কলকাতা: ২০২৬-এর নির্বাচনের কুরুক্ষেত্র এখন আর শুধু ধুলো-মাখা রাজপথ বা ময়দানের জনসভা নয় (WB Meeting Election 2026)। যুদ্ধটা এখন স্থানান্তরিত হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘সার্ভার রুম’-এ। আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিনে তাকালে মনে হবে, অমুক দলের জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা, অথবা তমুক নেতার রাজনৈতিক কেরিয়ার ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। ফেসবুকের ওয়ালে বা এক্স-হ্যান্ডেলের হ্যাশট্যাগে দিনরাত চলছে ‘কার্পেট বম্বিং’।
কিন্তু পকেটের স্মার্টফোনটা অফ করে আপনি যখন গ্রামের ধুলোমাখা চায়ের বেঞ্চে বা ট্রেনের কামরায় সাধারণ মানুষের পাশে এসে বসবেন, তখন ছবিটা আমূল বদলে যায়। ‘ভোটপাখি’র আজকের বিশ্লেষণ—ডিজিটাল দুনিয়ার এই কৃত্রিম বা ম্যানুফ্যাকচার্ড তুফান কি আদতে বাংলার মাটির মানুষের মন বদলাতে পারছে? নাকি ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ আর ‘ভিউ’-এর অঙ্কে আত্মতৃপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো দেওয়াল লিখনটাই মিস করে যাচ্ছে?
অ্যালগরিদম বনাম বাস্তব: দুই মেরুর বাসিন্দা
আজকাল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ‘আইটি সেল’ যেন ব্রহ্মাস্ত্র। শোনা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে সব দল মিলিয়ে কেবল সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারেই কয়েকশো কোটি টাকা ঢালছে। ইউটিউবার, ইনফ্লুয়েন্সার আর কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ময়দানে নামানো হয়েছে ‘ভাড়াটে সৈনিক’ হিসেবে। তাঁদের কাজ একটাই—একটা বিশেষ ‘বয়ান’ বা ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এআই জেনারেটেড মিম আর রিলস দিয়ে বোঝানো হচ্ছে—সব কিছু দারুণ চলছে, অথবা প্রতিপক্ষ ধ্বংস হয়ে গেল।
কিন্তু কোচবিহারের প্রত্যন্ত গ্রাম, জঙ্গলমহলের আদিবাসী পাড়া কিংবা সুন্দরবনের বাঁধের ধারের মানুষের কাছে এই ডিজিটাল বয়ানের আয়ু ঠিক কতটুকু? গ্রামের চায়ের দোকানের আড্ডা বা মোড়ের মাথার ‘আসল’ এক্সিট পোল বলছে অন্য কথা। সেখানে হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড বা টুইটার ঝড় নিয়ে আলোচনা হয় না; আলোচনা হয় একশো দিনের বকেয়া টাকা, রাস্তার গর্ত, আলুর অগ্নিমূল্য আর স্থানীয় নেতার দাদাগিরি নিয়ে। ভার্চুয়াল জগতের ‘ঝড়’ আর গ্রাউন্ড জিরোর ‘বাস্তব’—এই দুইয়ের মধ্যে যে কয়েক যোজন ফারাক, সেটাই সম্ভবত এবারের নির্বাচনের সবথেকে বড় ‘ফ্যাক্টর’ হতে চলেছে।
পারসেপশন গেম: মগজধোলাই নাকি বিনোদন?
ভোট এখন অনেকটাই ‘পারসেপশন’ বা ধারণা তৈরির খেলা। দলগুলো ভাবছে, ইউটিউবে লক্ষ সাবস্ক্রাইবার ওয়ালা কোনও ইনফ্লুয়েন্সার যদি তাদের হয়ে দু’টো ভালো কথা বলে, তবেই বুঝি তরুণ প্রজন্মের ভোট পকেটে। কিন্তু বাংলার ভোটার অতটাও বোকা নন। তাঁরা স্মার্টফোনে ভিডিও দেখেন বিনোদনের জন্য, কিন্তু নেতা বাছতে গিয়ে তাঁরা দেখেন নিজের পকেটের অবস্থা আর পাড়ার পরিস্থিতি।
এক প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, “সোশ্যাল মিডিয়া হলো একধরনের প্রতিধ্বনি কক্ষ। এখানে আপনি যা শুনতে চান, অ্যালগরিদম আপনাকে সেটাই শোনায়। আপনি যদি তৃণমূলের সমর্থক হন, আপনার ফিডে কেবল তৃণমূলের প্রশংসাই ভাসবে, আর মোদিজি আপনার নেতা হলে, ফেসবুক ফিড দেখে মনে হবে বিজেপি রাজ্যে প্রায় ক্ষমতায় এসেই গেছে । এর ফলে দলের নেতারাও নিজেদের তৈরি করা ডিজিটাল বুদবুদে বাস করেন এবং ভাবেন তাঁরাই জিতছেন। কিন্তু ইভিএম মেশিনে অ্যালগরিদম খাটে না, সেখানে খাটে বিশ্বাস।”
স্পনসর্ড আবেগ বনাম নীরব বিপ্লব
বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে—ভোটার যখন নীরব হয়ে যান, তখনই শাসকের গদি টলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা সবথেকে বেশি চেঁচামেচি করে, বা কমেন্ট বক্সে যারা রোজ বিপ্লব আনে, তারা ভোটের দিন লাইনে দাঁড়ায় কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু যে মানুষটা চুপ করে সব দেখছে, চায়ের দোকানে বসে কেবল মাথা নাড়ছে আর মুচকি হাসছে—তাঁরাই আসল ‘গেমচেঞ্জার’।
২০২১ বা ২০২৪-এও দেখা গিয়েছিল, মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ার হাওয়া এক কথা বলছে, আর রেজাল্ট বেরোনোর পর দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। ২০২৬-এও কি সেই সাইলেন্ট ভোটাররা বা ‘নীরব বিপ্লবীরা’ প্রস্তুত? ডিজিটাল কোলাহলের আড়ালে যে জনরোষ বা জনসমর্থন তৈরি হচ্ছে, তা মাপার যন্ত্র কোনো আইটি সেলের কাছে নেই।
শেষমেশ প্রশ্নটা বিশ্বাসযোগ্যতার। ফেসবুকে ভেসে আসা একটা ৩০ সেকেন্ডের এডিট করা ভিডিও দেখে কি কেউ নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ বদলে ফেলে? সম্ভবত না। বরং অতিরিক্ত প্রচার অনেক সময় ভোটারের মনে বিরক্তি তৈরি করে। মানুষ এখন বোঝে—কোনটা খবর আর কোনটা টাকার বিনিময়ে করা ‘স্পনসর্ড’ প্রচার।
২০২৬-এর লড়াইয়ে ডিজিটাল মিডিয়া প্রচারের একটা বড় হাতিয়ার ঠিকই, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। সোশ্যাল মিডিয়া হাওয়া তৈরি করতে পারে, কিন্তু ঢেউ তুলতে পারে না। মনে রাখবেন, যে আঙুল স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্ক্রল করে, আর যে আঙুল ইভিএমের বোতাম টেপে—তাদের ভাষা সবসময় এক হয় না। যারা ডিজিটাল ঝড় দেখে নিশ্চিন্তে এসি রুমে বসে আছেন, ভোটের ফল বেরোনোর দিন তাদের জন্য বড় চমক অপেক্ষা করতেই পারে।
