মৃত্যুর কয়েক দিন আগে হঠাৎ ঘুম ভেঙে কেউ বললেন, ‘ও তো এসেছিল… আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’ পাশে থাকা স্বজনরা অবাক, যাঁর কথা বলা হচ্ছে, তিনি তো বহু বছর আগেই মারা গিয়েছেন। আবার কেউ দেখছেন প্রয়াত মা-বাবাকে, কেউ হারিয়ে যাওয়া জীবনসঙ্গীকে। কারও সামনে খুলে যাচ্ছে আলোয় ভরা একটি দরজা, কেউ যেন অচেনা কোনও পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন।
মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি সময়ে এমন স্বপ্ন কি নিছক মস্তিষ্কের খেলা? নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের গভীর স্মৃতি, আবেগ ও মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত মানসিক প্রক্রিয়া?
আরও পড়ুন:
নতুন এক গবেষণা এই রহস্যে কিছুটা আলো ফেলেছে। গবেষকদের মতে, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের এমন অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে পরিচিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ভয় নয়, বরং শান্তি ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে। সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—চলে যাওয়া প্রিয়জনের ফিরে আসা, উজ্জ্বল আলো, খোলা দরজা এবং কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতির মতো প্রতীকী দৃশ্য।
আরও পড়ুন:
তবে বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি, মৃত্যুর আগে কেন এমন অভিজ্ঞতা হয়। আর এখানেই এক গভীর প্রশ্ন— মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষের মস্তিষ্ক আসলে কী দেখতে পায়?

স্বপ্নে ফিরে আসেন যাঁরা চলে গিয়েছেন!
মৃত প্রিয়জনকে দেখা সবচেয়ে বেশি উঠে আসা অভিজ্ঞতাগুলির একটি। প্রয়াত স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা, আত্মীয়—এমনকী প্রিয় পোষ্যকেও স্বপ্নে ফিরে আসতে দেখেন অনেকে। আবার সব অভিজ্ঞতা ঘুমের মধ্যেই ঘটেনা। কিছু রোগী জেগে থাকাকালীনও মৃত প্রিয়জনকে দেখার মতো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন গবেষকদের।
এক মহিলার স্বপ্নে তাঁর প্রয়াত স্বামী এসে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’ অন্য কারও স্বপ্নে এসেছে সিঁড়ি, খোলা দরজা বা উজ্জ্বল আলো। একজন নিজেকে খালি পায়ে আলোর মধ্যে খোলা একটি দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। আর একজন দেখেছেন সমুদ্রের ধারে ছুটে চলা সাদা ঘোড়া।
কেন দেখা যায় এমন স্বপ্ন?
এর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। গবেষণাটি এমন কোনও প্রমাণও দেয়নি যে এই অভিজ্ঞতাগুলি মৃত্যুর পরের জীবনের অস্তিত্বের ইঙ্গিত। বরং গবেষকদের ধারণা, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের মনে যে ভয়, স্মৃতি, সম্পর্ক, আশা বা অপূর্ণ আবেগ কাজ করে, সেগুলিরই কোনও প্রতীকী প্রকাশ হতে পারে এই স্বপ্ন। এমন কিছু অনুভূতি, যা কথায় প্রকাশ করা কঠিন, সেগুলি হয়তো স্বপ্নের ভাষায় সামনে আসে।
গবেষকরা মনে করেন, এই অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সম্পর্কভিত্তিক’ দিক রয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যু নিয়ে সরাসরি কথা বলা কঠিন হয়ে উঠলে স্বপ্ন বা প্রতীকী দর্শনের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন।

বেশিরভাগই শান্তির অনুভূতি দেয়
অদ্ভুত হলেও, এমন অভিজ্ঞতার বেশিরভাগই ভয়ংকর নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা শান্তি ও স্বস্তির অনুভূতি দেয়। জীবনে যাঁরা ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রতীক ছিলেন, তাঁদের আবার দেখতে পাওয়া হয়তো জীবনের শেষ সময়ে মানসিক আশ্বাস জোগায়।
স্বপ্নে শুধুমাত্র মানুষ নয়, কোনও যাওয়াও এই স্বপ্নগুলির একটি পরিচিত প্রতীক। কেউ জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন, কেউ কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ আবার বাসে চড়ছেন। গবেষকদের মতে, এগুলি হয়তো জীবনের এক পর্ব থেকে অন্য পর্বে যাওয়ার প্রতীকী ছবি।
তবে সব স্বপ্নই সুখের নয়
সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রায় ১০ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আতঙ্কের বা অস্বস্তির। কারও ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে ভয়ঙ্কর অবয়ব, কারও অভিজ্ঞতায় ছিল অশান্তিকর দৃশ্য। গবেষকদের মতে, এর সঙ্গে উদ্বেগ, পুরনো কোনও আঘাতের স্মৃতি, অপূর্ণ আবেগ বা শারীরিক অস্বস্তির সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই এমন অভিজ্ঞতাকে হালকাভাবে না দেখে রোগীর মানসিক ও শারীরিক অবস্থার দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রহস্য এখনও কাটেনি
মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে দেখা স্বপ্ন ও দর্শন নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। কতটা সাধারণ এই অভিজ্ঞতা, কোন বিষয়গুলি এর ধরন বদলে দেয় এবং রোগী ও তাঁর পরিবারের মনে এর কী প্রভাব পড়ে— তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— জীবনের শেষ মুহূর্তগুলি শুধু শারীরিক পরিবর্তনের সময় নয়, গভীর আবেগ ও স্মৃতিরও সময়। সেই কারণেই হয়তো কখনও কখনও বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কোনও প্রিয় মুখ আবার ফিরে আসে স্বপ্নে। বিজ্ঞান এর ব্যাখ্যা খুঁজছে। আর মানুষের কাছে সেই ফিরে আসা মুখটি হয়তো থেকে যায় ভালোবাসার শেষ স্মৃতি হয়ে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
