খড়িবাড়ি: খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতালে (Kharibari Rural Hospital) টাকা দিলেই সরকারি পোর্টাল থেকে মিলছে জাল জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র। সম্প্রতি গোয়েন্দাদের নজরে এমনই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে। এরপরই নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য দপ্তর। তিন মাসে এই গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ইস্যু করা প্রায় ৮৫০ জাল শংসাপত্রের হদিস পেয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর। বড় একটি চক্র এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ও দালালদের একটি চক্র একাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিন মাসে প্রায় কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে বলে অভিযোগ। ওই ডেটা এন্ট্রি অপারেটর জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের একজন সাধারণ সম্পাদকের ছেলে। স্বাভাবিকভাবে এই নিয়ে রাজনৈতিক তর্জা শুরু হয়েছে।
দার্জিলিংয়ের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ তুলসী প্রামাণিক বলেন, ‘সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। সমস্ত তথ্য স্বাস্থ্য ভবনে পাঠান হয়েছে। অভিযুক্তদের শোকজ করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যথাসময়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হবে।’ তৃণমূলের দার্জিলিং জেলা কোর কমিটির সদস্য পাপিয়া ঘোষ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এমন যদি হয়ে থাকে তবে আইন আইনের পথে চলবে।’
রাজ্যে ২০২২ সালের মে মাস থেকে ‘জন্ম-মৃত্যু তথ্য কথা’ পোর্টালের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র ইস্যু করা শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে এই পোর্টালের মাধ্যমে সরকারিভাবে শংসাপত্র ইস্যু করা হয়। নিয়মানুযায়ী একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর সমস্ত তথ্য পোর্টালে আপলোড করবেন। গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকবেন সংশ্লিষ্ট প্রধান এবং হাসপাতালের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মেডিকেল অফিসার। পোর্টালে তথ্য আপলোড করা, তথ্য ভেরিফাই করে ওটিপির মাধ্যমে পোর্টালে ঢুকে ডিজিটাল সই করার দায়িত্ব তাঁদেরই।
খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতালে রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে ছিলেন ডাঃ প্রফুল্লিত মিঞ্জ। খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল ও বাতাসি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ইস্যু হওয়ার কথা। কিন্তু তদন্তে দেখা গিয়েছে সিকিম সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার শংসাপত্র এই হাসপাতাল থেকে ব্যাকডেটে ইস্যু করা হয়েছে।
সূত্রের খবর, সম্প্রতি এনফোর্সমেন্ট দপ্তর একটি অভিযোগের তদন্তে নেমে জানতে পারে, গুলমা চা বাগানের বাসিন্দা মৃত সুনীল সাবারিয়ার শংসাপত্রে মৃত্যুর দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, জীবনবিমার সুবিধা পেতে এমনটা করা হয়েছিল। আবার শিলিগুড়ি গোয়েন্দা দপ্তর থেকে একটি পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের সময় জানা যায়, এক ব্যক্তির জন্ম শংসাপত্র জাল করা হয়েছে। দুটি শংসাপত্রই খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ইস্যু হয়েছিল।
এনফোর্সমেন্ট দপ্তর সম্প্রতি একটি অভিযোগের তদন্তে নেমে জানতে পারে, গুলমা চা বাগানের বাসিন্দা মৃত সুনীল সাবারিয়ার শংসাপত্রে মৃত্যুর দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, জীবনবিমার সুবিধা পেতে এমনটা করা হয়েছিল। আবার শিলিগুড়ি গোয়েন্দা দপ্তর থেকে একটি পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের সময় জানা যায়, এক ব্যক্তির জন্ম শংসাপত্র জাল করা হয়েছে। দুটি শংসাপত্রই খডড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ইস্যু হয়েছিল।
এরপরই নড়েচড়ে বসে ব্লক ও জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকের মাধ্যমে বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্যকর্তারা জানতে পেরে স্বাস্থ্য ভবনে জানান। স্বাস্থ্য ভবন তদন্ত শুরু করেছে। আপাতত ডেটা এন্ট্রি অপারেটরকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিককে দেওয়া হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, শেষ তিন মাসে খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে প্রায় এক হাজার শংসাপত্র ইস্যু হয়েছে। কিন্তু খড়িবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল ও বাতাসি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রেকর্ড অনুযায়ী এই দুই হাসপাতালে জন্ম-মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৭০ জনের। অর্থাৎ এখান থেকে ইস্যু হওয়া প্রায় সাড়ে আটশো শংসাপত্রই ভুয়ো। এগুলির অধিকাংশই সিকিম এবং রাজ্যের বিভিন্ন জেলার। এছাড়া অধিকাংশ শংসাপত্র ব্যাকডেটে ইস্যু করা হয়েছে।
ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ শফিউল আলম মল্লিক এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। তিনি বলেন, বিষয়টি ডেপুটি সিএমওএইচ ডাঃ আনোয়ার হুসেন দেখছেন। ডাঃ হুসেনও কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। অভিযুক্ত ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পার্থ সাহা নিজের দায় ঝেড়ে ফেলে বলেন, আমার কাজ ডেটা এন্ট্রি ও তথ্য আপলোড করা। আমি এটাই করেছি। ভেরিফিকেশন করে ডিজিটাল সই করেন রেজিস্ট্রার। উনি সব বলতে পারবেন।
এদিকে, হাসপাতালের তৎকালীন রেজিস্ট্রার ডাঃ প্রফুল্লিত মিঞ্জের বক্তব্য, ‘ভেরিফিকেশন আমিই করতাম। তবে ডিজিটাল সইয়ের ওটিপি ডেটা এন্ট্রি অপারেটরকে শেয়ার করতাম।’ জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ তুলসী প্রামাণিক বলেন, ‘সমস্ত তথ্য স্বাস্থ্য ভবনে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের শোকজ করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। শেষ হলেই আইনমাফিক পদক্ষেপ করা হবে।’
জেলা তৃণমূল মহিলার সাধারণ সম্পাদক পপি সাহা ফোনে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ছেলে অসুস্থ, বাড়িতে আছে।’ ফাঁসিদেওয়ার বিজেপির বিধায়ক দুর্গা মুর্মু বলেন, ‘শুধু তৃণমূল নেত্রীর ছেলে নন, সঠিক তদন্ত হলে এই চক্রের সঙ্গে তৃণমূলের তাবড় তাবড় নেতাদের নাম পাওয়া যাবে। ভোটব্যাংক ঠিক রাখতে এবং অনুপ্রবেশকারীদের সুযোগ করে দিতে সরকারি সিলমোহরে জাল নথি তৈরিতে মদত করছে তৃণমূল। আর তাই এসআইআর কিংবা সিএএ নিয়ে এত বিরোধিতা করছে তৃণমূল। তাঁর সংযোজন, তবে বিজেপির তরফে বিষয়টি নিয়ে সঠিক জায়গায় অভিযোগ জানানো হবে। দুর্নীতির শেষ দেখে ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
