অপবাদের আঁধারে ইন্দ্রজিৎকে হারিয়েছেন মা, পুজোর আনন্দেও ঘরবন্দি বারুইপুরের পরিবার

স্বাস্থ্য/HEALTH
Spread the love


শাড়ি-জামা কারও কিছুই কেনা হয়নি। কী হবে ওসব দিয়ে? পুজো তো দূরের কথা, আমাদের ঘরের সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে ওই প্রভাস-আনন্দরা। দূরের একটা বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে সামনে রাখা ছেলের ছবি জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ষাটোর্ধ্ব অণিমা মণ্ডল। অভিমানভরা কান্নাভেজা গলায় বলেন, “দুগ্গাপুজো কেন, আর কোনও পুজোয় কোনও ঠাকুরেরই মুখ দেখব না। দেখবই বা কেন? মা দুগ্গা তা চাইলে, আমার ইন্দ্রজিৎকে তো এমনভাবে চলে যেতে হত না। বাড়ির কেউ অঞ্জলি দিতে যাব না (Durga Puja 2026)।”

দিনটা ছিল ৬ জুলাই, সকাল সাড়ে সাতটা। বাড়িতে ঘুমাচ্ছিল বছর পঁচিশের ছোট ছেলে ইন্দ্রজিৎ, বারান্দায় বসে ছিলেন বাবা অজিত মণ্ডল। পাশের ঘরে ছিলেন অণিমা। আচমকাই একদল ছেলে হই হই করে বাড়ির সামনে আসে। সঙ্গে আনন্দ, দিবাকর, প্রভাসও ছিল। আগের দিন ৫ জুলাই বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ বারুইপুরের সূর্যপুর হাটের কাছে নাচনগাছা গ্রামে এক কিশোরীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। পরদিন ভোরে কাছের পুকুরের জলে দেহ ভেসে উঠতেই পাড়া গরম হয়ে ওঠে। সোমবার ছিল সেই ভয়ংকর ঘটনার তিনমাস পূর্তি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উদ্বোধন করা পুলিশ চেকপোস্টে এখনও কড়া নজরদারি।

আরও পড়ুন:

Durga Puja 2026: Mother Lost Son to Allegations, Baruipur Family Stays Indoors
ছেলে ইন্দ্রজিতের ছবি আঁকড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন অণিমা মণ্ডল। চিত্র: বিশ্বজিৎ নস্কর।

এনকাউন্টারে মূল অভিযুক্ত প্রভাসের মৃত্যুর বিতর্ক ভুলে স্থানীয় পুজো কমিটির সহানুভূতি ইন্দ্রজিৎকে ঘিরেই। এলাকায় চাপা টেনশনের মধ্যেই অণিমার মুখোমুখি হতেই সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি তুলে বলছিলেন, “পুলিশ আসার আগেই আনন্দ, প্রভাসদের ধরে নিয়ে আমাদের দরজায় এসেছিল পাড়ারই একদল ছেলে। ইন্দ্রজিৎ ঘর থেকে বাইরে যেতেই বিকট চিৎকার শুনি। ভয় পেয়ে দূরে বারান্দায় এসে ছেলেকে ছাড়তে বহুবার চিৎকার করলেও কেউ শোনেনি। টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়…।” ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বেধড়ক মার খান বাবা অজিত মণ্ডল। তাঁর কথায়, “এত জোরে কানে চড় মেরেছিল যে এখন আর কিছুই শুনতে পাই না।”

তাণ্ডব চালিয়ে সেদিন ছেলেকে মারার পাশাপাশি বাড়িটি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল হামলাকারীরা। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার তিনদিনের মধ্যে সেই বাড়ি মেরামত করে প্রায় নতুন বানিয়ে দিয়েছেন। বাড়ি এসে দেখা করা মেজো ছেলেকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরির সঙ্গে গণপিটুনিতে যুক্ত অপরাধীদের শাস্তির আশ্বাস দেওয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে কৃতজ্ঞতা জানান অণিমা-অজিত দুজনেই।

বাড়ির পাশে নয়ানজুলিতে দীর্ঘ কাশফুলের অনেকটাই ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে ঝরে গিয়েছে। সূর্যপুর বাজারের কাছের মণ্ডপে বাঁশ বাঁধা সম্পূর্ণ, কাছেই একটা পুরনো গাড়ি-গ্যারেজে প্রতিমার গায়ে শেষবারের পলিমাটির প্রলেপ দিয়েছেন স্থানীয় শিল্পী। ভোরের হালকা হিমেল হাওয়া শরতের আগমনির জানান দিলেও অণিমার চোখে এখনও শুধুই ভাসে ছেলেকে ইট দিয়ে থেঁতলে মারার বিভীষিকাময় দৃশ্য। বারুইপুর থেকে জয়নগর যাওয়ার কুলপি রোডের পাশে বাড়িতে ঢুকতেই ঘরে ডেকে বসালেন। একে একে শোনালেন, কীভাবে সেদিন উন্মত্ত উল্লাসে একদল মানুষের পৈশাচিক তাণ্ডবের শিকার হয় তাঁর ছেলে।

ঘর থেকে ডেকে নিয়ে বাড়ির দরজায় তাঁর চোখের সামনেই কীভাবে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে ভীতু একটা ছেলেকে মারা হয়েছিল তার বর্ণনা দেন অণিমা। জানতে চান, “বলো চোখের সামনে যদি তোমার সন্তানের সঙ্গে কেউ এমন করত…? পুজো দূরের কথা, আজ বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছে,” দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন সন্তানহারা জননী। বলেন, “বড় আর মেজছেলের বিয়ে হয়েছে, ঘর-সংসার আছে। কিন্তু বছর কয়েক হল, গত দু’তিন বছর পুজোয় তো ওই ছোট ছেলেই বাজারের পাশের প্যান্ডেলে নিয়ে যেত। কটায় অঞ্জলি হবে, বউদিদের ও-ই জানাত। তিন ছোট ভাইপো ভাইঝিকে পুজোয় বেলুন-খেলনা কিনে দিত ও-ই। এবার ছোট ওই বাচ্চাদের কে খেলনা বন্দুক কিনে দেবে বলুন?” শেষ প্রশ্নের সৃঙ্গে ফের কান্নার আওয়াজ আবারও ভারী করে তোলে শরতের বাতাস। নীরব মা অনিমা।

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *