ঘরের দুর্গারাও ভালো থাকুন আজীবন

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


দেবীবন্দনার পাশাপাশি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার অঙ্গীকার থাকুক আমাদের প্রতিদিনের জীবনে।

রমেন্দ্রনাথ ভৌমিক

শরতের আকাশ, কাশফুলের শুভ্রতা, ঢাকের বাদ্যি আর মণ্ডপের আলোয় বাঙালির মনে জাগে দুর্গোৎসবের আনন্দ। মৃন্ময়ী দেবীর সামনে অঞ্জলি দিতে ভিড় করেন অগণিত মানুষ। কিন্তু উৎসবের এই আবহেই প্রশ্ন জাগে, যে সমাজ দুর্গাকে মাতৃরূপে বন্দনা করে, সেই সমাজে রক্তমাংসের নারীরা কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তা পান? দুর্গাপুজোয় দুর্গারা ভালো থাকুক, এই প্রার্থনা তাই কেবল আবেগের কথা নয়। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। ঘরের মা, বোন, কন্যা, সহকর্মী কিংবা জীবিকার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করা নারী, প্রত্যেকেরই প্রাপ্য সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন। এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে আরাধনার অর্থও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

পৌরাণিক কাহিনীতে মহিষাসুর অশুভ শক্তির প্রতীক। আধুনিক সমাজেও সেই অশুভের নানা রূপ দেখা যায়। কখনও তা নারী নির্যাতন, কখনও পণপ্রথা বা বাল্যবিবাহ, কখনও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও বৈষম্য, কখনও নারীর স্বাধীন মতকে অস্বীকার করার মানসিকতা। এই অন্যায়ের নির্দিষ্ট কোনও মুখ নেই। তা ঘরে, রাস্তায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা কর্মক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। দুর্গাপুজোর তাৎপর্য তাই শুধু দেবীর বিজয় উদযাপনে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেদের আচরণ ও মনোভাবের মধ্যে থাকা বৈষম্যকেও চিনে নেওয়া জরুরি। মণ্ডপে দেবীর হাতে অস্ত্র দেখলেই সমাজ অন্যায়মুক্ত হয় না। তার জন্য চাই ন্যায়বোধ, শিক্ষা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নারীর প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি। আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়, তার কার্যকর প্রয়োগও জরুরি।

দুর্গার দশ হাতকে নারীর বহুমুখী জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। একজন নারী মা, কন্যা, শিক্ষিকা, চিকিৎসক, কৃষিশ্রমিক কিংবা পরিবারের উপার্জনকারী হতে পারেন। সংসার, সন্তান, জীবিকা ও প্রবীণদের যত্নের দায়ও অনেক সময় তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। অথচ তাঁর শ্রমকে স্বাভাবিক কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়। নারীকে ভালো রাখার অর্থ তাঁকে সব দায়িত্ব একা বহন করতে বলা নয়। তাঁর ক্লান্ত হওয়ার, বিশ্রাম নেওয়ার, নিজের জন্য সময় রাখার এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। সংসারের কাজ ভাগ করে নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ দেওয়া এবং তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, এসবও নারীর প্রতি সম্মানের প্রকাশ। দায় ভাগ করে নেওয়াও সমান জরুরি। দেবীর আসনে বসিয়ে দূর থেকে বন্দনার চেয়ে মানুষ হিসেবে তাঁর অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্গাপুজোর আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপের বাইরেও অসংখ্য নারীর জীবন চলে দায়িত্ব, স্বপ্ন ও লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। কেউ পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের ইচ্ছা পিছিয়ে রাখেন, কেউ পরিশ্রম করে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যান, কেউ প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শিক্ষাজীবন বা কর্মজীবন এগিয়ে নিয়ে যান। আবার কোনও নারী একাকিত্বে দিন কাটান, কারও কণ্ঠস্বর পরিবার বা সমাজে গুরুত্ব পায় না। তাঁদের সকলের কথা ভাবা জরুরি। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের সময় নদীর জলে মৃন্ময়ী দেবী ফিরে যান, কিন্তু নারীর স্বপ্ন, স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান বিসর্জিত হওয়া চলতে পারে না। বিসর্জন হোক নারীবিদ্বেষ, সহিংসতা, কুসংস্কার ও বৈষম্যের। উৎসবের আনন্দ সব নারীর জীবনে পৌঁছাক, তাঁদের বৈবাহিক অবস্থা বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন।

দুর্গাপুজোর মানবিক তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন নারীর নিরাপত্তা চারদিনের প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে না, বরং প্রতিদিনের অঙ্গীকার হবে। পরিবারে সমান মর্যাদা, কন্যাশিশুর শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, আইনের প্রয়োগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার। এ দায় শুধু প্রশাসনের নয়, পরিবারের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, কর্মক্ষেত্রের এবং সমাজের প্রত্যেক মানুষের। কোনও নারীকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিদিন লড়াই করতে হবে না, নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অপমানিত হতে হবে না কিংবা নিরাপত্তার অভাবে স্বপ্ন থামিয়ে দিতে হবে না, এমন সমাজ গড়াই হোক শারদীয় অঙ্গীকার। মাটির দুর্গা পূজিত হন, আর রক্তমাংসের দুর্গারা সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে ভালো থাকুন।

(লেখক শামুকতলা সিধো কানহো কলেজের সহকারী অধ্যাপক।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *