(রাজ্যের মসনদ বদলাতেই যে চেনা মুখগুলো গতকাল পর্যন্ত প্রাক্তনের স্তুতি গাইতেন, আজ তাঁরাই নতুন প্রভুর চরণে নিজেদের মেরুদণ্ড বিকিয়ে দিয়ে ভোল বদলের এক চরম হাস্যাস্পদ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।)
পল্লব বসু
সরকার বদলাতেই বাংলার বাতাসে এখন একটাই খেলা চলছে—কে কত দ্রুত ডিগবাজি খেতে পারে! দীর্ঘ পনেরো বছর পর রাজ্যের মসনদ হাতবদল হতেই কর্পোরেট দুনিয়া থেকে টলিউডের ঝাঁ চকচকে জগতে রীতিমতো ‘কে আগে রং বদলাবে’ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে। সুবিধাবাদী মানুষগুলো হয়তো ভেবে বসে আছেন, সাধারণ মানুষের বুঝি স্মৃতিভ্রম হয়েছে! তাঁরা বেমালুম ভুলে গিয়েছেন, এটা সমাজমাধ্যমের যুগ। এখানে পুরোনো কথা মুছে ফেলা অত সোজা নয়। নতুন সরকারের সুনজরে থাকতে গিয়ে কালকের স্তাবকরা আজ যেভাবে নিজেদের অতীত মুছে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তা দেখে হাসি আর বিরক্তি—দুটোই একসঙ্গে পায়।
এই পালটি খাওয়ার খেলায় চ্যাম্পিয়নের ট্রফিটা বোধহয় শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত। একটা সময় ছিল, যখন বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন এলেই তাঁর মুখে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর স্তুতি আর থামত না। প্রথম দিকের বাণিজ্য সম্মেলনে তিনি জমি অধিগ্রহণকে ‘স্বপ্নের মতো সহজ’ বলেছিলেন। এরপর যতবারই সম্মেলন হয়েছে, ততবারই তিনি মমতা সরকারের ‘গতিশীল নেতৃত্ব’ নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন। বলেছিলেন, ‘বাংলা মানেই এখন বাণিজ্য’, আর তাঁর সংস্থা নাকি রাজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালতে চলেছে। কিন্তু যেই রাজ্যে পালাবদল হল, গোয়েঙ্কাবাবুর সুরও ম্যাজিকের মতো পালটে গেল!
সম্প্রতি এক বণিকসভার বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে নতুন সরকারের বন্দনায় মেতে তিনি বললেন, ‘বাণিজ্য করতে যা যা লাগে, তার সবই এখন এখানে আছে। আগে এমন একটা সরকারের অভাব ছিল, যারা সত্যি সত্যিই প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ টানতে চায়। এখন বিজেপি আর শুভেন্দু অধিকারীর মতো সরকার আসায় সেই অভাব মিটেছে।’ এখানেই না থেমে তিনি অতীতের সব বাণিজ্য সম্মেলনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘এত বছর ধরে উন্নয়নের প্রতি যে চরম উদাসীনতা ছিল, তা কাটাতে সময় লাগবে।’ ভাবুন একবার! কাল পর্যন্ত যিনি বিনিয়োগের স্বর্গরাজ্য দেখছিলেন, তিনি রাতারাতি এত বছরের উদাসীনতা আবিষ্কার করে ফেললেন! এই ডিগবাজি কি কেবল ব্যবসার স্বার্থে, নাকি নতুন ক্ষমতার কাছে স্রেফ আত্মসমর্পণ?
অবশ্য শিল্পপতিদের এই ভোল বদল নিয়ে খুব একটা গালমন্দ করাও সাজে না। পুঁজির তো আর কোনও আদর্শ থাকে না, তার কাছে মুনাফাই সব। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা, হাজার হাজার কর্মীর রুটিরুজি টিকিয়ে রাখতে গেলে শাসকের ছায়ায় থাকতেই হয়। যে রাজ্যে কারখানার ছাড়পত্র থেকে শ্রমিক বিক্ষোভ—সবই নেতাদের অঙ্গুলিহেলনে চলে, সেখানে শাসকের বিরাগভাজন হওয়া মানেই ব্যবসায় লালবাতি জ্বলা। ফাইলে সই আটকে গেলে গোটা ব্যবসাই তো লাটে উঠবে। তাই খাতার হিসাব মেলাতে গিয়ে মেরুদণ্ডটা একটু-আধটু বাঁকাতেই হয় তাঁদের। পুঁজির এই আত্মসমর্পণকে না হয় ‘টিকে থাকার লড়াই’ বলে মেনে নিলাম। কিন্তু টলিউডের সেইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আর শিল্পীদের কী অজুহাত, যাঁরা স্রেফ ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট কুড়োতেই বারবার রং বদলান?
টলিউডের অন্দরমহলে উঁকি দিলে এই ডিগবাজির দৃশ্য আরও মজাদার। বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে গিয়ে সৌজন্য বিনিময় করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শাসকদলের এক শীর্ষ নেতা। সেই সময় রঞ্জিতবাবু সংবাদমাধ্যমের সামনে বেশ গদগদ হয়েই বলেছিলেন, ‘আমার অভিষেককে খুব ভালো লাগে।’ এমনকি তাঁর মেয়েকে রাজ্যসভায় পাঠানোর কথাও তখন পাকা হয়। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই হাওয়া ঘুরে গেল। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে রঞ্জিতবাবুকে দেখা গেল বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে একই মঞ্চে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী প্রবীণ এই অভিনেতাকে মঞ্চে ওঠার আগে প্রণাম করে সৌজন্য দেখালেন। আর রঞ্জিতবাবুও বেশ কায়দা করে রাজনৈতিক কচকচানি এড়িয়ে কেবল উত্তমকুমারের প্রশংসা করে নতুন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরালেন। প্রবীণ অভিনেতার এই আপাত ‘অরাজনৈতিক’ অবস্থান আসলে নতুন হাওয়ার সঙ্গে পাল তোলার একটা দারুণ কৌশল বলেই মুচকি হাসছেন নিন্দুকেরা।
পরিচালক অরিন্দম শীল আর অন্য প্রযোজকদের ভোল বদল তো রীতিমতো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। প্রাক্তন সরকারের আমলে এই পরিচালকরাই সরকারি কমিটিতে বসে প্রশাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তখন অরিন্দমবাবু জোর গলায় বলতেন, ‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রী টলিউডের অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমন সহযোগিতা অন্য কোথাও মেলে না।’ কিন্তু ক্ষমতা বদলের পর নতুন সরকার যখন বিনোদন জগৎ ঢেলে সাজাতে নতুন কমিটি গড়ল, তখন সেই অরিন্দমবাবুরাই পালটি খেয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘টলিউড একটা মোড় ঘোরার জায়গায় দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর আমরা বাতিলের সংস্কৃতি আর অন্যায় কাজের পরিবেশ সহ্য করেছি।’ ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের এই নীতিহীন অবস্থান তাঁদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই বড়সড়ো প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
তবে এই ডিগবাজির খেলায় সবচেয়ে বড় কমেডিটা করেছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। নিজেকে বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থী ভাবা পরমব্রত গত নির্বাচনের আগে প্রাক্তন শাসকদলের হয়ে ভোট প্রচারে নেমেছিলেন। ২০২১ ভোট পরবর্তী হিংসার সময় তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আজকের দিনটি বিশ্ব রগড়ানি দিবস হিসেবে পালিত হোক।’ কিন্তু যেই ক্ষমতা বদলাল আর পুরোনো মন্তব্য নিয়ে তাঁর নামে থানায় পুলিশি অভিযোগ হল, অমনি তাঁর সুর ম্যাও ম্যাও করতে শুরু করল। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে সাফাই গাইলেন, নিজের সদ্যোজাত সন্তানের নিরাপত্তার জন্যই নাকি তাঁকে আগের শাসকদলের সঙ্গে আপস করতে হয়েছিল!
তাঁর এই কৈফিয়ত শুনে টলিউডের অন্দরেই হাসির রোল উঠেছে। সহকর্মীদের অনেকেই বলেছেন, নিজের রাজনৈতিক ডিগবাজি ঢাকতে একরত্তি সন্তানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। কেউ তাঁকে ‘গিরগিটি’ বলেছেন, আবার কেউ তাঁর এই সুবিধাবাদকে চূড়ান্ত কদর্য আখ্যা দিয়েছেন। নতুন সরকারের নেতারাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এহেন সুবিধাবাদীদের তাঁদের দলে কোনও জায়গা নেই।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ একটা কথাই ভাবছেন—এই মানুষগুলোর কি আদৌ কোনও আদর্শ আছে? সমাজমাধ্যমের যুগে যখন প্রতিটি কথা বা মন্তব্য অন্তর্জালের দুনিয়ায় পাকাপাকিভাবে জমা থাকে, তখন এই ধরনের রাজনৈতিক ডিগবাজি খুব সহজেই ধরা পড়ে যায়। মানুষ হয়তো ক্ষমতার রদবদল নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না, কিন্তু যাঁরা নিজেদের সমাজের পথপ্রদর্শক বা বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করেন, তাঁদের এই মেরুদণ্ডহীন আচরণ দেখে মানুষ হাসবে না কাঁদবে, তা ভেবে পায় না।
আজ যাঁরা নতুন সরকারের বন্দনায় মেতেছেন, তাঁরা হয়তো ভুলে গিয়েছেন যে ক্ষমতার দম্ভ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না। যে সরকার আজ তাঁদের মাথায় তুলে নাচছে, কাল তারাই হয়তো প্রয়োজনে তাঁদের ছুড়ে ফেলে দিতে পারে। তাই নিজেদের শিল্পসত্তা বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া এই সুবিধাবাদীদের সাধারণ মানুষ কখনোই ক্ষমা করবে না। বাংলার মাটি বরাবরই প্রতিবাদের মাটি। এখানে যেমন ক্ষমতার পালাবদল হয়, তেমনই ক্ষমতার অহংকার চূর্ণ হতেও বেশি সময় লাগে না। তাই যাঁরা আজ ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের জায়গা পাকা করতে গিয়ে নিজেদের মেরুদণ্ড বিক্রি করে দিচ্ছেন, তাঁদের মনে রাখা উচিত—ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আর সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি অতটাও দুর্বল নয় যে তাঁরা এই গিরগিটিদের আসল রং ভুলে যাবেন!
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

