অলিম্পিকের টাকায় আমলাদের বিলাসিতা

অলিম্পিকের টাকায় আমলাদের বিলাসিতা

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হয়েও অলিম্পিকে আমরা কেন জামাইকা বা হাঙ্গেরির মতো ছোট দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে? এর আসল উত্তর লুকিয়ে আছে লুটিয়েন্স দিল্লির বিলাসবহুল আমলা-কলোনির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সুইমিং পুলে, যেখানে অ্যাথলিটদের অধিকার ছিনিয়ে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত আমলারা।

কুশল হেমব্রম

একজন আদ্যোপান্ত ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে প্রতি চার বছর অন্তর যখন অলিম্পিকের আসর বসে, তখন বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে ওঠে। ১৪২ কোটির দেশ আমাদের। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। অথচ পদক তালিকার দিকে তাকালে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। জামাইকা, নিউজিল্যান্ড, কেনিয়া বা হাঙ্গেরির মতো মানচিত্রের কোনায় পড়ে থাকা ছোট্ট দেশগুলো যখন মুড়িমুড়কির মতো সোনা জিতে নেয়, তখন আমরা একটা ব্রোঞ্জ পদকের আশায় টিভির সামনে তীর্থের কাকের মতো বসে থাকি।

কেন এই দশা আমাদের? আমাদের কি জিনগত কোনও সমস্যা আছে? নাকি প্রতিভার অভাব? উত্তরটা হল— কোনওটাই না। আমাদের মূল সমস্যা হল ঘুণে ধরা সিস্টেম, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এবং তার পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা দুর্নীতি। আমাদের দেশে ক্রিকেট একটা ধর্ম, আর ক্রিকেটাররা হলেন দেবতা। স্পনসর থেকে শুরু করে মিডিয়া কভারেজ, সবটাই ক্রিকেটের পকেটে। বাকি খেলাগুলো যেন এদেশের সৎমায়ের সন্তান। কিন্তু শুধু ক্রিকেটকে গালমন্দ করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? না। গভীরে গিয়ে দেখলে বুঝবেন, ভারতীয় খেলার জগতের আসল ক্যানসার হল এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা রাজনীতি, স্বজনপোষণ এবং আমলাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি।

দিল্লির লুটিয়েন্স জোন। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান এবং শীর্ষ আমলাদের বাসস্থানের জায়গা। সেখানেই রয়েছে ‘নিউ মোতিবাগ’ নামের এক অভিজাত রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স। ১০০ একর জায়গাজুড়ে থাকা এই কলোনির নিরাপত্তা দুর্ভেদ্য। সাধারণ মানুষের প্রবেশ কড়াভাবে নিষেধ। এই কমপ্লেক্সের ভেতরে উঁকি দিলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। স্বচ্ছ ছাউনির নীচে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছে আমলাদের ছেলেমেয়েরা। পাশে চকচকে টেনিস কোর্ট, কাঠের ফ্লোর যুক্ত ব্যাডমিন্টন কোর্ট, বিলিয়ার্ডস রুম, স্কোয়াশ কিউবিকল এবং অত্যাধুনিক জিম। এক্কেবারে বিশ্বমানের স্পোর্টস কমপ্লেক্স!

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই কোটি কোটি টাকার রাজকীয় পরিকাঠামো কাদের টাকায় তৈরি হল? উত্তরটা শুনলে শিউরে উঠবেন। এই সমস্ত পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (এনএসডিএফ) বা জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিলের টাকায়! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। ১৯৯৮ সালে এই তহবিল তৈরি করা হয়েছিল দেশের তরুণ এবং সম্ভাবনাময় অ্যাথলিটদের বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। ‘টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম’ (টপস)-এর মতো প্রোজেক্ট এই ফান্ডের টাকায় চলে, যার উদ্দেশ্য হল ভারতের পদক-সম্ভাবনা বাড়ানো। যে টাকায় ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত গ্রামের কোনও আদিবাসী আর্চারের জন্য বিদেশি ধনুক আসার কথা, যে টাকায় হরিয়ানার কোনও কুস্তিগিরের আন্তর্জাতিক মানের পুষ্টিকর ডায়েট পাওয়ার কথা— সেই টাকায় দিল্লির বাবুরা নিজেদের কলোনিতে বিলাসবহুল সুইমিং পুল আর টেনিস কোর্ট বানাচ্ছেন!

তথ্য জানার অধিকার আইন (আরটিআই) থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং সরকারি রেকর্ড ঘেঁটে যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, তা রীতিমতো ঘৃণ্য। এই এনএসডিএফ ফান্ডের দেখভাল করে ১২ সদস্যের একটি কাউন্সিল, যার মাথায় স্বয়ং কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী। কিন্তু ফান্ড কাদের দেওয়া হবে, সেই প্রস্তাব পাশ করে ক্রীড়ামন্ত্রকেরই ছ’জন আমলার একটি কমিটি। অর্থাৎ, যে আমলারা তহবিলের টাকা পাশ করছেন, তাঁরাই আবার নিজেদের ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বা ক্লাবের জন্য সেই টাকা বরাদ্দ করছেন! ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬.২ কোটি টাকার বেশি এই তহবিল থেকে ঢালা হয়েছে সিভিল সার্ভিসেস অফিসার্স ইনস্টিটিউট, সেন্ট্রাল সিভিল সার্ভিসেস কালচারাল অ্যান্ড স্পোর্টস বোর্ড এবং নিউ মোতিবাগ রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে।

লুটপাটের খতিয়ানটা একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক। ২০১৯ সালেই এই নিউ মোতিবাগের বাবুরা ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্প থেকে ২.৮ কোটি টাকা হাতিয়েছিলেন নিজেদের স্পোর্টস কমপ্লেক্স বানানোর জন্য। পাঁচ বছর পর, ২০২৪ সালের জুন মাসে, আবার সেই একই ‘রেসিডেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, মোতিবাগ’-এর নামে এনএসডিএফ থেকে ২.২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হল পরিকাঠামো ‘আপগ্রেড’ করার জন্য।

নিউ মোতিবাগ আরডব্লিউএ-র সভাপতি তথা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচন কমিশনার সুধাংশু পান্ডেকে যখন এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তাঁর নির্লজ্জ সাফাই শুনে তাজ্জব হতে হয়। তিনি বলেছেন, ‘সরকারি কলোনিগুলো সরকারই তৈরি করে, তাই সেখানে স্পোর্টস ফেসিলিটি থাকাতে কোনও দোষ নেই। এতে আমলাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, যা পরোক্ষভাবে সরকারের স্বাস্থ্যখাতের খরচ বাঁচায়।’ কী অদ্ভুত যুক্তি! আমলাদের মেদ ঝরানোর জন্য অলিম্পিকের জন্য বরাদ্দ টাকা কেন ব্যবহার করা হবে? দেশের করদাতারা কি এই টাকা দিয়েছিলেন আইএএস-আইপিএস বাবুদের মানসিক শান্তির জন্য, নাকি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের তেরঙা ওড়ানোর জন্য?

দুর্নীতির জাল শুধু আমলাদের কলোনিতেই আটকে নেই। এই স্পোর্টস ফান্ডের টাকা কীভাবে রাজনৈতিক এবং অন্যান্য স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রমাণও মিলেছে। গত কয়েক বছরে রাজস্থানের কোটরায় আরএসএস অনুমোদিত ‘বনবাসী কল্যাণ পরিষদ’-কে অ্যাথলেটিক ট্র্যাক এবং ফুটবল গ্রাউন্ড বানানোর জন্য প্রায় ২.৪১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। ছত্তিশগড়ের ‘বনবাসী কল্যাণ সমিতি’-কে টুর্নামেন্ট করার জন্য ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় ক্রীড়া ফান্ডের টাকা কি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রসারের জন্য যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা যায়?

সবচেয়ে হাস্যকর এবং ক্ষোভের বিষয় হল, স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া এই ফান্ডের ১.০৮ কোটি টাকা খরচ করেছে মালদ্বীপ, জামাইকা এবং সেন্ট ভিনসেন্টের ক্রিকেট বোর্ডকে ‘ক্রিকেট কিট’ উপহার দেওয়ার জন্য! ভারত সরকার দেশের মাটিতে বিসিসিআই-কে কোনও সরকারি অনুদান দেয় না, কারণ ক্রিকেট ইতিমধ্যেই একটি বিপুল লাভজনক শিল্প। অথচ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নামে অলিম্পিকের ফান্ড থেকে বিদেশের মাটিতে ক্রিকেট কিট বিলি করা হচ্ছে! এ যেন নিজের ঘরের ছেলে খেতে না পেয়ে ধুঁকছে, আর বাবা পাড়ার লোককে বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছেন!

অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি স্পষ্ট ভাষায় তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে— আবাসিক কলোনি এবং সিভিল সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনকে এই ফান্ডের টাকা দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ফান্ডে অনুদানের পরিমাণও হুহু করে কমছে। ২০২৩-’২৪ সালের ৮৫.২৬ কোটি টাকা থেকে তা কমে ২০২৫-’২৬ সালে ৩৭.০২ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে।

এই সমস্ত তথ্য চোখের সামনে আসার পর একজন ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে আর কোনও আশা অবশিষ্ট থাকে না। আমরা যখন টিভিতে দেখি স্পনসরের অভাবে অ্যাথলিটরা নিজের খরচে ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়ে যাচ্ছেন, কিংবা কোনও প্রতিভাবান দৌড়বিদ জুতোর অভাবে খালি পায়ে ট্র্যাকে নামছেন, তখন বুকের ভেতরটা ফেটে যায়। আর ঠিক সেই সময়েই দিল্লির বাবুরা অলিম্পিকের টাকায় নিজেদের টেনিস কোর্টের কাঠের মেঝে বদলাচ্ছেন।

যতদিন ভারতের ক্রীড়াজগতে এই আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক স্বজনপোষণ বজায় থাকবে, ততদিন আমাদের অলিম্পিকের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর মাথায় বসে আছেন রাজনৈতিক নেতারা, আর ফান্ডের চাবি নিয়ে বসে আছেন আমলারা। এঁদের কারও ভারতের ক্রীড়া উন্নয়নের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা নেই। এঁদের কাছে স্পোর্টস হল শুধু একটা চারণভূমি, যেখানে ক্ষমতা আর অর্থের অবাধ আস্ফালন করা যায়।

১৪২ কোটির দেশে প্রতিভার কোনও অভাব নেই। অভাব শুধু সদিচ্ছার। যদি সত্যিই আমরা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মানচিত্রে নিজেদের একটা সম্মানজনক জায়গায় দেখতে চাই, তবে সবার আগে খেলার জগৎকে এই দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র এবং রাজনীতির বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত করতে হবে। যে ফান্ডের টাকা ক্রীড়াবিদদের ঘামে আর রক্তে ভেজার কথা, সেই টাকা বাবুদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত জিমে খরচ হওয়াটা শুধু দুর্নীতি নয়, এটা একপ্রকার জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা। এই ব্যবস্থা অবিলম্বে বদলানো দরকার, নইলে পদক তালিকায় ওই তলানিতে পড়েই আমাদের চিরকাল দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে।

(লেখক পেশায় শিক্ষক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *