্গের বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ বইয়ের বাজার উত্তরবঙ্গে নেই— এমন ধারণার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

তবে প্রকাশনাশিল্প মানে শুধু বই ছাপা নয়। লেখক, সম্পাদক, প্রুফরিডার, প্রচ্ছদশিল্পী, মুদ্রক, বাঁধাইকার, পরিবেশক, বই বিক্রেতা- সব মিলিয়ে প্রকাশনার পরিবেশ তৈরি করে। কলকাতায় এই পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনে। উত্তরবঙ্গে সেই পরিকাঠামো সীমিত। ছোট প্রকাশকের ক্ষেত্রে মুদ্রণ, কাগজ কেনা, বাঁধাই, পরিবহণ, বিপণন এবং বই বিক্রি না হওয়ার ঝুঁকি থাকে সবসময়। কলকাতার বাজার ধরতে পরিবেশক, কমিশন ও রিটার্ন ব্যবস্থার অতিরিক্ত চাপও থাকে।

প্রকাশনা সুযোগে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে প্রযুক্তি। যেমন কম্পিউটার কম্পোজ, ডিজিটাল প্রি-প্রেস, ডিজিটাল প্রিন্টিং এবং অনলাইন পরিষেবা। এসব কারণে প্রকাশকের নিজের ছাপাখানা থাকা এখন আর অপরিহার্য নয়। তার ওপর হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি সামাজিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এখন সরাসরি পাঠকের কাছে বইয়ের খবর পৌঁছে দেওয়া যায়। বিক্রিও করা সম্ভব।

ফলে প্রকাশনা জগতে প্রবেশের বাধা কমেছে। তাই বলে সবটাই সহজ নয়। বই সহজে ছাপা গেলেও বিক্রি এখনও বেশ কঠিন। তার বড় কারণ পাঠকের অভাব। তাছাড়া বইয়ের বিষয়ও বড় ব্যাপার। কলকাতা বা অন্য জায়গা থেকে প্রকাশিত বইয়ের বিষয়ের সঙ্গে মিল থাকলে তার বিপণনের সীমাবদ্ধতা প্রথমেই এসে যায়। এর প্রতিকার করার যথেষ্ট সুযোগ আছে উত্তরবঙ্গে। সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে উত্তরবঙ্গের বৈচিত্র্য।

ডুয়ার্স-তরাই ও পাহাড়ের ভূগোল, বন ও বন্যপ্রাণীর অফুরন্ত ভাণ্ডার, নদীর নিজস্বতা, চা বাগান, সীমান্ত, জীববৈচিত্র্য, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস, খাদ্যসংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক সমাজজীবন- বিষয়ের অভাব নেই উত্তরবঙ্গে। স্থানীয় ইতিহাস, নদী ও চা বাগানের অতীতকথা, লোককথা, লোকগান, শিশু-কিশোরদের উপযোগী উত্তরবঙ্গকে জানার জন্য ছবি ও মানচিত্রসমৃদ্ধ প্রকাশনা ইত্যাদি স্বতন্ত্র পাঠক তৈরি করতে পারে।

উত্তরবঙ্গের বৈশিষ্ট্য তার ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। বাংলার পাশাপাশি রাজবংশী, নেপালি, বোড়ো, রাভা, লেপচা, কুরুখ, সাদরি ইত্যাদি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই উত্তরবঙ্গের প্রকাশনা শুধু বাংলা বইয়ে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, স্থানীয় ভাষাগুলির পাশাপাশি ইংরেজিতে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি, ইতিহাস, জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি নিয়ে উচ্চমানের বই প্রকাশের সম্ভাবনা যথেষ্ট। গবেষক, পর্যটক, শিক্ষার্থী, বিদেশে উত্তরবঙ্গের প্রবাসী মানুষের কাছে এই বইয়ের কদর হতে পারে।

তবে বিষয় থাকলেই বই তৈরি হয় না। গবেষণাকে পাঠযোগ্য বইয়ে রূপান্তর, তথ্য যাচাই, সম্পাদনা এবং ভালো প্রুফরিডিং জরুরি। একটি ভুল তথ্যও কোনও বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষতি করতে পারে। উত্তরবঙ্গের প্রকাশনাকে তাই আরও পেশাদার সম্পাদনা ও তথ্য যাচাইয়ের দিকে নজর দিতে হবে। যেখানে এখনও অনেক খামতি রয়ে গিয়েছে। পর্যটনকেও কাজে লাগাতে পারে প্রকাশনাশিল্প। ডুয়ার্স, দার্জিলিংয়ে আসা পর্যটকদের কাছে স্থানীয় ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে ছোট, তথ্যসমৃদ্ধ বই বিক্রির সুযোগ রয়েছে। সেজন্য হোটেল, রিসর্ট, পর্যটনকেন্দ্র, রেলস্টেশন কিংবা স্থানীয় বইয়ের দোকান হতে পারে সম্ভাব্য বিক্রয়কেন্দ্র।

উত্তরবঙ্গের বই মানে যেন লক্ষ্য শুধু উত্তরবঙ্গের পাঠক না হয়। ডুয়ার্সের লোকসংস্কৃতি বিষয়ের বইয়ের কদর থাকবে কলকাতার পাঠকের কাছে। তেমনই উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের চাহিদা থাকবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে। আবার জীববৈচিত্র্য নিয়ে ইংরেজি বইয়ের পাঠক হতে পারেন গবেষক বা বিদেশি পাঠকরা। উত্তরবঙ্গের বিষয়কে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ অনেক।

সেই লক্ষ্যে কলকাতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা জরুরি নয়। বরং নিজস্ব লেখক, নিজস্ব বিষয়, স্থানীয় ভাষাকে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র প্রকাশনার পরিসর তৈরিই হতে পারে আগামীর পথ। শিলিগুড়ি তার মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র হতে পারে বটে, কিন্তু সেই পরিসরে আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দুই দিনাজপুর, মালদা, দার্জিলিং, কালিম্পং, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।

তাও প্রশ্ন থেকে যায়, নিজস্ব বিষয় বৈচিত্র্যকে হাতিয়ার করতে পারলেই কি উত্তরবঙ্গের প্রকাশনা জগৎ নিজেকে টেকসই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারবে? তার উত্তর নির্ভর করবে প্রকাশনার মান, পেশাদারি সম্পাদনা, পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার পরিকল্পনার ওপর। সম্ভাবনা আছে বৈকি, প্রয়োজন শুধু সেই সম্ভাবনাকে সংগঠিত করার উদ্যোগ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *