আমিষহীন মণ্ডপ

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


শিল্পায়ন নয়, কর্মসংস্থান বা প্রাত্যহিক ব্যবহার্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও নয়, শারদোৎসবের প্রাক্কালে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পুজোমণ্ডপে আমিষ-নিরামিষ নিষেধাজ্ঞা সম্বন্ধীয় বিতর্ক। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অন্যতম কর্মকর্তা স্বামী নির্গূণানন্দ নির্দেশ দিয়েছেন, কোনও দুর্গাপুজো মণ্ডপে আমিষ খাদ্য নিয়ে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এই নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বাঙালি মনে বিবিধ সংশয় উপস্থিত হয়েছে। অনেকে একে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ‘ফতোয়া’ আখ্যা দিয়েছেন।

স্বভাবতই এই নিষেধাজ্ঞায় জনসাধারণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পুজোমণ্ডপে আমিষ দ্রব্য প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অবশ্যই ভিন্ন মাত্রা নিয়েছে। বাঙালির রসনা বরাবরই আমিষ খাদ্যে অভ্যস্ত। পুজো উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মণ্ডপের সামনে বহুবিধ আমিষ খাদ্যের স্টল বসে। পুজোর চারদিন প্রতিমা দর্শনের সময় অল্পবয়সি থেকে প্রবীণদের রসনাতৃপ্ত করার সেই সুযোগে পশ্চিমবঙ্গে বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভও ঘটে।

এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটা সংশয় দেখা দিয়েছে যে, পুজোর সময় আমিষ খাদ্য বিক্রিতে হয়তো রাশ টানতে হবে। সনাতন সংস্কৃতি রক্ষার নামে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা আরএসএস-এর বিভিন্ন বিতর্কিত নির্দেশকে কেন্দ্র করে বহু সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরে উত্তেজনার সঞ্চার হয়ে থাকে। কখনও পোশাকবিধি নিয়ে, কখনও খাদ্যাভ্যাস প্রসঙ্গে এইসব সংগঠনের সমর্থক বা কর্মীদের আচরণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের সুধী সমাজ কোনওদিনই কোনও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু যবে থেকে বিজেপি সরকার এরাজ্যে আসীন হয়েছে, তবে থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিতর্কের আঁচ বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্যের নিষেধাজ্ঞার পর যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাঙালির সামাজিক মননে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বিস্মৃত হয়েছেন যে, আজকের যুগে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার ফল খুব একটা শুভ হয় না। প্রতিক্রিয়া তীব্র হওয়ার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অবশ্য সাফাই দিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা তাদের সংগঠন দেয়নি। তাতে বিতর্ক থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ সংগঠনটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নির্দেশ জারি করায় সাধারণ মানূষের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে।

আমিষ খাদ্যে নিষেধাজ্ঞা ছাড়া ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, প্রতিমার মূর্তি যেন সাবেকি আদলে গড়া হয়। থিমের মূর্তি গড়ে পুজো করা চলবে না। প্রতিমার দশ হাতে যেন শাস্ত্রসম্মত অস্ত্রগুলি থাকে, অন্য কোনও বস্তু প্রতিমার হাতে ধরা থাকলে চলবে না। এই নিষেধাজ্ঞার পর অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে যে, আজকের শারদোৎসবে কোনও আধুনিকতার ছোঁয়া হয়তো আর থাকবে না। মনে রাখা দরকার, অনাধুনিক চিন্তাভাবনা আজকের যুবমননে বিশেষভাবে অপাংক্তেয়।

পশ্চিমবঙ্গের শারদোৎসব বর্তমানে যে রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা শুধু দেশের মধ্যে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও উৎসবটিকে জনপ্রিয় করেছে। দীর্ঘদিনের পথ পরিক্রমা শেষে আজকের শারদোৎসব শুধুমাত্র আড়েবহরে বাড়েনি, এই উৎসবের মাধ্যমে বাঙালি ফিরে পেয়েছে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। প্রতিমা নির্মাণ থেকে মণ্ডপসজ্জায় যে অভিনবত্বের স্বাক্ষর রাখছে বাঙালি, তা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রশংসিত হয়েছে।

শৈল্পিক সুষমামণ্ডিত প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে নব্য প্রতিভার প্রতিফলন ঘটেছে। সাধারণত পুজোমণ্ডপে আধুনিক ধাঁচে নির্মিত প্রতিমার সঙ্গে সাবেক আদলে নির্মিত ছোট একটি প্রতিমা অথবা ‘ঘট’ পুজোর ব্যবস্থা রাখা থাকে। সুতরাং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মকর্তার নিষেধাজ্ঞার আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল না। এই নির্দেশের ফলে সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আরেকটি কারণ, সকলের মনে এই ধারণা পুষ্ট হয়েছে যে, এরপর হয়তো এই উৎসবের যাবতীয় জাঁকজমক অন্তর্হিত হবে। উৎসবের আনন্দকে এই নিষেধাজ্ঞা যে খানিক ম্রিয়মাণ করল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *