স্বীকারোক্তি
ববিতা দে
স্কুলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়িতে ফিরে আরণ্যক দশম শ্রেণির দ্বিতীয় অভীক্ষার খাতা দেখতে বসলেন। প্রথম চার-পাঁচটি খাতা মোটামুটি ভালো নম্বর পেলেও পরবর্তী খাতাগুলি আর দেখা যাচ্ছিল না। কেউ ভুল অঙ্ক কষেছে, কারও সাদা খাতা, কেউ বা শুধু প্রশ্নপত্র হুবহু টুকে রেখেছে। নম্বর দেবেন কোথায়? এই ছাত্রছাত্রীরাই কয়েক মাস পর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে। খাতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে দুঃখে-হতাশায় টেবিলে মুষ্টিবদ্ধ হাতে সজোরে আঘাত করলেন। স্ত্রী তনুকা ও বছর বারোর ভাইঝি তিতি ছুটে এল। তিতি জ্যাঠাইয়ের কাছে এসে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে গো তোমার?’
কোমল স্বরে অভিভাবকের মতো জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাথস পারেনি তাই না?’ হতাশ গলায় আরণ্যক বলেন, ‘আমি হয়তো ঠিকঠাক পড়াতে পারি না, আমার শেখানোর পদ্ধতিটাই ভুল। ওদের লেখাপড়ায় আগ্রহী করতে আমি অক্ষম।’ অবাক হয় তিতি, ‘কী বলছো জ্যাঠাই? তুমি আমাকে, দাভাইকে পড়াও। আমরা তো স্কুলে হাইয়েস্ট মার্কস পাই! তুমি হলে বেস্ট টিচার।’
ভাইঝির কথায় আরণ্যকের মুখে বিষাদের হাসি। বললেন, ‘আমার পড়ানো হয়তো ওদের পছন্দ হয় না। তাই শিখতে চায় না। আমি প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠতে পারিনি, সেটা উপলব্ধি করেছি। এই পেশা আমার জন্য নয় রে মা!’
কুড়ি বছর আগে একসঙ্গে মুম্বইয়ের ব্যাংক এবং নিজের শহরে স্কুলে চাকরি পেয়েছিলেন আরণ্যক। শিক্ষক হলে কত ছেলেমেয়ে উপকৃত হবে, মা বলেছিলেন। তাই মুম্বই যাননি। এই বয়সে পেশা পরিবর্তনের উপায় নেই। এই ছাত্রসমাজকে কোনওদিন দেখতে চাননি আরণ্যক। তমসাচ্ছন্ন আগত দিনের কথায় ভেবে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে ‘শূন্য’ দিতেই ইচ্ছে হল তাঁর।
লটারির টিকিট
শংকর সাহা
নিখিল প্রায়ই স্বপ্ন দেখত, যদি লটারি বেঁধে যায় তবে রিকশা বেচে টোটো কিনতে পারবে। এই যুগে ভাঙা রিকশায় আর যে কেউ উঠতে চায় না। আগে দিনের শেষে শ’চারেক টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরত আর এখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও কোনও-কোনও দিন একশো টাকা রোজগার হয় না।
সেদিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে নিখিল একমনে বেছে বেছে লটারির টিকিট খুঁজছে, এমন সময় পাড়ার সতীশ মাস্টার পাশ থেকে ডেকে বলেন, ‘ওহে নিখিল, এত মনোযোগ দিয়ে কী খুঁজছ?’
-ও কিছু না মাস্টারমশাই।
-লটারির টিকিট কাটছ বুঝি?
নিখিল লজ্জিত বোধ করে। কথা না বাড়িয়ে সোজা বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে না নামতেই নিখিল বাড়ি ফিরে আসে। উঠোন থেকে সজোরে ডাকতে থাকে, ‘ও পল্টুর মা, কোথায় গেলে সব। আমায় এক গ্লাস জল দাও তো? বড্ড গরম পড়েছে আজ।’
স্ত্রীর হাত থেকে জলের গ্লাস নিয়ে বারান্দায় বসে পড়ে নিখিল। বারে বারে নজর যায় পকেটের লটারির দিকে। সেদিন তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ে। পকেটে যত্নে রাখা সেই লটারি। শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে স্ত্রীকে বলে, ‘জানো, আজকাল লোকে আর এই ভাঙা রিকশায় উঠতে চায় না। যদি একটি টোটো কিনতে পারতাম…’
-টোটো! সে তো অনেক টাকা গো! আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা পাব কোথায়? এসব না ভেবে ঘুমিয়ে পড়ো এখন।
স্ত্রীর কথায় নিখিল পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে আর রঙিন স্বপ্ন নেমে আসে তাঁর দু’চোখে।
ভোরের আলো এসে পড়ে নিখিলের উঠোনে। গোয়াল থেকে বাছুরগুলো সজোরে ডাকতে থাকে। হঠাৎ স্ত্রী এসে নিখিলকে ডাকতে থাকে, ‘ওগো, ওঠো তাড়াতাড়ি। কে যেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাকছেন। বলছেন স্টেশনে যাবেন।’
সজোরে উঠে বসে নিখিল। জানলার ফাঁক দিয়ে মুখে এসে রোদ পড়ে। নিখিল বুঝতে পারে সে যেন বাস্তবে দাঁড়িয়ে আছে। তখনও পকেটে সযত্নে রাখা লটারির টিকিট!
The submit অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.
