বারফট্টাই

বারফট্টাই

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


হামবড়াই! ব্রজবুলি থেকে ব্ল্যাকহোল

মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া

 

সেদিন জুনিয়ার সহকর্মী বলল, ‘দিদি ডিউটি রোস্টারে তিনদিনের একটা গ্যাপ দিও, ওই এক্সট্রা ডিউটিটা করেই নেব।’

–‘কেন রে?’

–‘প্রিওয়েডিং শুটিং যাব। বিয়ের জন্য ইএল নিয়েছি। এখন আর ছুটি দেবে না। এদিকে ক্যামেরাম্যান, মন্দারমণি, কটেজ বুকড। একটু অ্যাডজাস্ট করে দাও।’

–‘আচ্ছা সে নয় হল। কিন্তু এই প্রিওয়েডিং বস্তুটা কী?’

–‘কোথায় আছ তুমি? হবু বৌ মেকআপ আর্টিস্ট খুঁজে হয়রান। প্রিওয়েডিংয়ে কাশ্মীর যাচ্ছে। হানিমুনে? আরে দূর, জম্পেশ একখানা প্রিওয়েডিং শুটিং চাই।’

আমার অজ্ঞতায় করুণার হাসি হেসে সে চলে গেল। বিয়েতে বৌয়ের সঙ্গে আলাপের মধ্যেই সে ক্যামেরাম্যানকে ডিরেকশন দিচ্ছিল রিল বানানোর। পরে তার এনগেজমেন্ট, মেহেন্দি, গায়েহলুদ, জমকালো রিসেপশনে বরকনের নাচ। প্রি, পোস্ট সবকিছুই দেখেশুনে বলতে গেলে আমার বিশ্বদর্শন হল। সারারাত ঝগড়া, ধুমধাড়াক্কা, জিনিসপাতি ফেলার আওয়াজ পেলেও প্রতিবেশী বিকাশবাবু পরদিন পায়েসের বাটি হাতে একগাল হেসে বললেন, ‘আর বলবেন না, বৌয়ের জন্মদিন। পায়েস আর সব রান্না মিলি নিজেই রেঁধে সাজিয়ে ফেলেছে। আমি যাচ্ছি কেক আনতে। ক্যামেরার সামনে ওকে এট্টু খাইয়ে দেব। ফেসবুকের জন্য এটুকু তো করতেই হবে।’

সত্যি বলতে কী, ছেলেমেয়ের, বর বা বৌয়ের এবং অবধারিত নিজের জন্মদিন বা বৌয়ের জন্মদিন সবকিছুর সেলিব্রেশন সোশ্যাল মিডিয়াতে না দেখাতে পারলে ইদানীং তৃপ্তি হয় না আমাদের।

সেবার মিলু আর আমি পুজোর বাজার করে ক্লান্ত হয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকে কফি আর খাবারের অর্ডার দিয়ে বসলাম।

–‘খাসনি খাসনি।’ খাবারের প্লেট এলে আমি হাত বাড়াতেই মিলু হাঁ হাঁ করে উঠল।

–‘খাব না? খাবি না কেন? আগে ছবি তুলতে দে।’ খাবারের সামনে ছবি তোলা শেষ করে খেতে খেতেই সে খাবারের ছবি আপলোড করে দিল।

স্কুলের বন্ধু সোনার সঙ্গে এত বছর পর ফেসবুকেই যোগাযোগ। ওর ছবির কল্যাণে প্রায়ই দেখি সে বিদেশ যাচ্ছে বরের সঙ্গে। গাড়ির মডেল বদলাচ্ছে। দারুণ সব ড্রেস পরে দামি হোটেলে খেতে যাচ্ছে। কী খাচ্ছি, কী পরছি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অনুভব আমরা বাজারে টাটকা আনাজের মতো পর্দায় আপলোড করি। ‘আর বিকেল বেলায় হেলায় বিকায়’ স্টাইলে মুহূর্তে সে সব ভুলে যায় মানুষ, নতুন সাজগোজ এসে দাঁড়ায় পর্দায়। জামাইষষ্ঠী থেকে মুখেভাতের এই সেলিব্রেশন শো-অফ করার আরও আরও ডিজিটাল ম্যাটার সোশ্যাল মিডিয়া জুটিয়ে দিতেই থাকে, যাতে আমাদের ইমোশনকে মূলধন করে কর্পোরেট মালিকরা তাদের পুঁজি বাড়াতে পারে।

নিজেদের দেখানোর নেশার এই ফোঁটা ফোঁটা মধু দিয়ে কর্পোরেট দুনিয়ার একটা অংশকে বিলিয়নিয়ার বানানোর এই প্রক্রিয়ায় বলা যেতে পারে আমরা কাজ করছি শ্রমিক মৌমাছির। আর শ্রমের সেই নির্যাস সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শুষে নিচ্ছে কর্পোরেটের নির্দিষ্ট অংশ, যা আমাদের নিজেদের জন্য খুঁড়ে তোলা মস্ত এক কবর ছাড়া কিছুই নয়। কেননা আমাদের জীবনে বাস্তবে পুঁজি নিয়ন্ত্রিত এই প্যারাডাইমের অস্তিত্ব আসলেই নেই, তবু তার মধ্যেই আমরা ডুবে আছি অথবা যা নেই তাই চাইছি কেবলই, বা যা আছে তার উলটোটাকে আমরা ধরাছোঁয়ার মধ্যে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি কারণ অসংগতি ও স্ববিরোধিতাকেই মানুষ পছন্দ করে।

এই পুঁজিবাদ না থাকলে সোশ্যাল মিডিয়ার দরকারই হত না। কারণ শেষপর্যন্ত চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের চক্করে পড়ে সমাজ, পরিবার বা সমষ্টির চাহিদাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে আমরা স্রেফ নিজের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা এবং আত্মকেন্দ্রিকতায় অন্যের ভালোমন্দ বা সামাজিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজের স্বার্থ ও সুখকে সবার আগে রাখতে চেয়েছি। সমষ্টিগত উদ্যোগের চেয়ে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ক্রমশ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি নাকি?

এই জাঁক দেখিয়ে আমি আমি করে নিজস্ব ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য চারপাশের বাকি সব ক্রাইসিস, সামগ্রিক না পাওয়াকে ভুলে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে দেওয়াটাই তো পুঁজিবাদের লক্ষ্য। নিজের অতিরিক্ত ইগোর চারধারে কলুর বলদের মতো ঘুরে ঘুরে ব্যক্তিগত উপভোগের যে ফ্রেম বা ম্যাট্রিক্স তৈরি হয়েছে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে—তা প্রিন্ট, অডিও বা দূরদর্শনের মাধ্যমে কখনোই সম্ভব ছিল না। অনলাইনে অন্যের তৈরি নিখুঁত জীবনের সঙ্গে তুলনা করে হতাশা, উদ্বেগ আর হীনম্মন্যতার শিকার হচ্ছি। এছাড়াও সাইবার বুলিং বা ট্রোলের শিকার হয়ে অনেকেই মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছি। ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়িতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুজব ও মিথ্যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সমাজে বড় ধরনের বিভ্রান্তিও তৈরি করে। ফোন বা ল্যাপটপ ছুঁয়ে এত যে আবেগের আদানপ্রদান করছি, আমার স্পেস, শ্রম, মনোযোগ, যুক্তিবুদ্ধি আর সময়—যার বিনিময়ে ডোপামিন ক্ষরণ আর বিজ্ঞাপন দেখে কেনাকাটা ছাড়া আসলে আমি কিছুই পাচ্ছি না।

সেদিন এক জন্মদিনের পার্টিতে আমার তিন বন্ধু এক ধরনের ড্রেস পরে বেলুনের সামনে ছবি তুলছে অনলাইনে কেনা এই গর্জিয়াস জামার ছবি একসঙ্গে নিজেদের অ্যাকাউন্টে দেবে বলে। স্রেফ গাড়ি-বাড়ি, গয়নাগাটি, এথনিক অন্দরসজ্জাই তো নয়, আমি কত প্রতিবাদী, কতদূর শৈল্পিক, কতদূর প্রগতিশীল‌, নানা বিষয়ে আমার জানার লেভেল কতখানি—সমস্তটাই আমাদের জানান দেওয়া জরুরি। আর আছে বছরে ৩৬৫ দিনই কোনও না কোনও বিশেষ দিন। বিশ্বাস না করলেও সোশ্যাল স্ট্যাটাস বাড়াতে সাজিয়ে গুছিয়ে তাতে অংশগ্রহণ করতেই হবে। না করলে লাইক পড়বে না, রিচ আর ফলোয়ার কমে যাওয়ায় অস্তিত্বের সংকটে যে পড়ে যাব!

ভেবে দেখলে সোশ্যাল মিডিয়ার এই প্ল্যাটফর্ম আসলে ইলিউশন অফ লিবার্টি। ব্যক্তিগত কথা বলার, মত প্রকাশের স্বাধীনতাই তো মস্ত এক ডিসটোপিয়া। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া সেই ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়াটা আসলে খুড়োর কলের মতো আমাদের কনভিন্স করেই চলেছে। আড়ম্বরের আড়ালে মুখ ঢেকে ভেবে দেখিইনি নিজের চারপাশে ঘুরপাক খেতে খেতে কেবলই নার্সিসিস্টিক হয়ে পড়ছি আমরা।

কমিউনিটি না, ভালোবাসা নয়, গভীর কোনও অনুভবকে সময় দেওয়া না। যৌথভাবে কিছু করা বলতে আমরা কিছু পছন্দ হলে ভাইরাল করি, আর নাপসন্দ হলে খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে অন্যকে জাজ করি আর ট্রোল করি। দ্যাখো ভাই এই আমার শোয়ার ঘর, এই আমার স্বজনের মৃতদেহ, দ্যাখো এই আমার দুঃখ তাই কাঁদছি।

লেখালেখির এক জুনিয়ার বন্ধু তাদের বিয়ের ছ’মাস উদযাপন উপলক্ষ্যে কেক কাটল,

আর বছর ঘুরে চার মাসের মাথায় তাদের সেপারেশন হলে দুজনেই দুজনের অ্যাকাউন্ট থেকে চরম গালমন্দ করতে থাকল দেখে আর অবাক হলাম না। কেননা আত্মরতির নেশায় বুঁদ গল্পের সেই মস্ত ময়ালের মতো আমরা যে নিজেই নিজেকে খাচ্ছি। পৃথিবীর, দেশের, সমাজের, নিজেদের কোনও বিচ্যুতি আর স্বীকার করতে চাইছি না। ভুলগুলো তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় অহংকারের নকশাদার মোড়কে গুছিয়ে ঢেকে রাখছি।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গড়ের মাঠে গোরা পেটানো টেনিদার হামবড়াইয়ের মুগ্ধ পাঠক আমরা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদার ঢপবাজিতে আজও কল্পবিজ্ঞানের রাস্তায় মহাকাশ থেকে সমুদ্রের তলা পর্যন্ত ঘুরে আসি; পীযূষ বসুর লেখা ব্রজবুলিতে ব্রজনাথ কারফর্মার ঢপবাজিতে হাসতে পারি অগাধ, কেননা তাতে অনাবিল হাসির সৃজন আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিযোগিতামূলক এই দেখনদারির শেকড় খুঁজতে গিয়ে মনে হয় জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই ‘হম কিসিসে কম নেহি’ এই ভাবনায় ‘তবে আমারও তো সব চাই‌’। আরও উপভোগের এই চাহিদায় আসলে কনজিউম করার ভয়াবহ খিদেটাই আমাদের আপাদমস্তক খেয়ে ফেলছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের দেখানো এসব লেখাজোখা আর ছবির আড়ম্বর সমেত আকাঙ্ক্ষার বিরাট ব্ল্যাকহোলের চরম আকর্ষণে সম্মোহিত আমরা শেষপর্যন্ত মস্ত এক মৃত সুপারনোভার কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে পড়ছি নাকি?

অন্তঃসারশূন্য ফোতো কাপ্তান

বিপুল দাস

 

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে – ওপরে কোঁচার পত্তন, ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন। অর্থাৎ বাইরে ঝকমক করছে বহিরাবরণ। রীতিমতো গিলে-করা আদ্দির পাঞ্জাবি, কোঁচামারা দামি ধুতি। এ রকম ছবি আমরা অনেক গল্পে জমিদারের চরিত্র হিসেবে ইলাস্ট্রেশনে দেখেছি। এই সদ্য পার-হওয়া জামাইষষ্ঠী নিয়ে সমাজমাধ্যমে প্রচুর ব্যঙ্গচিত্র আমরা দেখলাম। সেখানেও জামাইবাবুর সাজপোশাক একেবারে সেই ওপরে কোঁচার পত্তন। এক হাতে ইলিশ মাছ, অন্য হাতে মিষ্টির হাঁড়ি ঝুলছে। এসব ছবি দেখলে অবশ্য ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন কি না বোঝার উপায় নেই। পেটে ছুঁচোয় ডন মারে বলে একটা কথা আছে। ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন, ঘরের অবস্থা করুণ। দিনান্তে শাকান্ন জোটে কি না সন্দেহ। অথচ ওপরের চাল দেখলে, গিলে করা পাঞ্জাবি আর সূক্ষ্ম দামি ধুতির কোঁচামারা দেখে বোঝার ঊপায় নেই আসলে হাঁড়ির হাল খারাপ। এই হল বারফট্টাই। বার অর্থাৎ বাইরে ফট্টাই, অর্থাৎ ফুটানি, মিথ্যে জাঁক, বাবুয়ানি। মোদ্দা কথা বাইরে চাকচিক্য দেখানো। সে সাজপোশাকে হতে পারে, লম্বাচওড়া লেকচার হতে পারে। এ রকম গল্পবাজ অনেক চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে। টেনিদা, ব্রজদা, ঘনাদা। শুধু গল্পের বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তব জীবনেও এ রকম দাদারা আছেন। এনারা সাধারণত পাড়ার চায়ের দোকান আলো করে বসে থাকেন। ওখানে হঠাৎ ঢুকে পড়লে মনে হয় ভুল করে কোনও বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে এসে পড়লাম নাকি। এসব আড্ডায় সাধারণত একজন প্রধান শিক্ষক থাকেন। দু’-তিনজন সহ শিক্ষক, বাদবাকি জ্ঞানভিক্ষু ছাত্রের দল। এঁরা জানেন না, হেন বিষয় শাস্ত্রে নেই।

একটা সময় ছিল, যাকে বলা হত বাবু কালচারের যুগ। সেই বাবুদের নিয়ে, বা তথাকথিত জমিদারদের নিয়ে নাটকে, সাহিত্যে, গল্পগাছায় অনেক রঙ্গব্যঙ্গ প্রহসন রচিত হয়েছিল। প্রায়শই দেখা যেত এসব উঠতি বড়লোকের দল তাদের বারফট্টাই দেখানোর জন্য পোষা বিড়ালের বিয়েতেও লক্ষ টাকা খরচ করতেন। শোনা যায়, তাদের অনেকে দামি ধুতির পাড় ছিঁড়ে ধুতি পরতেন। পাড়ের কর্কশতা তাদের নাকি কষ্ট দিত। গ্রাম থেকে আসা এসব জমিদারের দলকে শহুরে চালাক ইয়ারবকশির দল মধুভাণ্ডের মতো দোহন করে নিত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ফোঁপরা হয়ে পড়লেও ওপরচাল, ঠাটবাট বজায় রাখার জন্য উঁচু হারে দেদার ধার করতেন। এদের বলা হত ফোতো কাপ্তান। ফৌত হয়ে গেলেও ওপরের কাপ্তানি বজায় রাখার মরিয়া চেষ্টা করতেন। অন্তঃসারশূন্য এসব বড়লোকদের ভাঁড়ে মা ভবানী হলেও বারফট্টাই দেখানোর কমতি ছিল না। সাজপোশাক, জুড়িগাড়ি, বারবনিতা, ইয়ারবকশি ইত্যাদি সমভিব্যাহারে গঙ্গাপারের বাগানবাড়িতে দেদার ফুর্তির আয়োজনে ঘাটতি ছিল না। দেনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত হওয়ার পর একদিন নিঃশব্দে গ্রামে ফিরে যেতেন ফতুর হয়ে। জমিদারি লাটে উঠে গেছে, কিন্তু নীল রক্তের আভিজাত্যের অহমিকার গল্প আমরা জলসাঘর চলচ্চিত্রে দেখেছি ছবি বিশ্বাসের অসামান্য অভিনয়ে।

তখন দু’রকম বারফট্টাই আমরা দেখেছি। এক, যাদের সত্যিই অঢেল সম্পত্তি। তারা বারফট্টাই দেখালে সবাই স্বীকার করে নিত তাদের অহমিকা। কিন্তু আর এক ধরনের নববাবুবিলাসের কথাও আমরা পড়েছি, যাঁদের ফুটো পাত্রে আর জল নেই, গৌরব রবি অস্তমিত, কিন্তু দাপটের সূর্য যেন মধ্যগগনের মার্তণ্ড। মুখের বারফট্টাই কিছুই কমেনি।

বর্তমান সময়ে এসে এই সম্পদ, বিদ্যা, রূপ, বংশগৌরব, সর্বজ্ঞানের অধিকারিত্ব শুধু বহিরঙ্গে পালটেছে। সেই জমিদারের দল এখনও রয়েছে আমাদের আশপাশেই, কিছুটা ভোল পালটে। এদেরও বারফট্টাই কিছু কম নয়। দেশের বাড়িতে এদের ভূ-সম্পত্তির সীমা-পরিসীমা ছিল না। পাইক বরকন্দাজ নায়েব সহ এঁয়ারা মহালে যেতেন ফসল এবং খাজনা আদায় করতে। বেয়াড়া রায়তকে জুত করতেন কোড়ার বাড়ি মেরে। বেশি ট্যাঁ-ফোঁ করলে তাদের পাঠানো হত হরিণবাড়ি। গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, সাতমহলা বাড়ি সবারই ছিল। সবই যে মিথ্যে, তা নয়। অনেক সমৃদ্ধ পরিবারকেই স্থাবর-অস্থাবর প্রভূত সম্পত্তি ফেলে চলে আসতে হয়েছিল। কিন্তু কিছু সেই স্মৃতি কাতরতায় এতটাই আক্রান্ত হয়ে পড়তেন যে, কল্পনায় বারো ভুঁইয়ার একজন হয়ে পড়তেন। এ রকম লোক আমরা দেখেছি।

এই সময়ে চারপাশে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালে, কান পেতে রাখলেই বারফট্টাইয়ের ছবি অনেক দেখা যায়। সেই বাবুবিলাস হয়তো নেই, কিন্তু তার বদলে এসে বাগাড়ম্বরের দল। এদের বারফট্টাই শুনলে মনে হয় স্বয়ং টেনিদা গল্প বলে চলেছেন কেমন করে তিনি একাই একটা ইয়াব্বড় কেঁদো রয়েল বেঙ্গল বাঘ খালি হাতে মেরেছিলেন। কিংবা ঘনাদা আমাদের আড্ডায় বসে বলছেন তাহিতি দ্বীপে কীভাবে পল গঁগার আঁকা ছবি উদ্ধার করেছিলেন। এছাড়া আরও হরেক কিসিমের বারফট্টাই দেখানোর লোক আছেন। তাঁদের কেউ বিয়েবাড়িতে এক বালতি মাংস এবং পঁচাত্তরটি রসগোল্লা সাবড়ে দেবার গল্প বলেন। এঁদের গল্প বলার ভঙ্গিমা বড়ই মনোহর হয়। হাঁ করে শোনা ছাড়া শ্রোতাদের অন্য উপায় থাকে না। এক ধরনের বারফট্টাই দেখানোর লোক আছেন, যাঁরা তাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তি দেখানোর গল্প বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। কীভাবে থানার দারোগা তাকে দেখেই স্যালুট দিয়েছিল, কোন মন্ত্রী তার শ্যালকের মামার আপন ভায়রাভাই, কোন মস্তানকে তিনি এক ধমকে সিধে করে দিয়েছিলেন, কার পিসে বিপ্লবী ছিলেন এবং পিস্তল চালিয়ে এক ইংরেজ সার্জেন্টকে খুন করে রানাঘাট হয়ে তিব্বতে পালিয়ে গিয়েছিলেন – ইত্যাকার অজস্র গল্প শোনা যায়। এরা সব এ যুগের বারফট্টাইয়ের দল।

আমরা কথায় কথায় বলি – ওর তো খুব বারফট্টাই আছে। অর্থাৎ সে যা নয়, বড় বড় চাল মেরে নিজেকে সে রকম দেখানো। সমাজতাত্ত্বিক এবং মনোবিদরা সম্ভবত একই কথা বলবেন। মানুষের মনের গভীরে একটা সুপ্ত বাসনা থাকে নিজেকে প্রকাশ করার। এই যে আমি। আমাকে দেখো। এই প্রবণতা আসে হীনম্মন্যতা বোধ থেকে। আমিই বড়, আমি অনেক জানি, আমি অনেক সম্মানের অধিকারী, প্রকৃত শিক্ষা এই প্রবণতার বিরুদ্ধে। এই হীনম্মন্যতা বোধ থেকে জন্ম নেয় সমাজের চোখে নিজেকে একজন ‘কেউকেটা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। ফলত, সে যা নয়, সেই চরিত্র পাওয়ার জন্য, সেই ভূমিকায় নিজেকে দেখার জন্য উদগ্র বাসনায় ক্রমাগত একটা মিথ্যের জগৎ তৈরি করে তার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নিজেকে কল্পনা করে নেয়। আত্মশ্লাঘাপূর্ণ হয়, না পাওয়ার বেদনায় সান্ত্বনার প্রলেপ পড়ে। যা পেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পাওয়ার যোগ্যতা নেই, অথচ জনতার সপ্রশংস দৃষ্টি, মুগ্ধ শ্রোতা– আমিই তো বাসের ভেতরে একদল গুন্ডার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, আমিই ফাইনাল খেলায় শেষ মুহূর্তে গোল দিয়ে দলকে জিতিয়েছিলাম, আমিই দাঙ্গার সময় একা বেরিয়েছিলাম, আমি বস্তির ভেতরে আগুন উপেক্ষা করে ঢুকে দুটি শিশুকে বাঁচিয়েছিলাম।

এই হিরো ওয়রশিপ বা বীরপুজো সবাই কামনা করে। ওই সব বীরত্বব্যঞ্জক কাণ্ডকারখানা আমরা স্বপ্নে দেখি। নায়কের আসনে বসাই নিজেকে। সিজোফ্রেনিক পেশেন্টের মতো নিজে একটা কাল্পনিক ভুবন তৈরি করে তার ভেতরে কোকুনের ভেতরে কীটের মতো বাস করে। আর, যে বীরত্ব সে কল্পনা করে, সেই গল্প সে বলতে থাকে টেনিদার মতো, ঘনাদার মতো, ব্রজদার মতো। আমরা বলি – লোকটার বড় বারফট্টাই আছে।

এ সময়ে মানুষ মুহূর্তে জেনে যাচ্ছে সব খবর। তথ্যপ্রযুক্তির এই চূড়ান্ত উৎকর্ষের যুগে সমাজের অধিকাংশ মানুষের সিদ্ধান্ত তৈরির ক্ষেত্রে, জনমত গঠনের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শুধু যে চায়ের দোকানে বসে বাঘ মারার গল্প, বন্ধুদের আড্ডায় এক ওঝার বিষ নামিয়ে কালে-কাটা রোগীকে বাঁচিয়ে তোলার আঁখো দেখা হাল বয়ান করে – তখন সে নিজেও হয়তো মনে মনে প্রার্থনা করে এমন যেন হয়। এই সব বারফট্টাইওয়ালাদের নিয়ে রসিকতার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মনের গোপন বাসনার চাপেই অনেকে বারফট্টাই হয়ে যায়। আসলে যে অক্ষমতা আমাকে মসনদে বসতে দিল না, তার ফলে তৈরি-হওয়া হীনম্মন্যতা বোধ আমাকে বাচাল করে। আর, বিখ্যাত কবির সেই বাক্য, যা এখানে প্রণিধানযোগ্য, যা প্রবাদ হয়ে গেছে – সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর। এর উদাহরণ নিশ্চয় বিস্তারে বলার দরকার নেই।

 গালগল্পের বুদবুদে টেনিদার চা থেকে নেতার মাইক

 মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মিথ্যা কথা কইতে যে ভয় পায়, সে সত্যের উপর দাঁড়ায়।’ কিন্তু বাঙালির শতাব্দীর পর শতাব্দীর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বোধহয় অন্য কথা বলে। বাঙালি সত্যের উপর দাঁড়ায় না। বাঙালি দাঁড়ায় মিথ্যের বুদবুদের উপর। কারণ সত্য শক্ত, পা কেটে যায়। মিথ্যে নরম, পা ডুবে যায় আরামে।

আগে ছিল আড্ডার জন্য মিথ্যে। মনে পড়ে সেই মানুষটাকে, যিনি হাত পা নেড়ে গল্প বলতেন? মনে হত বাস্তব দুনিয়াটা ওঁর পকেটে বন্দি। বাড়িয়ে বলাটাও একটা শিল্প, আর সবাই শিল্পী হয় না। আমরা মুখিয়ে থাকতাম কখন তিনি আসবেন, নইলে আড্ডা জমত না। চাটুজ্জেদের রোয়াক থেকে মামার ড্রয়িংরুম, বাঙালির বানিয়ে বলার ট্র্যাডিশন বহু পুরোনো। টেনিদা হাঁফাতে হাঁফাতে বলতেন, ‘উটের মাংস খেয়েছিস কভু? ওরে ব্যাটা, সে চিবোলে চোয়াল খসে যায়।’ ঘনাদা মশা মেরে গম্ভীর গলায় অনায়াসে জমিয়ে দিতেন, ‘সাখালিন দ্বীপে যখন প্রথম পা রাখলুম।’ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মামা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলতেন, ‘আরে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তো সেদিনও ট্রাংককলে কান্নাকাটি করছিল। বললুম, দেখো জন, ওসব কিউবার ঝামেলায় আমি নেই।’ জটায়ুর ‘আমার বই পড়লে মানুষ বদলে যায়’ ছিল নিরীহ ফুলঝুরি। লেখক কলম কষে বানাতেন, আমরা বুঝতাম এটা খেলা। হাসতাম, তারপর চায়ের কাপে চুমুক দিতাম। মিথ্যের আড়ালে সত্যের চিমটি থাকত। এই গল্পগুলো আমাদের কল্পনার আকাশকে বড় করত। সেই মিথ্যেগুলো ছিল একান্তই ব্যক্তিগত, কাউকে ছোট করার জন্য নয়। বরং জীবনকে একটু রঙিন করার জন্য, ধূসর বাস্তব থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য মুক্তি পাওয়ার জন্য।

গোপাল ভাঁড় ভুলকে বুদ্ধি দিয়ে ঘুরিয়ে দিতেন। রাজা থেকে সভাসদ সবাই হেসে কুটোপাটি। বাংলা সিনেমায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ভুল বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে, জহর রায় মুখের ভঙ্গিতে, রবি ঘোষ একটা চাহনিতে, চিন্ময় রায় সরল ভীতু চরিত্রে আমাদের হাসাতেন। ওরাও সবাই নাট্যকার। স্টেজ লাগত না। পাড়ার বারান্দাই মিনার্ভা থিয়েটার হয়ে যেত। মিথ্যে? একশো ভাগ। কিন্তু ওই মিথ্যে কাউকে ঠকাত না। সারল্যভরা মন সেটা সহজেই গ্রহণ করত। আর যাত্রাপালার রাজা? ময়লা ধুতি পরে স্টেজে চ্যাঁচাত, ‘আমি এই রাজ্যের অধীশ্বর।’ আমরা জানতাম ও বিকেলে মুদির দোকান করে। তবু হাঁ করে দেখতাম। কাঠের তলোয়ার হাতেই ও রাজা হয়ে যেত। আর আমরা প্রজা। যাত্রার রাজা টিকিট কাটত না। টেনিদা চা খেত। তারা ছিল আমাদেরই মানুষ, আমাদেরই পাড়ার। তাদের মিথ্যেগুলো আমাদের হাসাত, কাঁদাত, কিন্তু কখনও প্রতারিত করত না। আজ সেই সরলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

তারপর এল ক্যামেরা। স্টেজ উঠে গেল মোবাইলের স্ক্রিনে। টেনিদার নাটকে দর্শক সামনে বসে হাসত, প্রশ্ন করত। ইনফ্লুয়েন্সারের নাটকে দর্শক শুধু স্ক্রল করে। লাইক দেয়, কমেন্ট করে ‘দাদা সেরা’, আর কোর্স কিনে ফেলে। এখন প্রতিটা ইনফ্লুয়েন্সার চব্বিশ ঘণ্টার একক নাটক করছে। চরিত্র একটাই, সফল আমি। সংলাপ একটাই, ‘আমি পারলে তুমিও পারবে।’ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ফিল্টার, স্ক্রিপ্ট লেখা মিথ্যে। টেনিদা ভুল বললে আমরা ধরে ফেলতাম। রিলসের নাটকে ভুল ধরার উপায় নেই। কাট, এডিট, রিটেক। আসল জীবনটা ডিলিট হয়ে যায়। কৃত্রিমতাকে আমরা সত্য বলে মেনে নিচ্ছি, কারণ আমাদের দেখার চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে আলোর ঝলকানি দেখে।

আজকের পর্দায় অম্বরীশ ভট্টাচার্য সেই পুরোনো ঘ্রাণটা বাঁচিয়ে রেখেছেন। গোলগাল মুখে, পায়ের ওপর পা তুলে আজগুবি গল্প ফাঁদেন। কোনও চপলতা নেই, আছে সারল্য আর আত্মবিশ্বাস। মনে হয় পাড়ার রকের দাদাই বসেছে। কাঞ্চন মল্লিক ঘাড় বেঁকিয়ে বলেন, ‘আরে ভাই, আমি হাত বাড়ালে ওপরওয়ালাও করমর্দন করতে আসে।’ রুদ্রনীল ঘোষ চোখ ছোট করে টেক্কা দেন, ‘দিল্লি বম্বে তো আমাদের ইশারায় চলে।’ এই তিন মূর্তির যুগলবন্দি যেন পাড়ার আড্ডার লাইভ টেলিকাস্ট। বলিউড ও হিন্দি ওটিটিতে ফেঁকনার ডক্টরেট বসে আছে। হেরা ফেরির রাজুর ‘ইক্কিস দিন মে পয়সা ডাবল’, ব্লাফমাস্টারের রয়ের ‘পুরে ইয়াকিন কে সাথ বোলো’, মির্জাপুরের গুড্ডুর ‘শুরু মজবুরি মে কিয়ে থে, অব মাজা আ রাহা হ্যায়’, পঞ্চায়েতের বিনোদের ‘ইংরেজি বোল বোল কে উল্লু বানায়া জা রাহা হ্যায়’, ফার্জির সানির জাল নোটের লেকচার — সবই কথার জাদু। হেরা ফেরির রাজু স্টেজে নেমে ধরা পড়ত। রিলসের নাট্যকার ধরা পড়ে না, শুধু ভাইরাল হয়। কারণ এখন ভাইরাল হওয়াই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি।

আর সবচেয়ে বড় নাটকটা হয় ভোটের মঞ্চে। ওটাই আসল রঙ্গমঞ্চ। নেতা স্টেজে ওঠেন। স্পটলাইট পড়ে। মাইক হাতে সংলাপ ছাড়েন, ‘আমি একা দিল্লি কাঁপিয়ে টাকা এনেছি। আগামী বছর রাস্তা হবে সিঙ্গাপুরের মতো।’ গলা কাঁপে, হাত ওঠে, চোখে জল আসে। দর্শক হাততালি দেয়। যাত্রার রাজা মিথ্যে সেজে তিন ঘণ্টা স্বপ্ন দেখাত। নেতা মিথ্যে সেজে পাঁচ বছর স্বপ্ন দেখায়। যাত্রার পর রাজা মুদির দোকানে ফিরে যেত। নেতা মিথ্যের পর গদিতে বসে যায়। টেনিদার ভালুকের গল্পে কারও ছেলে চাকরি হারায়নি। নেতার সিঙ্গাপুরের নাটকে হাজারটা ছেলের ভবিষ্যৎ স্ক্রিপ্ট থেকে কেটে বাদ পড়ে যায় নীরবে। এখানে মিথ্যে শুধু বিনোদনের খোরাক নয়, এখানে মিথ্যে হল ক্ষমতার হাতিয়ার। মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করাই এদের কাজ। আর আমরা সেই খেলার গুটি।

আমরা কেন টিকিট কাটি? কারণ বাস্তবটা বড্ড বোরিং। বাস্তবে আমরা কেউ রাজা না, কেউ হিরো না। বাস্তবে আমরা সবাই ক্লান্ত দর্শক। তাই যাত্রার টিকিট কাটি কুড়ি টাকা দিয়ে। রিলসের নাটক দেখি ফ্রিতে। আর নেতার নাটকের টিকিট কাটি ভোট দিয়ে। টিকিটের দাম একটা গোটা প্রজন্ম। যে বাবা ছেলের মাইনেটা দিতে পারে না, সে বন্ধুদের কাছে নাটক করে বলে, ‘আমার ছেলেকে অক্সফোর্ড ডাকছে।’ আমরা জানি ওটা মিথ্যে। তবু হাততালি দিই। কারণ ওই পাঁচ মিনিটের নাটকটা ওই বাবার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। চায়ের দোকানে যে বলে, ‘মুখ্যমন্ত্রী আমার কাঁধে হাত রেখেছিলেন’, আমরা পুলিশ ডাকি না। চা-টা খাতায় লিখে পালটা প্রশ্ন করি, ‘তারপর কী হল দাদা?’

বাঙালি, তোমার নাটক প্রিয়। কিন্তু এবার চোখ খোলো। রকের দাদা নাটক করে তোমায় হাসায়। রিলসের দাদা নাটক করে তোমায় বোকা বানায়। মঞ্চের দাদা নাটক করে তোমায় লুট করে। টেনিদার নাটকের শেষে যবনিকা পড়লে সবাই মিলে চা খেতাম। আজকের নাটকের শেষে যবনিকা পড়লে দেখি পকেট ফাঁকা। কিউআর কোড স্ক্যান করার আগে একবার ভাবো। ওটা নাটক নাকি ফাঁদ? মিথ্যে ছাড়া থিয়েটার হয় না। কিন্তু থিয়েটার দেখে জীবন বেচে দেওয়া যায় না কখনও।

দিনশেষে টেনিদা, অম্বরীশ, রাজু, গুড্ডু ভাইয়া— এরা আমাদের ভেতরের সেই ছোট্ট শিশুটার খোরাক, যে এখনও ডানা মেলে উড়তে চায় আকাশে। জীবন যদি স্কেল দিয়ে মাপা সত্য হত, পৃথিবীটা ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যেত একদম। তাই একটু রং চড়ানো, একটু বাড়িয়ে বলা, সত্য মিথ্যের দোলাচলেই বেঁচে থাকে আমাদের আড্ডাবাজি রোজ। পর্দা নামাও। আলো জ্বালো। আর নিজের জীবনের নাট্যকার নিজে হওয়ার সময় এসেছে আজ। মনে রাখতে হবে, অভিনয় আর প্রতারণার মধ্যে রেখাটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। অভিনয় আমাদের বড় করে, প্রতারণা করে ঠিক উলটোটাই। আমরা কি অভিনেতা হব, নাকি হব প্রতারিত দর্শক? সিদ্ধান্তটা একান্তই আমাদের।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *