নীরবতা ভেঙে খুলুক বাঁচার দরজা

শিক্ষা
Spread the love


আত্মহত্যা প্রতিরোধে সেপ্টেম্বরজুড়ে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে সহমর্মিতার কথোপকথন আরও জোরালো হোক।

স্বপনকুমার রায়

সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধের সচেতনতা নিয়ে কথা বলার সময়। ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পেরিয়ে গেলেও, বিষয়টি কোনও একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রতি বছর বিশ্বে সাত লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে প্রাণ হারান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে আত্মহত্যা মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। পরিসংখ্যান আমাদের কেবল একটি সংখ্যা দেখায়; কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং বহু মানুষের গভীর শোকও থাকে। মানুষের জীবনে মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশে অসংখ্য মানুষ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে একা মনে হয়। ব্যর্থতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট, পরীক্ষার চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় মানুষ বিপর্যস্ত হতে পারে। সেই সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষকে বিচার নয়, প্রয়োজন একজন শ্রোতা; উপদেশ নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা; একাকিত্ব নয়, প্রয়োজন পাশে থাকার নিশ্চয়তা।

আমাদের সমাজে শরীর অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। কিন্তু মন খারাপ, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা বা মানসিক চাপের কথা বলতে এখনও অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। অনেক সময় কিশোর-কিশোরী বা তরুণ সমস্যার কথা বলতে চাইলে আমরা বলি, ‘এত চিন্তা করছ কেন?’, ‘এটা তো সামান্য ব্যাপার’ কিংবা ‘মন শক্ত করো।’ কিন্তু যার কাছে সমস্যাটি পাহাড়সমান, তাকে ‘সামান্য’ বলে উড়িয়ে দেওয়া সমাধান নয়। মানসিক কষ্ট কোনও দুর্বলতার পরিচয় নয়। সাহায্য চাওয়াও দুর্বলতা নয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে, কথা বলুন, শুনুন এবং পাশে থাকুন।

কেউ যদি হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেয়, আচরণে পরিবর্তন আসে, দীর্ঘদিন মনমরা থাকে কিংবা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর হতাশা প্রকাশ করে, তাকে অবহেলা না করে কাছে বসা প্রয়োজন। প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘কেমন আছ? কোনও সমস্যা হলে আমাকে বলতে পারো।’ ‘চলো, আমরা একসঙ্গে সাহায্য নিই।’ সব সমস্যার সমাধান হয়তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু মন দিয়ে শোনার ক্ষমতা আমাদের প্রত্যেকের আছে। অনেক সময় শ্রোতা হয়ে ওঠাই সাহায্যের প্রথম ধাপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কলঙ্ক কমানো, খোলামেলা কথোপকথন এবং প্রয়োজনে সহায়তার সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের বার্তাও কথা শুরু করা ও নীরবতা বদলানোর আহ্বান জানায়।

একটি শিশুর বা কিশোরের মানসিক জগৎ গড়ে ওঠে পরিবার ও বিদ্যালয়ের পরিবেশে। তাই শুধু পরীক্ষার ফল, নম্বর কিংবা সাফল্যের হিসাব নয়, তার অনুভূতি, ভয়, হতাশা ও স্বপ্নের কথাও জানতে হবে। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, সন্তানের নম্বর তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। ব্যর্থতা জীবনের শেষকথা নয়; বরং ভুল থেকে শেখার একটি সুযোগ। বিদ্যালয়েও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত সচেতনতা প্রয়োজন। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষক নন; তিনি অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য আশ্রয়ও হয়ে উঠতে পারেন। তাই আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে অপমান বা শাসন না করে সংবেদনশীলভাবে কথা বলা জরুরি। পরিবারে খোলামেলা কথোপকথন, বিদ্যালয়ে জীবনদক্ষতার শিক্ষা এবং প্রয়োজনের সময়ে পেশাদার সহায়তার সমন্বয় প্রয়োজন।

ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য সরকারি টেলি মানস পরিষেবা চালু রয়েছে। ১৪৪১৬ অথবা ১৮০০ ৮৯ ১৪৪১৬ নম্বরে সহায়তা পাওয়া যায়। প্রয়োজনের সময়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক, চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পেরিয়ে গেলেও সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে সচেতনতার এই আবহকে কাজে লাগানো যেতে পারে। হয়তো আমাদের আশপাশেই কেউ কষ্ট পাচ্ছে, হয়তো সে সাহায্য চাইতে পারছে না। হয়তো একজন মানুষের প্রয়োজন, যে বলবে, ‘তুমি একা নও, তোমার কথা আমি শুনতে প্রস্তুত।’ তাই পোস্টার বা আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে সহমর্মিতার চর্চা শুরু হোক। কথা বলুন। মন দিয়ে শুনুন। প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। কারণ একটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং অনেক স্বপ্ন।

(লেখক শিক্ষক ও সাহিত্যিক। ঘোকসাডাঙ্গার বাসিন্দা।)

The publish নীরবতা ভেঙে খুলুক বাঁচার দরজা appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *