খালি পায়ে মায়ের জয়ের দৌড়

শিক্ষা
Spread the love


(মেয়েদের পড়াশোনার স্বপ্ন সফল করতে শাড়ি পরেই দৌড়ে জিতলেন রাঁধুনি রমাবাই)

মলয় চক্রবর্তী

মহারাষ্ট্রের বীড় জেলার আম্বাজোগাই এলাকার এক সাধারণ রাঁধুনির নাম আজ ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমের সীমানা ছাড়িয়ে। সাতচল্লিশ বছর বয়সি রমাবাই রানভীর পেশায় একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের রাঁধুনি। সম্প্রতি ‘অমৃত দৌড়’ নামে একটি স্থানীয় ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। প্রশিক্ষণ নেই, দৌড়ানোর জুতো নেই, শরীরচর্চার আধুনিক পোশাকও নেই। ছিল শুধু নিত্যদিনের শাড়ি আর হাওয়াই চপ্পল। তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে, যাঁদের পায়ে দামি স্পোর্টস শু, প্রশিক্ষণ-নেওয়া শরীর, তাঁদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন রমাবাই।

কাদা আর অসমতল রাস্তায় ছুটতে গিয়ে রমাবাইয়ের চপ্পল পিছলে যেতে শুরু করে। থমকে যাননি তিনি। চপ্পল খুলে হাতে নিয়ে খালি পায়েই দৌড় চালিয়ে যান। এক হাতে শাড়ির আঁচল সামলে পাথর আর কংক্রিটের রাস্তায় পায়ের তলায় ক্ষত সয়েও এগিয়ে চলেন। শেষপর্যন্ত পৌঁছে যান সবার আগে। জিতে নেন প্রতিযোগিতা। বয়স আর অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাকেও যেন সেদিন পিছনে ফেলে দেন তিনি।

পুরস্কার হিসেবে পান তিন হাজার টাকা। অঙ্কে সামান্য হলেও রমাবাইয়ের কাছে সেই টাকা এক বিশাল সম্ভাবনার নাম। কারণ সেই টাকা তিনি খরচ করতে চান তাঁর দুই মেয়ের পড়াশোনায়, বইখাতায়। এই দৌড়ে তাঁর সঙ্গেই অংশ নিয়েছিলেন তাঁর এক মেয়েও। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। মা-মেয়ের এই যুগলবন্দি আজ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য মায়ের নিঃশর্ত লড়াইয়ের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রমাবাইয়ের এই দৌড় কোনও পেশাদার প্রতিযোগিতার গল্প নয়। ছিল না তার পিছনে কোনও স্পনসরশিপ বা প্রচারের হিসেব। ছিল কেবল একটি মায়ের ভেতরে বয়ে চলা জেদ, যা দারিদ্র্যকে জয় করে সন্তানের শিক্ষার পথ প্রশস্ত করতে চায়। লক্ষণীয় বিষয় হল, রমাবাইয়ের এই লড়াই কোনও একদিনের ঘটনা নয়। প্রতিদিন ভোরে উঠে রান্নাঘরের কাজ সামলে, সংসারের হাজারো দায়িত্ব পালন করে তবেই তিনি মেয়েদের স্বপ্নের কথা ভাবার অবকাশ পান। তাঁর কাছে দৌড় কোনও শখ বা বিলাসিতা নয়, বরং জীবনসংগ্রামেরই আরেক নাম।

এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ ও প্রান্তিক ভারতের অসংখ্য মায়ের জীবনে সংগ্রাম আর স্বপ্ন কীভাবে একসূত্রে গাঁথা থাকে। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য রমাবাই ছড়িয়ে আছেন, যাঁদের গল্প কখনও ক্যামেরার সামনে আসে না, সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয় না। তাঁরা প্রতিদিন নিঃশব্দে লড়ে যান সংসারের প্রয়োজনে, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। রমাবাইয়ের দৌড় তাই শুধু একটি মাঠের প্রতিযোগিতা নয়। তা জীবনের লড়াইয়েরও এক প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিফলিত হয় নারীর সহনশীলতা, মাতৃত্বের আত্মত্যাগ এবং শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস।

আজকের ভোগবাদী সমাজে যখন সাফল্যের সংজ্ঞা অনেক সময় জাঁকজমক আর প্রাচুর্যে নির্ধারিত হয়, তখন রমাবাইয়ের খালি পা মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত সাফল্যের শিকড় থাকে সংকল্পে, আড়ম্বরে নয়। যে মাটিতে তাঁর পা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, সেই একই মাটি থেকেই যেন জন্ম নিয়েছে তাঁর মেয়েদের আগামীদিনের সম্ভাবনা। রমাবাই রানভীরের এই দৌড় তাই শুধু তাঁর একার জয় নয়। দেশের প্রতিটি সংগ্রামরত মায়ের প্রতি এক নীরব, অথচ অনন্য শ্রদ্ধার্ঘ্য। রমাবাইয়ের পায়ের ক্ষত হয়তো কয়েকদিনে শুকিয়ে যাবে, কিন্তু যে পথ তিনি তাঁর মেয়েদের জন্য তৈরি করলেন, তা অনেক দূর পর্যন্ত যাবে।

(লেখক প্রাবন্ধিক। ঘোকসাডাঙ্গার বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *