(নিছক ‘বিজেপি জুজু‘ বা প্রতীকি তোষণের রাজনীতি দিয়ে যে আর বাংলার শিক্ষিত সংখ্যালঘু যুবসমাজকে বোকা বানানো যাবে না, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।)
পল্লব বসু
ভারতের রাজনীতিতে একটি প্রবাদ খুব প্রচলিত—ভয় হলো রাজনীতিকদের সবচেয়ে বড় মূলধন। আর বাংলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই ভয়ের রাজনীতি গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। কখনও বামফ্রন্ট, কখনও বা তৃণমূল কংগ্রেস—শাসকদলের রং বদলালেও, সংখ্যালঘু সমাজকে নিরন্তর একটা অদৃশ্য আতঙ্কের ঘেরাটোপে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের বোঝানো হয়েছিল, ‘আমাদের ছাতাটা মাথার ওপর থেকে সরে গেলেই তোমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।’ কিন্তু ২০২৬-এর রাজনৈতিক ডামাডোল এবং সমাজমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের যুগে দাঁড়িয়ে বাংলার সংখ্যালঘু সমাজ আজ এক ঐতিহাসিক পালাবদলের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা আজ রাজনৈতিক নেতাদের ছুড়ে দেওয়া এই ‘ভয়ের ন্যারেটিভ’ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছেন।
দীর্ঘকাল ধরে বাংলার মুসলিম সমাজকে একটি অখণ্ড ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর। যেন এই বিশাল সম্প্রদায়ের সবার চাহিদা, অভাব বা অভিযোগ একটাই। রাজনীতিকরা মনে করতেন, ভোটের আগে কয়েকটা ইফতার পার্টিতে যোগ দিলে, মাথায় ফেজ টুপি পরলে বা দু-একটা উর্দু শায়েরি আওড়ালেই এঁদের মন জয় করা যায়। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সংখ্যালঘু সমাজের নতুন প্রজন্মের দাবিগুলো একেবারেই অন্যরকম। হাতে স্মার্টফোন থাকা, উচ্চশিক্ষিত একজন সংখ্যালঘু তরুণের আকাঙ্ক্ষা আর পাঁচজন সাধারণ তরুণের মতোই। তিনি জানতে চাইছেন, তাঁর এলাকায় ভালো স্কুল বা হাসপাতাল কেন নেই? কেন তাঁকে পেটের দায়ে মুর্শিদাবাদ বা মালদহ ছেড়ে ভিনরাজ্যে গিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে? কেন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোতে কোনো শিল্প গড়ে উঠল না?
এই প্রশ্নগুলোই বাংলার রাজনীতির পুরোনো সমীকরণকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সাচার কমিটির রিপোর্ট বহু বছর আগেই দেখিয়েছিল যে, আর্থসামাজিক সূচকে বাংলার মুসলিমদের অবস্থা দলিতদের চেয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে খারাপ। এত বছর পরও সেই কাঠামোগত বঞ্চনার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। ইমাম ভাতা বা মোয়াজ্জেম ভাতার মতো প্রতীকি অনুদান দিয়ে সমাজের গুটিকয়েক ধর্মীয় নেতার মন হয়ত জয় করা গেছে, কিন্তু বৃহত্তর সমাজের অর্থনৈতিক অন্ধকার তাতে ঘোচেনি। আজকের তরুণ প্রজন্ম বুঝতে পেরেছে যে, এই ধরনের খয়রাতির রাজনীতি আসলে তাঁদের সামাজিক মূলস্রোত থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। তাঁদের গায়ে চিরস্থায়ীভাবে ‘তোষণপ্রাপ্ত’ বা ‘প্রিভিলেজড’ তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে, অথচ বাস্তবে তাঁদের পকেটে কোনও চাকরি নেই, হাতে কোনও পুঁজি নেই।
সবচেয়ে বড় বদলটা এসেছে সম্প্রদায়ের ভেতরের নিজস্ব রাজনীতিতে। এতদিন মনে করা হতো, সংখ্যালঘু সমাজে কোনও নিজস্ব রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নেই, তাই তাঁরা বাধ্য হয়ে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করবে। কিন্তু এখন সেই ধারণা ভাঙছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যেও শ্রেণিবিভাগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বঞ্চনার আলাদা আলাদা স্তর রয়েছে। তাঁদের নিজেদের এলাকার রাস্তাঘাট, পানীয় জল এবং দুর্নীতির মতো অত্যন্ত লোকাল বা স্থানীয় ইস্যুগুলো নিয়ে তাঁরা এখন সরব হচ্ছেন। তাঁরা চাইছেন এমন এক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যা তাঁদের শুধু ‘ভোট দেওয়ার মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করবে না, বরং তাঁদের আর্থসামাজিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করবে।
এই কারণেই যখন মূলধারার কোনও দল তাঁদের ‘ত্রাতা’ বা ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে প্রোজেক্ট করে, তখন নতুন প্রজন্মের মধ্যে একধরনের তীব্র বিরক্তি তৈরি হয়। তাঁরা এ দেশের সমানাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক। সংবিধান তাঁদের রক্ষা করবে, দেশের আইন তাঁদের অধিকার সুনিশ্চিত করবে। কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের দাক্ষিণ্যে তাঁদের বেঁচে থাকতে হবে কেন? এই আত্মসম্মানবোধের জাগরণই আজকের সংখ্যালঘু রাজনীতির সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।
নেতারা যখন তাঁদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য সংখ্যালঘুদের ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে তুলে ধরে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে ভয় দেখাতে চান, তখন আসলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় এই সংখ্যালঘু সাধারণ মানুষগুলোরই। এই ধরনের মেরুকরণের ফলে সমাজে তাঁদের প্রতি এক অযৌক্তিক অবিশ্বাস ও ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি হয়। অথচ মুর্শিদাবাদ বা উত্তর দিনাজপুরের কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ মুসলিম কৃষকের সঙ্গে রাজনীতির এই বিষাক্ত মেরুকরণের কোনও সম্পর্কই নেই। তিনি কেবল তাঁর ফসলের সঠিক দাম চান, সন্তানের জন্য একটা ভালো স্কুল চান।
বাংলার রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যে রাজনৈতিক দল ভাবছে কেবল ভয় দেখিয়ে বা আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে অনন্তকাল এই ভোটব্যাংককে নিজেদের পকেটে পুরে রাখা যাবে, তারা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছে। সংখ্যালঘু সমাজ আজ ‘ভোটব্যাংক’ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে প্রকৃত ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠার লড়াই লড়ছে। তাঁরা আর কারও দাবার বোড়ে হতে রাজি নন। আগামী দিনের বাংলায় সেই দলই প্রাসঙ্গিক থাকবে, যারা এঁদের ধর্ম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঠিক দিশা দেখাতে পারবে।
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

