উন্নয়নের আড়ালে বিপন্ন দেশের পরিবেশ

উন্নয়নের আড়ালে বিপন্ন দেশের পরিবেশ

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


গ্রেট নিকোবর দ্বীপ নতুনভাবে পর্যটন মানচিত্রে আসছে। এজন্য অগুনতি গাছ কাটা পড়তে চলেছে।

গোপাল দে

পরিবেশ দিবস আসন্ন। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের ধারা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস সত্যি করে গত দু’বছরের মতো এবছরও অন্যান্য শহরের পাশাপাশি কলকাতাও তীব্র তাপপ্রবাহের শিকার। বায়ু দূষণের ভয়াবহ ছবিও সামনে এসেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের ১৩টি রাজ্যের ২৬টি শহরের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, এই পাঁচ বছরে দিল্লিতে ২৮৪ দিন এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ৪০১ থেকে ৫০০-এর মধ্যে। মুম্বইয়ে ৬৪৯ দিন, চেন্নাইয়ে ১১২৫ দিন এবং কলকাতায় ৫১৩ দিন এই সূচক ২০১ থেকে ৩০০-এর ঘরে ছিল।

দূষণ থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় সবুজ বনাঞ্চল ও জলাশয় রক্ষা করা। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ফরেস্ট ওয়াচ-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ৪ লক্ষ ১৪ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল হারিয়ে গিয়েছে। পূর্ব কলকাতার উন্মুক্ত জলাশয়ের আয়তনও প্রতি বছর সংকুচিত হচ্ছে। এর মধ্যেই গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে পর্যটন মানচিত্রে আনতে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এখানে আট হাজারের কিছু বেশি মানুষের বসবাস। নতুন পর্যটন শহরে প্রচুর সংখ্যক পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই দ্বীপে রয়েছে ঘন ক্রান্তীয় অরণ্য এবং বহু এন্ডেমিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। ইউনেসকোর বায়োডাইভার্সিটি হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়া এই এলাকার প্রায় দশ লক্ষ প্রাচীন গাছ কাটা পড়বে।

অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা থেকে গ্রেট নিকোবরে ডিম পাড়তে আসা সামুদ্রিক কচ্ছপ ‘জায়ান্ট লেদারব্যাক টার্টল’ এবং অতি বিপন্ন দুই জনজাতি- শম্পেন ও নিকোবারিজদের অস্তিত্ব চরম সংকটের মুখে পড়বে। বিস্ময়ের বিষয়, এমন একটি প্রকল্পে পরিবেশ অভিঘাত মূল্যায়ন (ইআইএ) কমিটি এবং জাতীয় পরিবেশ আদালতও ছাড়পত্র দিয়েছে। অন্যদিকে, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লির ৭০০ কিলোমিটারজুড়ে থাকা প্রাচীন আরাবল্লি পর্বতমালা রক্ষাতেও উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ আদালত পাহাড়ের ১০০ মিটারের সংজ্ঞা নিয়ে নিজেদের অবস্থান বদলেছে, যা কিছুটা স্বস্তির। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বনাঞ্চল রক্ষার আইনি রক্ষাকবচগুলি ক্রমশই দুর্বল করা হচ্ছে।

২০২০ সালের পর পরিবেশ অভিঘাত আইন (২০০৬), জৈব বৈচিত্র্য আইন (২০০২) এবং অরণ্য অধিকার আইন (২০০৬)-এর সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি বৃহৎ ব্যবসায়িক সংস্থাগুলি লাভবান হচ্ছে এবং বন ও খনিজ সম্পদ উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের সিংরৌলিতে কয়লাখনির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার জন্য ১৪০০ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হবে এবং ৬ লক্ষ গাছ কাটা পড়বে। পাশাপাশি, বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সেমিকনডাক্টর ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় বিরল ধাতুর খোঁজ চলছে। দেশে খনি ও খনিজ সম্পদ ব্যবহার সংক্রান্ত ১৯৫৭ সালের আইনটি ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে সংশোধন করা হয়েছে।

এই সংশোধনের মাধ্যমে লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, টাইটেনিয়াম, নিয়োবিয়াম, ট্যানটালাম এবং জিরকোনিয়াম— এই ছয়টি বিরল ধাতু উত্তোলনের অধিকার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি আর শুধুই দেশের সম্পদ রইল না। বিরল ধাতু ও বিরল মৃত্তিকা ধাতুর ভাণ্ডারের দিক থেকে চিন ও ব্রাজিলের পরেই ভারতের অবস্থান। অতি সম্প্রতি আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির ফলে বিরল ধাতু সংগ্রহে তারাও অনুমতি পেয়ে গিয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে ভারত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ২০৭০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানো হবে। কিন্তু সার্বিক চিত্র প্রমাণ করছে, আমাদের অগ্রগতি একেবারেই সন্তোষজনক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নামে পরিবেশগত মূলধন দ্রুত নিঃশেষ হতে থাকলে ভবিষ্যতের উন্নয়নই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

(লেখক পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের সহ সভাপতি। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *