শংকর ঘোষ
সকাল থেকেই কলকাতার আকাশে রোদ-মেঘের লুকোচুরি। গত কয়েকদিনের তীব্র গরম আর নেই। দুপুর গড়াতেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কয়েকশো কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়েও আমি নিশ্চিত এক পশলা বৃষ্টির পর শিলিগুড়ির বাতাসটায় কাঞ্চনজঙ্ঘার হিমেল স্পর্শ লেগে রয়েছে। এমন একটা দিনে শুক্রবার একবুক স্বপ্ন আর সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আমি রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আনুষ্ঠানিক দায়িত্বভার বুঝে নেওয়ার দিন মনে পড়ছিল মেঘ-রোদ্দুরের দিনে, মহানন্দার তীরে অথবা তিলক ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকার দিনগুলি। বৃষ্টিভেজা স্কুলফেরতের দিন। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ির মাটিতে পা রাখলে উত্তরের প্রকৃতির অকৃপণ হৃদয়ের শ্বাসপ্রশ্বাস টের পাওয়া যায়। উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘার রুপোলি মুকুট, পায়ের কাছে ডুয়ার্সের সবুজ গালিচা, বুক চিরে বয়ে যাওয়া তিস্তা-তোর্ষা, গৌড়বঙ্গে আত্রেয়ী-ফুলহরের যুগলবন্দি। দক্ষিণবঙ্গে আবার অতলান্ত বঙ্গোপসাগরের গর্জন, এক পটে এত বৈচিত্র্য পৃথিবীর খুব কম প্রান্তেই মেলে। নদী, পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য, সংস্কৃতি, উৎসব আর আমাদের মজ্জাগত আন্তরিকতার আতিথেয়তা। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ এক গন্তব্য। কিন্তু এতদিন কি আমরা এই বিপুল ঐশ্বর্যের সঠিক মূল্যায়ন করতে পেরেছি? আমরা কি পেরেছি এই সম্পদকে দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে এক সম্পূর্ণ নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত করে কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত করতে?
বলতে দ্বিধা নেই, আমি পর্যটনকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখি না। আমার লক্ষ্য পর্যটনের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিপুল বিনিয়োগ এবং আমাদের অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করা।
এই যাত্রাপথে আমার প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার হল, সম্ভাবনাকে সাফল্যে রূপ দেওয়া। আমরা শুধু পরিকল্পনার খেরোখাতা সাজিয়ে বসে থাকব না। পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও দায়িত্বশীল পর্যটনের অন্যতম শীর্ষ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই হবে লক্ষ্য। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই আমরা। তবে এই সাফল্য কোনও সরকারি ফাইলের পাতায় বা বিজ্ঞাপনের চটকদার কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে না, মাটিতে দাঁড়িয়ে যে বাস্তব পরিবর্তন দেখা যাবে, সেটাই হবে আমাদের কাজের আসল মাপকাঠি।
আমি বিশ্বাস করি, পর্যটন হওয়া উচিত সর্বজনীন। তাই একটি দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করছি। একদিকে যেমন দেশি ও আন্তর্জাতিক স্তরের উচ্চস্তরের পর্যটনের বিকাশ ঘটানো হবে, বিশেষ আগ্রহভিত্তিক পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা রাজ্যের অর্থনীতিকে এক নতুন দিশা দেখাবে, ঠিক তেমনই পর্যটনকে একটি সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ হিসেবে গড়ে তুলব। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল এবং বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, সহজলভ্য ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তঃরাজ্য ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। কারণ আমি মনে করি, ভ্রমণ বা পৃথিবী দেখার আনন্দ শুধু সামর্থ্যবানদের একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। পর্যটনের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের দেশকে জানার, শেখার এবং নিজের দেশের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধনে যুক্ত হওয়ার মৌলিক অধিকার আছে।
এমন অধিকারকে সার্থক করে তুলতে প্রয়োজন বিশ্বজুড়ে আমাদের রাজ্যের পর্যটনের নতুন ব্র্যান্ডিং। আগামী পাঁচ বছরে কার্যকর বিপণন, ডিজিটাল প্রচার এবং একটি সুদূরপ্রসারী টেকসই পর্যটন নীতির মাধ্যমে রাজ্যকে বিশ্বমঞ্চে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করবে আমাদের সরকার। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে আমাদের রাজ্য এক অসাধারণ কৌশলগত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। একে আমরা প্রকৃত অর্থেই পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অবারিত প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বিমান, রেল, সড়ক ও নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও পর্যটকবান্ধব করে তোলার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাহলেই পর্যটনের বিশ্ববাজার আমরা ধরতে পারব। যদিও আমি মনে করি, পর্যটন হল বিশ্বের সর্ববৃহৎ শিল্প, যা একা কোনও সরকারের পক্ষে একক প্রচেষ্টায় আমূল বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তাই কেন্দ্র-রাজ্য অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা এক মজবুত পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যার মূল লক্ষ্যই হবে রাজ্যের যুবসমাজের জন্য বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করা। বেকারত্ব ঘোচানো।
আমি ভারতবর্ষের বহু প্রান্তে ঘুরেছি, দেখেছি প্রকৃতির নানা রূপ। কিন্তু আজ দপ্তরের দায়িত্ব নিয়ে বুক ঠুকে বলতে পারি, আমাদের উত্তরবঙ্গের পাহাড় আর ডুয়ার্সের মতো অকৃত্রিম সৌন্দর্য, আর এখানকার মাটির যে মায়াবী সুবাস, তা ভারতের আর কোথাও নেই। ডুয়ার্সের চা বাগানের গন্ধ বা পাহাড়ি কুয়াশার যে নিজস্ব একটা ভাষা আছে, তা পর্যটকদের টানছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। কিন্তু শুধু প্রকৃতি দিয়ে তো আর আধুনিক পর্যটন চলে না! এখানকার পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে এবার এক-একটি বিশেষ পরিচিতি বা ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বহু দূর থেকে আসা পর্যটকদের ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রেখে প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন শৌচালয় এবং বিশ্রামাগার তৈরি করতে হবে। এই কাজগুলিকে আমরা প্রাধান্য দেব অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে।
দুর্ভাগ্যবশত, এই সুন্দর ব্যবস্থার পিঠে কিছু কালো দাগও রয়েছে। এখানকার পর্যটনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় দীর্ঘদিন থেকে। যার জেরে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা মাঝেমধ্যেই প্রতারিত হন। গাড়ির চড়া ভাড়া, হোটেলের খোঁজ করতে গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়া, এসবের চক্করে শান্তিতে বেড়াতে এসে মানুষ দিশাহীন হয়ে পড়েন, চরম হয়রানির শিকার হন। উত্তরবঙ্গের ঘরের মানুষ হিসেবে অতিথিদের এই হেনস্তা আমি কোনওভাবেই মেনে নেব না। এই সমস্ত অসাধু চক্রের দাপট এবং পর্যটকদের হয়রানি আমি কড়া হাতে বন্ধ করব, এটা আমার সংকল্প।
আরও একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিষয় হল দূষণ। আমাদের অধিকাংশ পাহাড়ি উপত্যকা বা ডুয়ার্সের বনাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলি আজ প্লাস্টিক আর আবর্জনার স্তূপে ঢাকা। যে মানুষটি শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু শান্তির খোঁজে, একটু বিশুদ্ধ বাতাসের টানে এখানে ছুটে আসছেন, প্রকৃতির এই কদর্য রূপ দেখে তিনি চরম বিরক্তি নিয়ে ফিরে যান। পর্যটনের নামে বছরের পর বছর ধরে এখানে এক শ্রেণির মানুষ পরিবেশ ধ্বংসের লীলা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, আগামীদিনে এই পরিবেশ ধ্বংসের মানসিকতা একদম বরদাস্ত করা হবে না। আমরা ‘সবুজ পর্যটন’ বা পরিবেশবান্ধব পর্যটনে (ইকো ট্যুরিজম) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেব। প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে, পাহাড়-জঙ্গলের নিজস্ব চরিত্রকে অক্ষুণ্ণ রেখেই পর্যটনের বিকাশ ঘটবে। প্রকৃতি হাসলে তবেই তো পর্যটকদের মুখে হাসি ফুটবে, তবেই তো সার্থক হবে আমাদের এই নতুন পথ চলা। আজ আমাদের উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এর মাধ্যমে আমি রাজ্যের সমস্ত নাগরিক ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের কাছে সহযোগিতা প্রার্থনা করছি। আসুন, সকলে মিলে একপথে চলি, সবাই মিলে আমাদের রূপসি বাংলাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভ্রমণের আঙিনা হিসেবে গড়ে তুলি।
(লেখক রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী)
(অনুলিখন : সানি সরকার)
The publish অসচ্ছলরাও এবারে প্রাণভরে ঘুরতে পারবেন appeared first on Uttarbanga Sambad.
