আড়ালে লুকিয়ে পরাশ্রয়ী জীবনের প্রচ্ছদ – Uttarbanga Sambad

আড়ালে লুকিয়ে পরাশ্রয়ী জীবনের প্রচ্ছদ – Uttarbanga Sambad

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


নবনীতা সরকার

আমার স্কুল জীবনের একটি গল্প বলি। তখন আমি বালুরঘাটে। সদ্য যোগ দিয়েছি প্রথম চাকরিতে। কত স্বপ্নের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছি। এইরকমই শীতকাল। খোলা আকাশের নীচে অনন্ত একটা পৃথিবী। ভোর হতেই ঘুম ভাঙা চোখে দেখি চারটে দেওয়াল, একটা সিমেন্ট ঢালাই করা চৌকির ওপরে বিছানা পাতা। তার ওপরে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি আমি। চারপাশে কেউ নেই, আমার জানলা, জানলার বাইরেই বিশাল বাগান, রাস্তা, ট্রেনের ঝাঁকুনি- সবই এক কলমের আঁচড়ে মিলিয়ে গেছে। আমি তখন নিজের পাড়া,  নিজের পথ, নিজের শহর ছেড়ে অন্য শহরে। পরিযায়ী। ‘পরিযায়ী’ শব্দটায় একটা ছেড়ে যাওয়ার গল্প আছে। কিছুটা চলমানতাও। স্বাধীন জীবনের একটি কাঁটাও ফুটে থাকে এই শব্দের মধ্যে। কেমন?

আমার বর্তমান চাকরিস্থল যেখানে, সেই সীমান্ত প্রদেশের একটি জীবন্ত ছবি হল সেখানকার কাঁটাতার ঘেরা নো ম্যানস ল্যান্ডগুলি। প্রতিদিন যাতায়াতের পথে নানা রংদার পাখির দেখা মেলে সেখানে। এরা কারা? শুনেছি এরা সব পরিযায়ী পাখি। শীতের গা ধোয়ানো রোদে শোনঘাট যখন গায়ে হলুদের পর সদ্য স্নান সারে, দুধসাদা শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বাটা হলুদের নির্যাস, তখন এই পরিযায়ী পাখিগুলি মিনে করা কানপাশা আর নাকছাবির মতো জ্বলজ্বল করে তার মুখে। কিন্তু পরিযায়ী মানে কি এতটাই নয়নাভিরাম? এতখানিই সুন্দর এবং সুখকর? ‘পরিযায়ী’ শব্দটি যতখানি শ্রুতিমধুর ঠিক ততখানিই কষ্ট বয়ে যাওয়ার ছাপ রয়েছে এই শব্দে। একটা উদ্বাস্তু জীবনের এবড়োখেবড়ো স্মৃতি। এই চিত্র এ দেশের সর্বত্র। খোঁড়া এক অর্থনীতির জাঁতাকলে পিষছে বহুকাল থেকে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু জীবন-… ‘শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোনোমতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ’ বাঁচিয়ে রাখার জন্য মাইলকে মাইল পথ হাঁটা। প্রাণই এক আশ্চর্য সম্পদ। কিন্তু পরিযায়ীদের প্রাণ আছে? নাকি তাঁরা শুধুই রাষ্ট্রযন্ত্রের এক একটি কল? প্রশ্ন হল- নিজের শিকর উপড়ে অন্য কোথাও গিয়ে মানুষ বসবাস করে কেন? কী প্রয়োজন? মূল প্রয়োজন একটাই- অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান। শোনঘাট থেকে সাঁইথিয়া, শিবপুর থেকে শিলচর- কান পাতলেই শোনা যাবে এই এক গল্প।

সেই কবেই শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত দেখেছিল রেললাইন পাতার কুলিলাইনে এই ছবি। উপলব্ধি করেছিল- এ তো নিছক অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধান নয়, একটা অদেখা বৃহদাকায় নখদন্তহীন নখর ভক্ষকের বৃদ্ধাঙ্গুলির তলে দলিত একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা, উৎপাদনব্যবস্থার চরম নির্মম দিক যা সাধারণ মানুষকে সুখের ললিপপ দেখিয়ে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে সমাজ সংসার সবকিছু থেকে। আমি নিজে দীর্ঘদিন নিজের ঘর ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করেছি, আমার মতো আরও সহস্র লক্ষ চাকরিজীবী রয়েছেন যাঁরা পেটের দায়ে এক স্থান থেকে বেরিয়ে অন্যত্র, হয়তো ততোধিক দুর্গম কোনও স্থানে, যোগাযোগ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা নিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার, যেখানে হাঁটাপথ ছাড়া আর কোনও যোগাযোগের মাধ্যম নেই এমন স্থানে দিনের পর দিন চাকরি করছেন। এমনও শুনি যে কেউ কেউ তো নৌকায় পার হওয়ার মতো সুব্যবস্থাও পান না, সাঁতরে পার হতে হয় তাঁর কর্মস্থলের লক্ষ্যে। শিক্ষকতার সূত্রে রিয়া, পাপিয়া, ত্রিসেনা, সরস্বতীরা আমার কাছে মাঝে মাঝেই ধরা দেয় তাদের জীবনের স্বপ্ন- স্বপ্নভঙ্গের ছবি নিয়ে।

ত্রিসেনা আমার ক্লাসের একটি ছোট্ট মেয়ে। পড়াশোনায় মন নেই। ভারী চুপচাপ। নিছক স্বভাব ভেবে এড়িয়ে যেতে যেতেও একদিন কী মনে হল, তাকে জিজ্ঞাসা করি- কী রে মা, একটাও কথা বলিস না কারও সাথে? তোমার বন্ধুবান্ধব নেই? পাশ থেকে প্রায় পুরো ক্লাস চেঁচিয়ে বলে ওঠে – আমরা কথা বলতে চাই ম্যাম, ও সরে সরে থাকে। মেয়ের মুখে চোখ পড়তেই দেখি– ওর থমথমে মুখ। চোখ টলটল করছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে মেয়েটি। পাশ থেকে স্বস্তিকা, পিংকিরা বলে ওঠে- ম্যাম, ওর কী একটা রোগ হয়েছে। আমি একটু উদ্বেগের সঙ্গে বলি – কী হয়েছে বল? পরে জানতে পারি, মেয়েটির পিসিওডি রয়েছে, একা মায়ের সংসার, বাবা দীর্ঘদিন দেশান্তরী। সুজল, আমার স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র, গত বছর পরীক্ষার ঠিক কয়েকদিন আগে খবর পাই, তার বাবা মারা গিয়েছেন। বেঙ্গালুরুতে পরিযায়ী ছিলেন। এই একটা দুটো উদাহরণই কোটি কোটি মানুষের ললাটলিখন। অথচ আপন মাটিতে নেই কর্মসংস্থান। পশ্চিমবঙ্গের নাম এই তালিকার শীর্ষে। এই ছবি দেখলে শ্রীকান্তর সেই হতবাক প্রশ্নবিদ্ধ চোখ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে না কি?

দীর্ঘ লকডাউন পিরিয়ডে কী হয়েছিল, এই সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিকের? কী হয়েছিল এদের বাড়িঘরের? আত্মীয়পরিজনের? একটা অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে গেল গোটা দেশের দৃষ্টি। যে দেশে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাই বেশি, সে দেশে – প্রাণ থাকলে সব হবে- ধরনের কথাই যেন অদৃশ্য হাতে এক ধাক্কায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় মানুষকে। দলে দলে মানুষের দেশে ফেরার সেই ছবি কি কখনও ভোলা সম্ভব? সে ফেরা তো সুখের হয়নি, স্তূপের মতো মৃতদেহ জড়ো হয়েছে শুধু।

নিজের দেশ, নিজের আকাশ ছেড়ে দিয়ে এই মানুষগুলি ভিনলোকে আস্তানা গড়েছিল দিনকতকের জন্য। চোখে কি স্বপ্ন ছিল না তাঁদের? যাঁরা অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশায়, সুযোগসুবিধার, সুশিক্ষা এবং সুস্বাস্থ্যের আশায় স্বদেশ ছেড়ে পরদেশে প্রবাসী জীবনযাপন করছেন,- তাঁদের জীবনের কথাও কোথাও একই। নয় কি? দেশ তুমি তাহলে কী দিলে? তোমাকে আমি কী দিলাম? স্বপ্নের মূল্য ভীষণ সস্তা। পথে পথে খোলামকুচির মতো বিকোয় এই স্বপ্ন নামক হারানো চিরকুট। কোনও মূল্য নেই। রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতার দাম চিরদিন গ্রাসরুট স্তরের মানুষকেই দিতে হয়েছে, হয়।  জীবনের দেয়ানেয়া ফুরায় না কোনওদিন, এ দাবি জীবনেরই যে পেটের দায়ে, সংসার পরিজন আত্মীয়বর্গ সন্তানকে দুধেভাতে রাখার জন্য সেই সংসার সন্তানকেই ঘরে ফেলে রেখে বা কোনওরকমে সঙ্গে নিয়ে অন্য কোনও দেশে অন্য কোনও রাজ্যে এসে দিনের পর দিন পড়ে থাকতে হয়। কত প্রাণ আর দেশে ফেরেও না। হোমসিকনেস শুধুমাত্র একটা রোগের নাম হয়ে রয়ে যায়।

সকাল এখন ৬টা। এক কাপ চায়ে ধোঁয়া আর মুখ থেকে নির্গত নভেম্বরের অন্তিম পর্যায়  মিলেমিশে একাকার। সদ্য ঘুম ভাঙা সকালে জানলার পর্দাটুকু সরালেই দেখতে পাই  ওপারে দাঁড়িয়ে আছে অদূর অতীতের আমি। আত্রেয়ীর পাড়ে বসে কত দিন কত সন্ধ্যা আত্রেয়ীর জলেই খোঁজার চেষ্টা করেছি মহানন্দার মুখ, নিজের মুখ। আসলে প্রত্যেকেই আমরা পরিযায়ী, ‘পরের জায়গা পরের জমিন’ আশ্রয় করেই বাঁচা। সন্তানের কপালে লেগে থাকা হালকা জ্বর আর মায়ের হাতে কলম- নিজের থেকে নিজেকে ছেড়ে গিয়ে আবারও নিজের ভিতরে প্রবেশ- রোজনামচার পান্তাভাত থেকে উঠে আসা এই ঘরকন্নার ছবিই আমার কাছে পরাশ্রয়ী জীবনের প্রচ্ছদ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *