বাঁকিপুরের ঝাঁকি

বাঁকিপুরের ঝাঁকি

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে জেন জেড আন্দোলনের সময় আলোচনায় উঠে এসেছিল, দেশের তরুণ প্রজন্মের অর্ধেক যদি শাসকদলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, তাহলে ঘটি উলটে যাবে। বিহারের বাঁকিপুর বুঝিয়ে দিল, আলোচনাটির সারবত্তা আছে। বিজেপির খোদ সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের দীর্ঘদিনের গড় ধসে গেল বাঁকিপুরে। শুধু বিজেপি প্রার্থীর পরাজয় হয়নি, দলের প্রাপ্ত ভোটের হারে বিরাট ধাক্কা লেগেছে। বাঁকিপুরের ১৮০ ডিগ্রি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার তাৎপর্য গভীর।

গোটা দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিস্থিতিকে ‘ইয়ে সির্ফ ঝাঁকি হ্যায়, বাঁকিপুর আভি বাকি হ্যায়’ বলা যায় কি না, তা ভবিষ্যৎ ঠিক করবে। কিন্তু সন্দেহ নেই যে, বিরোধীদের দশা যতই ছন্নছাড়া হোক, মানুষ বিরূপ হলে শাসক শিবিরকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দিতে পারে। নীতীশ কুমারকে সরিয়ে সম্রাট চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত বিহারবাসী ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।

বিজেপি নেতাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এই শোচনীয় পরাজয়ের আরেক কারণ। এখন বিহারে শাসকদলের অনেক নেতা বলতে শুরু করেছেন, তাঁদের মধ্যে  ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, বিজেপি যা বলবে বা করবে, তা-ই মানুষ বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নাও নিতে পারে। বিশেষ করে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদের বক্তব্য মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছিলেন, কুকুর, বেড়ালকে প্রার্থী করলেও বাঁকিপুরে জিতে যাবে।

নীতিন নবীনের গড় সম্পর্কে এই আত্মম্ভরিতা বিজেপিতে তৈরি হয়েছিল। ফলে বাঁকিপুরে প্রশান্ত কিশোরের এই জয়ে বিজেপি প্রার্থীর চেয়েও বেশি পরাজয় হয় বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির। ওই কেন্দ্রে ভোটের হারে ধাক্কার হিসেবে সেটা স্পষ্ট। এই শতাব্দীতে বাঁকিপুরে বিজেপি কখনও ৫০ শতাংশের কম ভোট পায়নি। ২০০০ সালে ওই হার ছিল ৫৪.৯ শতাংশ। সেই হার বাড়তে বাড়তে ২০০৬ সালের উপনির্বাচনে হয় ৮২.৩ শতাংশ। ২০১০-এর নির্বাচনে ছিল ৭২.১ শতাংশ।

২০২৫-এও ছিল ৬২.৭ শতাংশ। আর প্রশান্ত কিশোর জেতায় ২০২৬-এ ওই হার একধাক্কায় নেমে হল ৩৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ২৮ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে, জন সুরজ পার্টির প্রাপ্ত ভোট দাঁড়াল ৪৯.৪ শতাংশ। এটা নিঃসন্দেহে বিজেপির দুর্ভেদ্য গড়ে বিরাট ফাটল। যন্তরমন্তরের আন্দোলনের জেরে তরুণসমাজ যে বিজেপিকে বাঁকিপুরে ভোট দেয়নি, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। আগামীদিনের জন্য যা অশনিসংকেত।

বিহারে বিজেপি নেতাদের একাংশের বক্তব্য সঠিক যে, দলের কমিটেড ভোটারদের কেউ কেউ মত বদলেছেন। কমিটেড হলেই মুখ বুজে দলের সব কথা মেনে নাও নিতে পারেন। সর্বভারতীয় শাসকদলের কাছে বড় বার্তা হল, শক্তপোক্ত বিরোধী নেই বলে যা খুশি করা যাবে না। তাহলে পরিণাম হতে পারে বাঁকিপুরের মতো। দেশে বিজেপির শাসন যে দলের লোকদের সবাইকে খুশি করতে পারছে না- সেই বার্তাও দিয়ে গেল বাঁকিপুর।

অর্থাৎ তরুণ প্রজন্ম শুধু নয়, বিজেপির কট্টর সমর্থকরাও সবাই পদ্ম চিহ্নে ভোট দেননি। উচ্চবর্ণ, দলিত ও অন্য অনগ্রসর সম্প্রদায়কে একসূত্রে গেঁথে নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বিহারের রাজনীতিতে জাতপাতকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছিলেন। সেই ঐক্য তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। তাছাড়া তাঁর অপরাধের অতীত ও দলবদলের রেকর্ড ভোটারদের একাংশকে নিশ্চিতভাবে বিরূপ করেছিল।

বাঁকিপুর তাই একসঙ্গে অনেক শিক্ষা দিয়ে গেল যে কোনও শাসকদলকে। বিরোধীরা শক্তিশালী না হলেও মানুষ দৃঢ়ভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে। সেক্ষেত্রে তুলনায় দুর্বল বিরোধীকে বেছে নিতে পারে সাধারণ জনতা। বিশেষ করে আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, চরম বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, মানুষ অন্ধের মতো আর বিজেপিকে সমর্থন করতে চাইছে না। বিভিন্ন রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা ও ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন বিজেপির কাছে অগ্নিপরীক্ষা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *