শুভঙ্কর চক্রবর্তী
একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয়। সেই শ্রেণিকক্ষে যদি কৌতূহল, যুক্তিবোধ ও শেখার আনন্দ জন্ম না নেয়, তবে উন্নত ভবন, স্মার্ট বোর্ড বা পুষ্টিকর খাবার, কোনওটাই একা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। একটি সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার পাঠ্যপুস্তকের মানে, শিক্ষকের মর্যাদায় এবং শিক্ষার্থীর কৌতূহলে। মধ্যাহ্নভোজ সেই যাত্রার সহযাত্রী, চালক নয়। চালকের আসনে যদি মেনুকেই বসিয়ে দেওয়া হয়, তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষা পথ হারাবে। এই সহজ সত্যটি আমরা ভুলতে বসেছি।
বাঙালির মগজাস্ত্রের বিবর্তন বড়ই রোমাঞ্চকর। এককালে যে বাঙালি ব্যাকরণ, বিজ্ঞান, দর্শন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করত, আজ তারা চরম বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছে পোলট্রির ডিম বনাম ইসকনের নিরামিষ রাজমার তাত্ত্বিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। সমাজমাধ্যম থেকে পাড়ার চায়ের দোকান, সর্বত্র এখন একেকটি আস্ত পুষ্টিবিজ্ঞান গবেষণাগার। কে কত ক্যালোরি, কত শতাংশ প্রোটিন, আর কত মিলিগ্রাম অ্যামিনো অ্যাসিডের হিসাব কষতে পারেন, তার অলিম্পিক চলছে। দেখে মনে হচ্ছে, রাজ্যের যাবতীয় মেধা ও মনন এখন এসে জমা হয়েছে ওই মিড-ডে মিলের হাঁড়ির তলানিতে। অথচ, এই বিপুল বাগাড়ম্বর আর মহাজাগতিক উদ্বেগের সিকিভাগও যদি রাজ্যের মুমূর্ষু শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হত, তবে হয়তো সরকারি স্কুলগুলোর এমন কঙ্কালসার দশা আমাদের দেখতে হত না। আক্ষেপের বিষয় হল, থালার খাবার নিয়ে আমাদের যত মাথাব্যথা, মাথার ভেতরের মগজটি নিয়ে আমরা ততটাই উদাসীন।
আমাদের রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এমন এক চূড়ান্ত মোক্ষলাভের পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকে আর পার্থিব জ্ঞান দিয়ে মাপা যায় না। রাজ্যের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ঘাঁটলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, অবশ্য যদি তা প্রোটিনের অভাবজনিত কারণে আগেই ঝরে না গিয়ে থাকে! ইউডাইস এবং এসার-এর মতো সংস্থার বেরসিক রিপোর্ট বলছে, রাজ্যের প্রায় আট হাজারের বেশি স্কুল চিরতরে বন্ধ হওয়ার মুখে, কারণ সেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা তিরিশেরও নীচে। কোথাও কোথাও তা দশের গণ্ডিও পেরোয় না। এরাজ্যে শূন্য পড়ুয়ার স্কুলও সগৌরবে বিরাজমান। শতাধিক স্কুলে কোনও শিক্ষকই নেই। তা নিয়ে অবশ্য আমাদের বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। ছাত্র নেই তো কী হয়েছে? বেঞ্চ তো আছে! যেখানে শিক্ষক আছেন, সেখানে আবার পরিকাঠামো নেই। ছাদ চুইয়ে জল পড়ে, ব্ল্যাকবোর্ডে ফাটল, লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরি তো সেই কবেই হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোর মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন মাত্র শিক্ষকই ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর রূপে তিন-চারটি ক্লাস একসঙ্গে সামলান। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক পতন নিয়ে কোনও সুশীল সমাজ মোমবাতি হাতে রাস্তায় হাঁটে না। আমাদের যাবতীয় বিপ্লব এখন ডিমের কুসুম আর সয়াবিনের বড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এই ভোজন-মহোৎসবে সবচেয়ে করুণ অবস্থা হল রাজ্যের শিক্ষক সমাজের। সিলেবাসের অলিগলি ছেড়ে তাঁদের এখন নিত্যদিন আনাজপাতির বাজারের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে হয়। তাঁদের মনে রাখতে হয় গত সপ্তাহে কোনদিন ডাল আর কোনদিন সয়াবিন দেওয়া হয়েছিল। একজন শিক্ষক, যাঁর কাজ ছিল আগামীদিনের নাগরিক তৈরি করা, তাঁকে আপাতত কেরানি এবং কেটারারের এক অদ্ভুত সংকর প্রজাতিতে পরিণত করা হয়েছে। অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ডের গবেষকরা যদি কখনও এরাজ্যে সরকারি স্কুল পরিদর্শনে আসেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই গবেষণার বিষয় পালটে স্কুলের মিড-ডে মিলের রন্ধনশিল্প নিয়ে পিএইচডি করতে বাধ্য হবেন।
আর ছাত্রছাত্রীরা? তারা এখন আর ‘শিক্ষার্থী’ নেই, তারা রূপান্তরিত হয়েছে ‘উপভোক্তা’ বা বেনেফিশিয়ারিতে। প্লেটোর অ্যাকাডেমি থেকে শান্তিনিকেতন— সর্বত্রই জোর দেওয়া হয়েছিল মগজের পুষ্টিতে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাদর্শন বিশ্বাস করে যে, মগজ হল এক অনাবশ্যক বস্তু, আসল হল পাকস্থলী। শ্রেণিকক্ষে কী পড়ানো হচ্ছে, পড়ুয়ারা অঙ্ক বা ইংরেজিতে পিছিয়ে পড়ছে কি না, এসব এখন আর বিবেচ্য বিষয় নয়। স্কুল এখন আর বিদ্যাচর্চার মন্দির নেই, তা মূলত একটি নিখরচার ভোজনালয়ে পরিণত হয়েছে।
আসলে, এই ডিম ও নিরামিষের তর্জাটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি রাজনীতির মাস্টারস্ট্রোক। একটি জাতিকে মেরুদণ্ডহীন করার সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হল তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সযত্নে পঙ্গু করে দেওয়া। রাজনীতির কারবারিরা খুব ভালো করেই জানেন, একজন শিক্ষিত, যুক্তিবাদী ও চিন্তাশীল নাগরিক সর্বদা প্রশ্ন করে। সে অধিকার বুঝে নিতে চায়, সে কর্মসংস্থান চায়। রাষ্ট্র কখনোই প্রশ্নকারী নাগরিক চায় না। রাষ্ট্র চায় অনুগত উপভোক্তা। তাই মগজে পুষ্টি জোগানোর চেয়ে পেটে প্রোটিন জোগানোর রাজনীতি অনেক বেশি লাভজনক। ডিম বা রাজমা যা-ই দেওয়া হোক না কেন, তার মূল উদ্দেশ্য শিশুর পুষ্টিসাধন নয়, আগামীদিনের একটি নিশ্চুপ ভোটব্যাংক তৈরি করা। অভিভাবকরাও ভাবছেন, অন্তত একবেলা পেট ভরে পুষ্টিকর খাবার তো জুটছে! তাঁরা ভুলেই যাচ্ছেন যে, আজ যে শিশুটি বিনাপয়সার ডিম খেয়ে বড় হচ্ছে, কাল উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে সে যখন বেকারত্বের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, তখন তাকে সেই দু’বেলা ভাতের জন্যই অন্যের দ্বারস্থ হতে হবে।
আজ বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং মঙ্গলে উপনিবেশ স্থাপন নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রূপরেখা তৈরি করছে, তখন আমরা পড়ে আছি ডিম আর সয়াবিনের পবিত্রতা প্রমাণের প্রতিযোগিতায়। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নিরামিষ খাবারে ব্রাহ্মণ্যবাদের গন্ধ খুঁজছেন, আর আমিষ খাবারে খুঁজছেন ধর্মনিরপেক্ষতার জয়গান। আর এই হাস্যকর যুক্তিবাদের আড়ালে নিঃশব্দে মৃত্যু হচ্ছে বাংলার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার। সুকুমার রায় তাঁর ‘হাঁসজারু’ কবিতায় যেমন এক অদ্ভুত সংকর প্রাণীর কথা বলেছিলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও আজ তেমনি এক ‘ডিম-শিক্ষার’ জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়েছে। একটি আস্ত প্রজন্ম স্কুল থেকে বেরিয়ে আসছে যাদের পেটে হয়তো ডিমের প্রোটিন আর রাজমার আয়রন ভরপুর মাত্রায় আছে, কিন্তু মগজ হয়ে উঠছে বিস্তীর্ণ সাহারা মরুভূমির মতো। যেদিন এই শূন্যতা সমাজের বুকে তীব্র হাহাকার হয়ে ফিরে আসবে, সেদিন হয়তো আমাদের টনক নড়বে। কিন্তু সেদিন ভাঙা স্কুলঘর আর মরচে ধরা মিড-ডে মিলের হাঁড়ি ছাড়া আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
আজও বহু স্কুলে পড়ুয়াদের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী হিসেবে লড়াই করতে হয়। বাড়িতে পড়ার পরিবেশ নেই, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে না, ডিজিটাল সুযোগ সীমিত। ফলে স্কুলই তাদের একমাত্র ভরসা। সেই স্কুল যদি কেবল উপস্থিতির খাতা পূরণ করে, তবে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাই অপচয় হয়। তবু জনপরিসরে শিক্ষা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে অন্য বিষয়। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি, মিড-ডে মিলের মেনু, নতুন ভবনের উদ্বোধন ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো শিক্ষার অবকাঠামো, শিক্ষা নয়। তৃতীয় শ্রেণির একটি শিশু কেন নিজের ভাষায় একটি গল্প লিখতে পারছে না, বা অষ্টম শ্রেণির একজন ছাত্র কেন দৈনন্দিন জীবনের সহজ গণিত প্রয়োগ করতে পারছে না এসব নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়।
দিনের শেষে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি ভুলে গেলে চলবে না তা হল, দুপুরের খাবার একটি দিন বাঁচায়। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা একটি প্রজন্মকে বাঁচায়।
The put up বিপন্ন শিক্ষা, বিকশিত পাকস্থলী appeared first on Uttarbanga Sambad.
