কোনটা আসল, কোনটা নকল! ধন্দ বিজেপি অনুগামী সরকারি কর্মী সংগঠন নিয়ে। একটির নাম সরকারি কর্মচারী পরিষদ, পশ্চিমবঙ্গ। আর একটি তৈরি হয়েছে পরিষদ শব্দটিকে পরি ষদ হিসাবে পৃথকভাবে ব্যবহার করে, বাকিটুকু হুবহু একই রেখে। যে কর্মচারী সংগঠন গড়ে উঠেছিল ২০১৪ সালে বর্তমান রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহার হাত ধরে, দল ক্ষমতায় আসার পর তার দখল ঘিরে এখন দুই পক্ষের কাজিয়া চরমে এবং কে আসল, কে নকল তার প্রমাণে মরিয়া উভয়েই। পুরনো সংগঠনের সভাপতি দেবাশিস শীল একসময় ছিলেন তৃণমূলের সরকারি কর্মচারী সংগঠনের কোর কমিটির সদস্য। যিনি ডিএ ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সরে আসেন এবং বিজেপি সমর্থিত সংগঠনের হাল ধরেন। নতুন অর্থাৎ দ্বিতীয়টি গড়ে উঠেছে যাঁর হাত ধরে, সেই সন্দীপ সরকার কিছুদিন আগেও ছিলেন আগের সেই সংগঠনের সহ-সভাপতি। যাঁকে নিয়ম ভেঙে গত এপ্রিলে দলের সম্মেলন দক্ষিণ কলকাতার সুজাতা সদনে ডাকায় সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে দাবি প্রথম সংগঠনের কর্তাদের, যার সভাপতি দেবাশিস শীল।
কয়েকদিনের মধ্যেই সংগঠনের রাজ্য সম্মেলন রয়েছে। তার আগে সংগঠনের কর্তৃত্ব নিয়ে আকচাআকচি পুলিশ পর্যন্ত গিয়েছে এবং আদালত পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা বলে খবর। কারণ, ইতিমধ্যে এই বিভ্রান্তিতে ক্ষুব্ধ সরকারি কর্মীরা, যাঁরা বিজেপি সমর্থক। সন্দীপবাবুর অভিযোগ, পরিষদের সভাপতি অনেকদিন হল চাকরি থেকে অবসর নিয়েও পদ আঁকড়ে রেখেছেন। তা ছাড়া দেবাশিসবাবুর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ও সংগঠনের দায়িত্ব তিনি একজন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত একসময় সিএমও-তে চাকরি করা সঞ্জীব পালের মতো সাসপেন্ডেড আধিকারিককে দিতে চান বলে ক্ষুদ্ধ হয়েই সরে গিয়ে রাজ্যের শাসকদলের নেতাদের সমর্থন নিয়েই নতুন সংগঠন গড়েছেন বলে দাবি তাঁর। কয়েকটি জেলা কমিটি হয়ে গিয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই বাকিগুলো হয়ে যাবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশনও হয়েছে। আর সুজাতা সদনের সম্মেলনে তো রাহুল সিনহা এসেছিলেন।” এদিকে দেবাশিসবাবুর নেতৃত্বাধীন পরিষদ আবার প্রতিটি জেলার দায়িত্বে কে কে রয়েছেন, তার তালিকা সামনে এনেছে। তাঁদের সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ ভট্টাচার্য বলেন, “সন্দীপবাবুরা যে সংগঠন গড়েছেন তার ঠিকানা তাঁরই বাড়ি। তাই হয় নাকি! উনি নাম ভাঁড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। আসলে উনি সংগঠনের সভাপতি হতে চান, যা অধিকাংশই মানেন না। সমস্যাটা সেখানেই। রেজিস্ট্রেশনের অনিয়ম নিয়ে আমরা তো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি। তার জন্য কারণ দর্শানোর নোটিসও সন্দীপবাবুরা পেয়েছেন।” দেবাশিসবাবুর দাবি, “ডিএ মামলায় আদালতে পেশ করা কাগজে আমার নামই সংগঠনের তরফে রয়েছে। সুজাতা সদনের সম্মেলন একেবারে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ডাকা হয়। আমি শমীক ভট্টাচার্যকে ফোন করলে তিনি আর যাননি। সেখানে কোনও কমিটি গড়াও হয়নি। আমরা শমীকবাবুর সময় পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি সম্মতি দিলেই সম্মেলন ডাকা হবে।”
আর্থিক দুর্নীতির প্রসঙ্গে দেবাশিসবাবুর পাল্টা, “তৎকালীন ট্রেজারারই তো এখন সন্দীপবাবুর সঙ্গে। তাঁর কাছে হিসাব চান। তিনি যখন ছেড়ে গিয়েছেন, তারপর ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে সমস্ত হিসাব আমি স্বচ্ছতার সঙ্গে রেখেছি। কমিটির তা নিয়ে কোনও প্রশ্নও নেই। উনি পৃথক পরি ষদ গড়ে সদস্য করলেও পরিষদ নামেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। যে সঞ্জীব পালকে সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে ওঁদের আপত্তি, তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। বরং সাসপেনশন উঠে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা। আর সংগঠন যাঁকে চাইবে তিনি দায়িত্ব পাবেন। ওঁকে চাইলে উনিও হতে পারতেন। স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভট্রাইবুনালেও পরিষদের পিটিশনার কিন্তু সন্দীপ সরকার নন। আমি। সুপ্রিম কোর্টের নথিও দেখলে সব পরিষ্কার হবে।” সন্দীপবাবু বলেছেন, “সময়ের সঙ্গে সব স্পষ্ট হবে। ওই কমিটি থেকে অনেকেই বেরিয়ে এসেছেন নানা অভিযোগ তুলে। আমরা কর্মীদের সঙ্গেই আছি।” দুই পক্ষ যে যাই দাবি করুন, কে আসল, কেই বা নকল তা নিয়ে সরকারি কর্মীদের বিভ্রান্তি চরমে এবং সংগঠনে যোগ দিতে গিয়েও এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই।
সর্বশেষ খবর
