উত্তরবঙ্গ ব্যুরো: পাহাড় থেকে তরাই-ডুয়ার্সে গত রবিবারের প্লাবনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বনসম্পদের। অগুনতি বন্যপ্রাণীর দেহ চাপা পড়েছে নদীতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ পলির তলায়। বন্যপ্রাণীদের (Wild Animals) খাদ্যভাণ্ডারও তছনছ হয়ে গিয়েছে। বন দপ্তরের প্রাথমিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, গরুমারা ও জলপাইগুড়ি বন বিভাগ মিলে প্রায় ৮৫ হেক্টর ঘাসজমি ও বনভূমি পুরোপুরি বিনষ্ট। একইভাবে ক্ষতি হয়েছে কার্সিয়াংয়ের বনাঞ্চলের। জঙ্গলের ভিতরে বন্যপ্রাণীদের চেনা জায়গাগুলি প্লাবনে আমূল বদলে যাওয়ায় এবং খাবারের ভাঁড়ারে টান পড়ায় বন্যপ্রাণীরা কিছুটা দিশেহারা হয়েই বেরিয়ে আসছে লোকালয়ে। তাতে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে বুনোদের। আরও বিপদ বাড়াচ্ছে বন সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে দেওয়া ইলেক্ট্রিক ফেন্সিং।
বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদার বক্তব্য, ‘লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীদের ফেরানোতেই এখন আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। পলি সরতেই প্রচুর প্রাণীর মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে। লোকালয় থেকে অনেক প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এই উদ্ধারকাজ শেষ হলে আমরা এরপর বনসম্পদের কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হল, সেটা দেখব।’
শনিবার বিকেলে নাগরাকাটা হোপ চা বাগানে বনশুয়োরের হামলায় জখম হয়েছেন এক চা শ্রমিক। ফুলমতি ওরাওঁ নামে ২৬ বছর বয়সি ওই মহিলা এদিন বিকেলে ৬ নম্বর সেকশনে চা পাতা তোলার কাজ করছিলেন। আচমকা একটি বনশুয়োর তাঁকে আক্রমণ করে। অন্য শ্রমিকরা চিৎকার জুড়ে দিলে বুনোটি পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে সুলকাপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর মালবাজার সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে রেফার করা হয়। বর্তমানে সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলছে। বন দপ্তরের খুনিয়ার রেঞ্জ অফিসার সজল দে বলেন, ‘চিকিৎসার দায়িত্ব আমরাই নিয়েছি।’
গয়েরকাটা চা বাগানে শুক্রবার হাতির হামলায় জখম চা শ্রমিক প্রদীপ কুজুর এদিন মারা যান। ইতিমধ্যেই প্লাবনের পরবর্তীতে বন্যপ্রাণীর হামলায় জেলায় ১১ জন আহত ও একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। আগামীতে এই সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই এখন বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বন দপ্তরের কাছে। সমীক্ষার রিপোর্ট আসার পরে এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ বিভাগের বনপাল ভাস্কর জেভি।
লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর বেরিয়ে আসা নিয়ে শুক্রবার জরুরি বৈঠক হয়েছে বন দপ্তরের কার্সিয়াং ডিভিশনের অন্তর্গত ব্যাংডুবিতে। ওই বৈঠকে বন দপ্তর ছাড়াও এসএসবি, পুলিশ, জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রতিনিধিরা ছিলেন। কার্সিয়াংয়ের ডিএফও দেবেশ পান্ডের বক্তব্য, ‘ইলেক্ট্রিক ফেন্সিং রুখতে এবং দলছুটদের ফেরাতে সমান সক্রিয় রয়েছে আমাদের দল।’
গরুমারা ও জলপাইগুড়ি বন বিভাগের বিভিন্ন বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে জলঢাকা, ডায়না, ডুডুয়া, মূর্তি সহ একাধিক ছোট-বড় নদী। গত সপ্তাহে এই সমস্ত নদী ফুলেফেঁপে উঠেছিল। আর তাদের বয়ে আসা পলির আস্তরণে ঢাকা পড়েছে গরুমারার প্রায় ৩৫ হেক্টর ঘাসজমি। জলপাইগুড়ি বন বিভাগ সূত্রে খবর, জেলার নাথুয়া-ডায়না-সোনাখালি সহ বিভিন্ন বনাঞ্চল মিলে প্রায় ৪৮ হেক্টর বনভূমি পুরোপুরি বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র মোরাঘাট রেঞ্জের ১২ হেক্টর বনাঞ্চল নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। অথচ এই বনভূমি ও ঘাসজমি ছিল বন্যপ্রাণীদের খাবারের অন্যতম ভাণ্ডার। যে জায়গায় অবাধে বন্যপ্রাণীরা ঘুরে বেড়াত সেখানে পলির মোটা আস্তরণ পড়ে তা বন্যপ্রাণীর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বন্যপ্রাণীর মৃত্যু একদিকে যেমন জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি করেছে তেমনই বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের এলাকা চিনতে না পেরে একেবারে দিশেহারা বন্যপ্রাণীরা। একদিকে আতঙ্ক ও অন্যদিকে নিজেদের জায়গা চিনতে না পেরে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
পাহাড়-তরাইয়ের একাধিক বনাঞ্চলে জল ঢুকে যাওয়ার দরুন প্রচুর প্রাণী ভেসে গিয়েছে বলে আশঙ্কা। একাধিক হাতি নিজেদের দল থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। দলছুট এই হাতিরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। এর জেরে সাধারণ মানুষের যেমন বিপদ বাড়ছে, তেমনই বুনোদের বিপদ হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দলছুট একটি হাতি খড়িবাড়িতে লোকালয়ে চলে আসে। রাতভর চেষ্টার পর ভোরের দিকে হাতিটিকে জঙ্গলে ফেরত পাঠান কার্সিয়াং ডিভিশনের বনকর্মীরা। মেচি নদীতে ভেসে যাওয়া একটি ছোট হস্তীশাবকও লোকালয়ে চলে আসে। সেটিকে উদ্ধার করলেও মানুষের সংস্পর্শে চলে আসায় তাকে আর ফেরত নেয়নি তার দল। জলদাপাড়ার পিলখানায় পাঠানো হয়েছে তাকে। শুক্রবার কোচবিহারের পুণ্ডিবাড়িতে একটি গন্ডার লোকালয়ে চলে আসে। তাকে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করে লোকালয় থেকে সরিয়েছে বন দপ্তর।
এদিকে, গরুমারার ভেতরে গরাতি, ধূপঝোরা সহ একাধিক বিটের বহু এলাকায় এখনও বনকর্মীরা পৌঁছোতেও পারেননি। আশঙ্কা, সেখানে পলির নীচে বহু বন্যপ্রাণীর দেহ পড়ে রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি শেষপর্যন্ত কোন পর্যায়ে যায় সেটা এখনও আঁচ করতে পারেননি বনকর্তারা। জলপাইগুড়ি বন বিভাগের ডিএফও বিকাশ ভি বলেন, ‘গাছপালা ছাড়াও জলপাইগুড়ি বন বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় বহু হরিণের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। আগামী বছর ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমির থেকে বেশি যাতে গাছ লাগানো যায় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। জঙ্গলে যাওয়ার বিভিন্ন রাস্তাঘাট যেগুলো বেহাল হয়ে ও ভেঙে গিয়েছে, সেগুলো মেরামত শুরু হয়েছে জোরকদমে।’ গরুমারার ভেতরে ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট তৈরি করছে বন দপ্তরের একটি বিশেষ টিম। জঙ্গলের আনাচে-কানাচে ঘুরে কোনও বন্যপ্রাণীর দেহ উদ্ধার হয় কি না তাও দেখা হচ্ছে। তাতে ছোট কিছু বন্যপ্রাণীর দেহ উদ্ধার হলেও বড় কোনও বন্যপ্রাণীর দেহ উদ্ধার হয়নি। গরুমারায় হাতি সাফারি ও পুনরায় চালু হয়েছে বলে বন দপ্তর সূত্রে খবর।
প্রতি সপ্তাহে স্ট্যাটাস রিপোর্ট সরাসরি বনমন্ত্রীকে পাঠাতে বলা হয়েছে। সেইমতো শনিবারই বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদার কাছে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন উত্তরের বনকর্তারা।
