স্তন ক্যানসার মানেই কি মাতৃত্বের পথে থেমে যাওয়া? চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই প্রশ্নটিও অনেক মহিলার মনে আসে। সন্তান জন্মের পর কি নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পান করানো সম্ভব? একটি স্তন অস্ত্রোপচারে বাদ পড়লে কী হবে? ক্যানসার আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটা?
চিকিৎসকদের মতে, স্তন ক্যানসারের অতীত ইতিহাস থাকলেই স্তন্যপানের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। তবে উত্তরটা নির্ভর করে ক্যানসারের চিকিৎসায় কী ধরনের অস্ত্রোপচার ও রেডিয়েশন হয়েছে এবং বর্তমানে কোনও ওষুধ চলছে কি না, তার উপর।
আরও পড়ুন:
তাঁদের মতে, স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা হয়েছে মানেই স্তন্যপান করানো যাবে না, এমন ধারণা ঠিক নয়। আগের চিকিৎসায় স্তনের কতটা পরিবর্তন হয়েছে, সেটি বুঝে মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ পরিকল্পনা করতে হবে।
আরও পড়ুন:
একটি স্তনই কি যথেষ্ট?
একটি স্তন অস্ত্রোপচারে বাদ দেওয়া হলেও অন্য স্তন থেকে শিশুকে স্তন্যপান করানো সম্ভব হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একটি সুস্থ স্তনই শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ তৈরি করতে পারে। তবে প্রত্যেক মায়ের দুধের পরিমাণ এক রকম হবে না।
আবার স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় স্তন সংরক্ষণ করে অস্ত্রোপচারের পর রেডিয়েশন দেওয়া হলে চিকিৎসা করা স্তনে দুধ তৈরির ক্ষমতা কমে যেতে পারে। রেডিয়েশনের প্রভাবে স্তনের টিস্যু ও দুধ বহনকারী নালিতে পরিবর্তন হয়। ফলে সেই স্তনে অল্প দুধ তৈরি হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে দুধ একেবারেই নাও আসতে পারে। অন্য স্তনটি স্বাভাবিক থাকলে সেখান থেকে শিশুকে স্তন্যপান করানো সম্ভব।

ক্যানসার কি আবার ফিরে আসবে?
স্তন ক্যানসারের পর সন্তান নেওয়ার কথা ভাবলে এই ভয়টা স্বাভাবিক। তবে চিকিৎসা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর গর্ভধারণ বা স্তন্যপান করানো নিজে থেকে ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়ায়, এমন প্রমাণ নেই। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটিও জানিয়েছে, সফল চিকিৎসার পর গর্ভধারণ ও স্তন্যপান ক্যানসার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ায়, এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক মহিলার ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য। ক্যানসারের ধরন, রোগের পর্যায়, আগের চিকিৎসা, ভবিষ্যতে রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা এবং বর্তমানে কোনও চিকিৎসা চলছে কি না, সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।
চিকিৎসা চললে স্তন্যপান নয়
সন্তান জন্মেছে মানেই ক্যানসারের ওষুধ চলাকালীন স্তন্যপান নিরাপদ, এমনটা ভাবা বিপজ্জনক। কেমোথেরাপি, হরমোন-থেরাপি এবং কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ক্যানসারের ওষুধ মায়ের দুধে পৌঁছে শিশুর শরীরে যেতে পারে। তাই এই ধরনের চিকিৎসা চলাকালীন সাধারণত স্তন্যপান করানোর পরামর্শ দেওয়া হয় না।
বিশেষ করে হরমোন-নির্ভর স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ওষুধ চলতে পারে। তখন সন্তান নেওয়ার সময়, চিকিৎসা সাময়িকভাবে বন্ধ করা যাবে কি না এবং পরে স্তন্যপান করা সম্ভব হবে কি না, সবকিছু ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরিকল্পনা করতে হয়।

পরিকল্পনা হোক চিকিৎসার শুরুতেই
ভবিষ্যতে মা হওয়ার ইচ্ছে থাকলে ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই চিকিৎসককে তা জানানো জরুরি। কারণ অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন এবং দীর্ঘমেয়াদি কিছু ওষুধ ভবিষ্যতের সন্তানধারণ এবং স্তন্যপানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তান জন্মের পর মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ কম হলে বা স্তন্যপানে সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। শিশুর ওজন, মাতৃদুগ্ধ পানের পরিমাণ এবং মায়ের দুধ তৈরির ক্ষমতা নজরে রাখা প্রয়োজন।
মায়ের দুধ খাওয়াতে না পারলে
কখনও চিকিৎসার কারণে স্তন্যপান একেবারেই সম্ভব নাও হতে পারে। তাতে মা হিসেবে তাঁর ভালোবাসা বা সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কোনও ঘাটতি তৈরি হয় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী সংরক্ষিত মায়ের দুধ, উপযুক্ত ক্ষেত্রে দাতার দুধ অথবা শিশুর জন্য নির্ধারিত কৃত্রিম দুধ বেছে নেওয়া যেতে পারে।
স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার পর মা হওয়া মানেই স্তন্যপানের সম্ভাবনা শেষ, এমনটা নয়। আবার সবার ক্ষেত্রেই স্তন্যপান সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ক্যানসারের চিকিৎসার ইতিহাস জেনে, গর্ভধারণের আগে থেকেই ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, স্তন শল্যচিকিৎসকের সঙ্গে পরিকল্পনাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
