কল্যাণময় দাস
জীবনের কোনও নিজস্ব অর্থ নেই। ভালো বা খারাপ কিছু হয় না। নিয়মকানুন সব মানুষের তৈরি। আরও ভাবে ঈশান; পৃথিবীর সবকিছু জানা এক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে অর্থ তৈরির দায় শুধু আমার? কেন? অস্থিরতা বাড়ে ঈশানের।
পদাতিক এক্সপ্রেসে ভোর হচ্ছে। ঈশান আপার বার্থ থেকে নামে। একটু পরেই এনজেপিতে ঢুকবে। এইসময় সাধারণত ওর ঘুম ভাঙে না। সারারাত মিউজিক মিক্সের কাজ। সাউন্ড প্রডিউস করে। কলকাতায়। রাতভর মাথায় অতিপ্রাকৃতিক সুর ঘোরে। নাহ, এখন চা খেতে হবে। বাইরে তাকায়। বিস্তৃত সবুজ মাঠের ওপারে দার্জিলিং পাহাড়। শীতকাল। কুয়াশার আস্তরণ। পাহাড়ের এক আশ্চর্য রহস্য আছে। সেই রহস্যটা আসলে ঠিক কী, বুঝতে পারে না। আসলে ব্যাখ্যা করতে পারে না ঈশান। অন্য মানুষজনও কি পারে? কে জানে। কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়নি।
সাড়ে এগারোটায় নিউ কোচবিহার পৌঁছে বাড়ি যেতে যেতে দুপুর সাড়ে বারোটা। আজ রবিবার। বাবা মাংস নিয়ে আসে। মা তরিজুত করে রেঁধেছে। ব্রয়লার। ঈশান এটাই প্রেফার করে, ওর বোনও। ফলে বাবার খাসির মাংস পছন্দ হলেও ব্রয়লারই আনে। বাবা খায় এক-দুই টুকরো। মা শুধু মাংসের ঝোল আর আলু নেয়। খেতে খেতে গল্প করে ওরা। পুরোনো দিনের কথা। শুনতে ভালো লাগে ঈশানের। বোন কানে স্পিকার গুঁজে খেতে বসে। গান শুনতে শুনতে খাওয়ার অভ্যাস। কিছু জিজ্ঞেস করলে কানের স্পিকার খুলে ঘাড় বেঁকিয়ে বলে, ‘অ্যাঁ ?’
মা বলে, ‘তোর জন্য ঝালঝাল করেছি। আগে তো ঝাল খেতেই পারতিস না! কলকাতায় গিয়ে ঝাল খাওয়া শিখেছিস। আর একটু মাংস নিবি?’
-নাহ, আর দিও না। কলকাতায় তো এই খাই। একদিন শোল মাছের ঝোল করো ফুলকপি আর দেশি আলু দিয়ে!
-আচ্ছা। খেয়ে বিছানায় গিয়ে আরাম করে ঘুমা। শরীর ভালো হয়ে যাবে। হ্যাঁ রে, বিয়েটিয়ে কি করবি না? আমাদের তো বয়স হচ্ছে নাকি!
হালকা হেসে মাকে একটু আদর করে, বোনের মাথায় ঠ্যালা দিয়ে হাত ধুতে চলে যায় ঈশান। বাড়ি এলে শরীর ভালো হয়ে যায় ঈশানের। কলকাতার গরমে ও কাবু। শীত তবু ঠিক আছে। বাবা জানাল, এখন নাকি কোচবিহারে ঠান্ডাই নেই, ছোটবেলায় এখনকার চেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা পড়ত। কোনও কোনও বছর সূর্যের মুখই দেখা যেত না সপ্তাহজুড়ে। বৃষ্টিও। জামাকাপড় উনুনে সেঁকে পড়তে হত। ঠাম্মা পাকশালের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত নারকোলের রশি বেঁধে তার ওপর জামাকাপড় মেলে রাখত। এই ছিল কোচবিহার। এখন তো জামাকাপড় পরিষ্কার হয়ে শুকনো অবস্থায় ওয়াশিং মেশিন থেকে বের হয়!
বাড়িতে এলে ঈশান ফোন বন্ধ করে রাখে। তাড়া নেই। নেই মানে তাড়া রাখে না। বাইরের কারও ফোন ধরে না। ফোনে ফোনে জীবন যেন অতিষ্ঠ! সোশ্যাল মিডিয়াটা আছে। কালেভদ্রে সময় দেয়। এমনিতে ওর কাজের চাপ ভয়ানক। ক্রিয়েটিভ জগতে ছুটি নেই। ক্রমশ গাঢ় ঘুমে ঢুকে পড়ে ঈশান।
বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে তোর্ষার বাঁধে ওঠে। শীতের বিকেলটা ঝপ করে আবছা হয়ে যায়। একা একা চলার একটা আলাদা রহস্য আছে। বন্ধুবান্ধবের সাথে যেমন আলাদা একটা ব্যাপার ঘটে, তেমনি একলা চলার মজা অন্যরকম। বিশেষ করে যারা সুর নিয়ে কাজ করে, তাদের অনেকটা নীরবতা দরকার। ঈশান হাঁটতে হাঁটতে রাজবাড়ির পিছনের পদ্মদিঘির পাশ দিয়ে নেমে আসে। একজন প্রহরী নামধাম জিজ্ঞেস করে গেট খুলে দেয়। কুয়াশার ভেতর দিয়ে রাজবাড়ির পাকশালের দিকে এগোয়। চারদিকের সব আলোর ওপর যেন বরফকুচির মতো কুয়াশা লেপ্টে আছে।
পাকশালের দিকে এগোতে একটা সুর ছুঁয়ে গেল তাঁর কান! ভায়োলিন! কোচবিহার শহরে ভায়োলিনবাদক আছে? ছোটবেলায় গ্রাম থেকে প্রতি রোববার ভিক্ষে করতে আসত এক বুড়ো দাদু। সাদা ধবধবে চুল ঝরনার মতো কাঁধে নেমে এসে সারিঞ্জার সুরে স্লো মোশানে দুলত। এখন ঈশান বোঝে সেই সুর ছিল শিবরঞ্জনী। অনবদ্য বাজাতেন তিনি। তবে তাঁর দেখা মেলে না বহুদিন। ঈশানও আর শহরে শোনেনি বেহালার সুর।
বেহালার ছর টেনে সুর বের করা ভয়ানক প্র্যাকটিসের ব্যাপার! ঈশান এগোতে থাকে সুর কানে নিয়ে। প্রায় নির্জন রাজবাড়ি। জাঁকিয়ে শীত না হলেও নভেম্বর তো। সন্ধ্যাতেই গভীর রাত মনে হয়। এইসময় কে বেহালা বাজায় এখানে? এগোয়, সুর বড় হয়। এগোয়, সুর তীব্র হয়। এগোয়, সুর স্বচ্ছ হয়। হঠাৎ থেমে যায় সুর। কেউ একজন কুয়াশামাখা অন্ধকারে তড়িঘড়ি উঠে মিলিয়ে যায় যেন। ঈশান দ্রুত রাজবাড়ির সদর দরজার দিকে এগোয়। হাত দশেক দূরে রাজবাড়ির পোর্টিকোর আলোয় একজনকে বেহালা হাতে জোরে পা চালিয়ে যেতে দেখে। সিল্যুট অবয়ব। ঈশান আরও জোরে পা চালায়। দেখতে হবে বেহালাবাদককে।
প্রধান ফটকের কাছাকাছি জায়গায় ঈশান পৌঁছে যায় তার সামনে।
-হ্যালো।
-আমাকে বলছেন?
-হ্যাঁ।
-বলুন।
বেহালা আর ছর সমেত তার হাত দুটো পেছনে নিয়ে দাঁড়ায়। এক যুবতী। এখন তাঁর মুখ স্পষ্ট। অপরূপ রূপবতী না হলেও কুড়ি-বাইশ বছরের, যথেষ্ট সুন্দরী।
-ভায়োলিন আপনি বাজাচ্ছিলেন?
-হ্যাঁ।
-থামালেন কেন?
-বাড়ি যাবার সময় হয়েছে।
-বাড়ি কোথায়?
-বক্সিবাড়ি।
-আচ্ছা, আমি ঈশান বসু, রাসমেলার মাঠের ওখানে বাড়ি, চলুন এগোই।
-ঠিক আছে, আমি চলে যাব।
-আপনার নাম?
-রাজন্যা সরকার।
-নাইস টু মিট ইউ। আমি একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, পাঁচ বছর হল কলকাতায় থাকি।
-আচ্ছা।
-আপনার সাথে বন্ধুত্ব হলে ভালো লাগবে, আমার কন্ট্যাক্ট নম্বরটা রাখুন, আপনারটাও দিন।
-আমি মোবাইল ব্যবহার করি না।
-মানে?
-পছন্দ করি না।
-তাহলে যোগাযোগ?
-প্রয়োজন পড়ে না।
-কালকে আসবেন এখানে?
-প্রতিদিনই আসি, বাজাই, বাড়ি ফিরে যাই।
-বাহ, দারুণ, আমি কি আসতে পারি শোনার জন্য?
কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকে রাজন্যা।
-অবশ্য আপনার আপত্তি থাকলে আসব না।
-আসুন।
ঈশান হাঁটতে থাকে। বেহালার সুরটা ওর কানে স্পষ্ট। সম্ভবত কলাবতী। সন্ধ্যার রাগ। মেয়েটা কলাবতী বাজাতে পারে! আশ্চর্য! মদনমোহনবাড়ির সামনে নহবতখানার দিকে মাথা তুলে দেখে। সানাই বাজাচ্ছেন সানাইবাদক। খুব কমন সুর। নহবত বাজলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। তাহলেও বেহালার সুরটা কান থেকে যাচ্ছে না ঈশানের।
২
রাজন্যা কথা রেখেছে। বিকেল থেকে সন্ধে হচ্ছে এখন। রাজবাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে একটা সিঁড়িতে দুজন বসে আছে। ঈশান হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে হাতটা এগিয়ে রেখেছে বেহালার দিকে। তন্ময় হয়ে বাজাচ্ছে রাজন্যা। আজ কলাবতী নয়। বাজাচ্ছে ইমন। ইমনের সুরে কেমন যেন ব্যাকুলতা আছে। মনে হয় কি যেন হারিয়ে যাচ্ছে! অথচ কিছুই হারায়নি। তবুও মনে হবে কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। এমনই জাদু এই রাগে। ছরের টানে শুধু সুর বেরোচ্ছে না, যেন এই কুয়াশার বুকের ভেতর থেকে আলো বেরোচ্ছে। ব্যাকুল করা সেই আলোর রং।
-আপনাকে কে শিখিয়েছেন?
-বাবা।
-তাঁর সাথে দেখা করা যাবে?
-বছর পনেরো আগে হলে পারতেন।
-ওহ, সরি, সরি।
-উঠি।
-আর একটা কথা…
-বলুন।
-আপনি কি অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন?
-না।
-কেন?
-যান্ত্রিক লাগে।
-আপনি তো যন্ত্রই বাজান।
-ভালোলাগার জন্য বাজাই।
-তার মানে আপনি খুবই আত্মকেন্দ্রিক।
-হতে পারে।
-আমাদের কি মাঝে মাঝে দেখা হতে পারে?
-এখানেই দেখা হয়ে যেতে পারে কখনও-সখনও।
-কিন্তু আপনার কন্ট্যাক্ট নম্বর যে নেই আমার কাছে!
কোনও উত্তর না দিয়ে ছর ও বেহালা ব্যাগে ঢুকিয়ে রওনা দিল রাজন্যা। ঈশানও ওর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলতে থাকে, ‘আমি আপনার বাজানো সুরটা কি কোথাও ব্যবহার করতে পারি?’
এবারেও কোনও উত্তর নেই। ঈশান দ্রুত হেঁটে যায় সিংহদুয়ারের দিকে। কুয়াশার গাঢ় পর্দা ভেদ করে রাজন্যার স্কুটারের আলো কিছুক্ষণ জ্বলে হারিয়ে যায় রাজবাড়ির গেটের সোজাসুজি পুরোনো পোস্ট অফিসপাড়ার শান্ত, নিঝুম রাস্তার বাঁকে।
ঈশান দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। হাতের ডিজিটাল রেকর্ডারে রেকর্ড হওয়া ইমন। কলকাতার এসি স্টুডিওর সাউন্ডপ্রুফ চার দেওয়ালে বসে সে তো প্রতিদিন কত অজস্র ডিজিটাল প্লাগ-ইন, প্রসেসর আর সফটওয়্যার দিয়ে সুর তৈরি করে! অথচ, এই যে নিঃশব্দ অবছায়ায় ছরের টানে বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া- এর কোনও ফ্রিকোয়েন্সি মিটার বা ইক্যুয়ালাইজার তার জানা নেই।
বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে এসে বসে। অভ্যাসবশতই ল্যাপটপ খুলে হাত দুটো নিজে থেকেই কি-বোর্ডে চলতে থাকে। রাজন্যা সরকার… বক্সিবাড়ি… কোচবিহার… ভায়োলিন। ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম- সোশ্যাল মিডিয়ার অসীম মহাবিশ্ব। কিন্তু যতই সার্চ করে ততই যেন শূন্যতা ঘন হয়ে আসে! যেসব রাজন্যাদের পায় তারা এ নয়। একটা সাধারণ ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টও নেই!
দু’হাজার ছাব্বিশে একটা বাইশ-তেইশ বছরের যুবতী পুরো ইন্টারনেট দুনিয়ার বাইরে! ঈশানের সাউন্ড প্রডিউসার মন বলে, এটা অসম্ভব। একটা তীব্র ধন্দ ওর মাথার ভেতর পাক খেতে শুরু করে। মেয়েটা কি সত্যি, বাস্তব? নাকি অতিরিক্ত কাজের চাপ, ফোন-স্ক্রিনের ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ আর শৈশবের শহরে ফেরার ঘোর মিলেমিশে ওর নিজেরই তৈরি করা কোনও বিভ্রম? এক অলৌকিক হ্যালুসিনেশন? একাকিত্বের দর্শন? নিজের মন থেকেই এই ভায়োলিনের সুর আর একটা অধরা চরিত্র সৃষ্টি করে নিয়েছে? নির্ঘুমে ঈশান।
পরদিন আর রাজবাড়ির দিকে যায় না। রাজবাড়ির পেছনের পদ্মদিঘির পাশে কুয়াশার আস্তরণে মোড়া প্রাচীন শ্যাওলাধরা সিঁড়িগুলো যেন শতবর্ষের ইতিহাস বুকে নিয়ে চুপ করে বসে আছে। শহরের কোলাহল পার হয়ে আসা বিষণ্ণ নীরবতা সেখানে এক অন্য মেজাজ তৈরি করে। তোর্ষার বাঁধের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আচমকাই দেখে, তোর্ষার পাড় থেকে নীচে জলের কাছাকাছি কাশ থোপের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কেউ। রাজন্যা না? হাতে ভায়োলিন নেই। গায়ে একটা নীল রঙের সোয়েটার। ঈশান দ্রুত এগিয়ে যায়।
-রাজন্যা! এখানে? তোমাকে কালকে ইন্টারনেটে এত খুঁজলাম! কোথাও তোমার চিহ্ন নেই!
রাজন্যা মৃদু হাসে। আলোকিত নীরব হাসি।
-যাকে আপনি মেগাবাইট আর পিক্সেলের ভিড়ে খুঁজছেন, সে তো সেখানে থাকেই না। আপনারা স্ক্রিনের ভেতরের দুনিয়াটাকে জীবন ভাবেন। অথচ জীবনের আসল অর্থ তো এই নীরবতায়, এই বয়ে যাওয়া তোর্ষার বাতাসে।
-তুমি কি সত্যি? নাকি আমার কলকাতা ফেরত এক্সজস্টেড মাথার হ্যালুসিনেশন?
-আমি রক্তমাংসের মানুষ, ঈশানদা। কিন্তু আমি এমন এক পৃথিবীর মানুষ, যা আপনাদের এই ফাইভ-সিক্স জি নেটওয়ার্ক-দুনিয়া থেকে অনেক দূরে। যেখানে মানুষ যোগাযোগ রাখতে শুধু ফ্রিকোয়েন্সি নয়, মনকে ব্যবহার করে।
কাশ ফুল হাতে তাকিয়ে থাকে রাজন্যা। জল এখন অনেক দূরে। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কাশিয়ার ঝোপ। মাঝদরিয়ায় কলাগাছের বাগান। ওখানে কেউ কলার চাষ করে। বাঁধের পাড়ে অনেক দোকান এখন। ছেলেমেয়েদের হইহুল্লোড়। নিভুনিভু আধুনিক আলোর বৃত্তের বাইরে রাজন্যা আর ঈশান দাঁড়িয়ে আছে দূরে বহু দূরে চোখ রেখে। দুজনের মধ্যে বিস্তৃত চরাচরজুড়ে নীরবতা।
পরের ক’টা দিন এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাটে ঈশানের। সকাল কিংবা সন্ধেতে, কখনও তোর্ষার বাঁধের ওপর, কখনও রাজ আমলের পুরোনো পদ্মদিঘির ঘাটে দুজনের কত যে কথা হয়! রাজন্যা তার কথা বলে; পড়াশোনার কথা, মায়ের কথা, দাদার কথা, বাবা মদনমোহনবাড়ির নহবতখানায় সানাই বাজাতেন। ঈশান শোনায় কলকাতার যান্ত্রিক জগতের কথা- কীভাবে সুর তৈরি করতে গিয়ে তারা সুরের আত্মাকে মেরে ফেলে। কিন্তু রাজন্যা কখনোই নিজের বাড়ির ঠিকানা পরিষ্কার করে বলে না, নিজের অতীত নিয়ে গান, সুর, স্বর বাদে বিশদে কিছুই বলে না। আর ফোন নম্বর? সে তো এক অমূল্য অধরা বস্তু!
৩
একটা অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দেয় ঈশানের মধ্যে। কলকাতার ব্যস্ততা, অনবরত বাজতে থাকা নোটিফিকেশন, স্ক্রিনের উজ্জ্বল নীল আলো আর কাজের ডিপ্রেশন থেকে ও যেন এক অদ্ভুত মুক্তি পেয়ে যায় রাজন্যাকে পেয়ে। বেহালার ওই সুর আর এই মরশুমে ধীর প্রবাহিত তোর্ষার ছোঁয়া ওকে একটু একটু করে সারিয়ে তুলছিল যেন।
সাধারণত কোচবিহারে নভেম্বর-ডিসেম্বরে বৃষ্টি দেখা যায় না। কিন্তু দুপুর থেকে হঠাৎ বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে উত্তুরে হাওয়ায় বরফকুচি বৃষ্টি। ব্যাকুল হয়ে ওঠে ঈশান। কোনও কারণ ছাড়াই ছাতা আর রেইনকোট জড়িয়ে তোর্ষার বাঁধে গিয়ে ওঠে। তোর্ষার বাঁধ তখন কুয়াশা আর বৃষ্টির এক অদ্ভুত মায়াজালে। নদীতে কোনও গর্জন নেই বর্ষাকালের মতো। বৃষ্টি আর কুয়াশার সাথে মিশে গেছে বিশ্ব চরাচর।
রাজন্যা আজকেও এখানে! বাঁধের ঠিক নীচে কাশবনের থোপের আড়ালে জলছাপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ভিজে যাচ্ছে।
-তুমি এখানে?
রাজন্যা ঈশানের দিকে তাকায়। তার চোখে রহস্য।
-আজ আপনাকে সত্যি বলার দিন।
-কীসের সত্যি?
-আমার এই যোগাযোগহীন থাকার সত্য। আমার আত্মগোপনের সত্য।
তোর্ষার কুয়াশাছন্ন স্রোতের দিকে অপলক তাকিয়ে রাজন্যা। ঈশান তার মাথায় ছাতা ধরে।
-পাঁচ বছর আগে, ঠিক এইরকম একটা বৃষ্টির দিনে আমার বাবা মারা যান। বাবা ছিলেন সুরের মানুষ। কিন্তু আমার পরিবারে আধুনিকতার এমন এক তাণ্ডব এসেছিল, যেখানে সবকিছু মাপা হত টাকা আর সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-কমেন্ট দিয়ে। আমার দাদা, এই অনবরত জাজমেন্টাল দুনিয়া, সাইবার বুলিং আর স্ক্রিন-নির্ভর মানসিক চাপের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে। সেই অসহ্য বিষাদে বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়।
রাজন্যা থামে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
-আমি দেখেছি কীভাবে মানুষ স্ক্রিনের ওপারে বসে অন্য একটা মানুষকে নিমেষে নিঃশেষ করে দিতে পারে। আমি দেখেছি মানুষ কীভাবে হুট করে কারও জীবন থেকে আনফলো করে, ব্লক করে চলে যায়, যেন সেই মানুষটার অনুভূতির কোনও দামই নেই! আমি ভয় পাই, ঈশানদা! মানুষের এই যান্ত্রিক ভালোবাসাকে ভয় পাই। তাই কোনও আধুনিক যোগাযোগ রাখি না।
ঈশান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটা ওর মুখে বল্লমের ফলার মতো খোঁচা মারছে। বুঝতে পারে, রাজন্যা কোনও কাল্পনিক ভূত বা ভ্রম নয়। আধুনিক প্রযুক্তির নিষ্ঠুরতায় আহত সদ্য টিনেজ উত্তীর্ণ একটা মেয়ে, যে নিজের সুরকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
ঈশান আস্তে করে বলে, ‘আমি তো মেটাসিটি স্ক্রিনের দুনিয়া থেকেই এসেছি। আমাকেও কি তোমার ভয়?’
রাজন্যা ঈশানের দিকে ঘোরে।
-না। আপনি সুরের ভেতরের নীরবতা শুনতে পান। মন দেখতে পান। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনেও, আমার কোনও ডিজিটাল পরিচয় না পেয়েও শুধু সুরের টানে এই বৃষ্টিভেজা শীতে এখানে!
ঈশান রেইনকোটের পকেট থেকে ফোন বের করে। যে ফোনটা ওকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়, যা ওকে ডিপ্রেশন আর মানসিক ক্লান্তির দিকে ঠেলে দেয়। স্ক্রিনের দিকে তাকায়, তারপর এক মুহূর্ত না ভেবেই ফোনের পাওয়ার বোতামটা দীর্ঘক্ষণ চেপে ধরে বন্ধ করে দেয়।
চরাচরে প্রবল শীতের শব্দ আর তীক্ষ্ণ ফলার মতো হাওয়ার মধ্যে ঈশান আর রাজন্যা দাঁড়িয়ে।
-জীবনটা সত্যিই কোনও রেডিমেড অর্থ নিয়ে আসে না, রাজন্যা। ঈশ্বরও কোনও অর্থ লিখে পাঠাননি। জীবনের অর্থ আমরা নিজেরা তৈরি করি। কলকাতায় সুর প্রডিউস করি ঠিকই, কিন্তু নিজের ভেতরের সুরটা হারিয়ে ফেলেছি। এই কয়েকটা দিনে তোমার রহস্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে, নীরব রাজবাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে হাঁটতে গিয়ে আমি খুব ফিল করছি- স্ক্রিনের ভেতরে সত্যিকারের মিউজিক বা জীবন থাকে না। থাকে মানুষের ছোঁয়ায়, এই নীরবতার ভেতর।
-আপনি আবার কলকাতায় ফিরে যাবেন?
– যাব, সাউন্ড প্রডিউসার হিসেবে যাব না।
– তবে?
– গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত– যখন যখন তোমার বেহালার সুর ভেসে আসবে আমার কানে, আমি ঠিক তখন তখন ফিরে আসব। কোনও ফোন কল ছাড়া, নোটিফিকেশন ছাড়া। তুমি বাজাবে, আমি তোমার পাশে সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকব।
রাজন্যা চুপ করে থাকে। বৃষ্টি ভেজা আবছায়ায় চোখে এক নিঃশব্দ প্রশান্তির হাসি।
সাদা কাশের ফুল, আবছা আলো, উত্তুরে ভেজা হাওয়ার ভেতর বেহালার বুকে ছরের মতো দুটো মানুষ। অসীম নীরব চরাচরে সুরের ঈশ্বরীর হাত ধরে ঈশান। তারপর তোর্ষার শীতল জলের মতো কুয়াশাকে চুমু খেতে খেতে তিরতির করে গড়িয়ে যায় দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে।

