পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: ‘লাভ ইস ইন দ্য এয়ার’ কিংবা ‘ভালোবাসার মরশুম’ যাই বলুন না কেন আশপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালোই জানান দিচ্ছে, ভালোবাসার সপ্তাহ (Valentine’s Week) ঠিকই গুটিগুটি পায়ে হাজির হয়েছে। শহরের বিশ্বাসপাড়া, ডানলপ, নিউটাউন, মঙ্গলপুর, তহবাজার সহ বিভিন্ন এলাকার উপহারের দোকানগুলিতে ঢুকলেই চোখে পড়ছে লাল, গোলাপি, সাদা সহ নানান রংয়ের টেডি বিয়ারের সমাহার। কারও হাতে ছোট্ট, তো কারও কোলে প্রায় মানুষের সমান। ভ্যালেন্টাইন্স ডে যত এগিয়ে আসছে, ‘টেডি ডে’ (Teddy Day) ঘিরে এই নরম খেলনাগুলিই যেন সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার কথা বলে দিচ্ছে। এক সময় যা ছিল শুধুই শিশুর ঘুমপাড়ানিয়া সঙ্গী, আজ সেই টেডিই প্রেমের ভাষা হয়ে উঠেছে।
এই বদলে যাওয়া টেডির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক অভিযোজনের গল্প। এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও। বালুরঘাট জেলা হাসপাতালের মনোবিজ্ঞানী ডাঃ ঋতব্রত চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার থেকে আলাদা ঘুমোয়। তাদের নিরাপত্তা আশ্বস্ত করতে এই টেডি বিয়ার দেওয়া হয়। একাকিত্বের ভীতি কমাতেও এটা কাজে আসে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে টেডি সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও যত্নশীল হওয়ার চিহ্ন। তাই টেডি উপহার পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনকে মজবুত করার প্রতীক।’ তবে শুধু ছেলে ও মেয়ের মধ্যেই এটা সীমাবদ্ধ নয়। যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রেই উষ্ণতা ও যত্নশীলতার মানসিক জায়গা রয়েছে। তাই আগের তুলনায় এখন টেডি উপহারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
এই মনস্তত্ত্বই যেন ধরা পড়ছে নতুন প্রজন্মের কথাতেও। কলেজ পড়ুয়া খাদিমপুরের নিকিতা দাসের কথায়, ‘ছোটবেলায় নিজের একটা টেডি ছিল। সবসময় বিছানায় রাখা থাকত। এখন প্রিয়জন টেডি উপহার দিলে বুঝি অনুভূতিটা বদলালেও আসলে সেই নরম নিরাপত্তার জায়গাটাই হয়তো খুঁজি।’ তাঁর মতে, টেডি মানে এমন কিছু, যাকে জড়িয়ে ধরলে না বলেও অনেক কথা বলা যায়। একই অনুভূতির কথা জানালেন রঘুনাথপুরের মেকআপ আর্টিস্ট ঐশানি সাহাও। ‘কর্মসূত্রে স্বামী সবসময় পাশে থাকতে পারেন না। তখন টেডিটা যেন আমার হয়ে থাকে’, হাসতে হাসতে বললেন তিনি। তাঁর কাছে টেডি প্রেমের স্মারক, আবার নিঃশব্দ সঙ্গীও।
বাজারেও এই বদল স্পষ্ট। মঙ্গলপুরের এক উপহার দোকানের বিক্রেতা শুভঙ্কর ঘোষের কথায়, ‘আগে টেডি মানেই বাচ্চাদের জিনিস ছিল। এখন টেডি ডে-র আগে বড় সাইজের টেডিও ভালোই বিক্রি হয়। শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা নয়, বন্ধু এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এর চাহিদা বেড়েছে।’ শিশুর ঘুমঘরের কোণ থেকে প্রেমের উপহারের বাক্স। টেডি বিয়ারের এই যাত্রা আসলে মানুষের আবেগী নিরাপত্তা ও উষ্ণতার চিরন্তন চাহিদারই আরও এক রূপ। শব্দ বদলালেও অনুভূতির নরম ছোঁয়া যে আজও অটুট, টেডি ডে তারই নীরব সাক্ষ্য।
