রুমি বাগচী, লস অ্যাঞ্জেলেস: বিশ্বকাপ মানেই কেউ হাসিমুখে এগিয়ে যাবে, আর কেউ চোখের জলে বিদায় নেবে। জগতের সমস্ত জয়ের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে একটি পরাজয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের (Los Angeles) সোফাই স্টেডিয়ামের (So Fi Stadium) গ্যালারিতে বসে আজ ভেবেছিলাম, খেলাটা বোধহয় একেবারে সাদামাঠা হবে। কারণ, প্রথম দুই ম্যাচ জিতে আমেরিকা আগেই নকআউটে পৌঁছে গিয়েছে, আর অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের কাছে হেরে তুরস্কের বিদায় নিশ্চিত। কিন্তু ফুটবল এমনই এক জাদুকরি খেলা, যেখানে অবিরত সব হিসেব ওলটপালট হয়ে যায়। তুরস্কের বিদায়ের শেষ সন্ধ্যাটাও লস অ্যাঞ্জেলেসের বুকে এক অদ্ভুত সুন্দর কাব্যের জন্ম দিল।
প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে এই স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কুড়ি মিনিট ড্রাইভ করলেই বিখ্যাত ম্যানহাটন বিচ। সেখানেই একটি হোটেলের জানলা দিয়ে ম্যাচের দিন সকালেও নিশ্চিন্তে সার্ফিং দেখছিলেন মার্কিন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো (Mauricio Pochettino)। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, এই নিয়মরক্ষার ম্যাচে ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ (Christian Pulisic), অ্যান্টনি রবিনসন, টাইলার অ্যাডামসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের বিশ্রামে রেখে প্রথম একাদশে ৯টি পরিবর্তন করেন।
রিজার্ভ বেঞ্চ নামানোর এই ফাটকা শুরুতে দারুণ কাজে লেগেছিল। ৩ মিনিটে কর্নার থেকে অস্টন ট্রাস্টির দুরন্ত হেডে এগিয়ে যায় আমেরিকা। এটি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দ্রুততম গোল। লাল-সাদা জার্সিতে মোড়া গ্যালারি তখন উল্লাসে ভাসছে, মনে হচ্ছিল আয়োজকদের সামনে আরেকটি সহজ জয় অপেক্ষা করছে। কিন্তু তুরস্ক মাঠে নেমেছিল সারা দুনিয়ার সামনে নিজেদের সম্মানটুকু আদায় করে নেওয়ার মরিয়া তাগিদ নিয়ে। সেই শেষ সুযোগেই আলো ছড়ালেন তাঁরা। মাঝমাঠের শিল্পী হয়ে উঠলেন তুরস্কের তরুণ তারকা আর্দা গুলের। ১০ মিনিটেই তাঁর গোলে সমতা ফেরে। অন্যদিকে, অরকুন কোকচু দলের মস্তিষ্ক হয়ে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। তাঁর সাজানো ছকেই ৩১ মিনিটে বারিস ইলমাজের গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় তুরস্ক।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র বদলাতে শুরু করলে চিন্তিত পচেত্তিনো বাধ্য হয়ে মাঠে নামান দলের সেরা তারকা পুলিসিচকে। আক্রমণে গতি ফেরে মুহূর্তেই। ৪৯ মিনিটে সেবাস্টিয়ান বারহল্টারের এক দর্শনীয় ভলিতে সমতায় ফেরে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর পুলিসিচের একটি দুর্দান্ত শট পোস্টে লেগে ফেরে। তেকাঠির নীচে তুরস্কের গোলকিপার উগুরজান চাকিরও বিদায়বেলায় সর্বশক্তি দিয়ে মার্কিন আক্রমণ রুখে দিচ্ছিলেন। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটা হয়তো ড্রয়ের দিকেই এগোচ্ছে, ঠিক তখনই তুরস্কের কোচ ভিনসেঞ্জো মন্টেলা শেষ অস্ত্র হিসেবে কান আয়হানকে মাঠে নামান। সংযোজিত সময়ের একেবারে শেষমুহূর্তে সমস্ত আমেরিকান সমর্থকদের হতভম্ব করে এক দুর্দান্ত গোলে ম্যাচের শেষ অধ্যায়টি নিজের নামে লিখে ফেলেন আয়হান।
আমেরিকা হারলেও কোচ পচেত্তিনো খুশি। ১ জুলাই সান্টা ক্লারায় শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি জানিয়েছেন, এই কঠিন গ্রুপে শীর্ষে থাকাটা দারুণ ব্যাপার। অন্যদিকে, ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় ছিনিয়ে নিয়ে মাথা উঁচু করেই বিদায় নিল তুরস্ক। বিশ্বকাপের শহরগুলিতে শুধু বিজয়ের উল্লাস জমা হয় না, জমা হয় পরাজয়ের দীর্ঘশ্বাসও। যখন একটি দল জানে তাদের স্বপ্ন শেষ, তবুও শুধু দেশের পতাকার সম্মানে শেষবারের মতো মাঠে বুক চিতিয়ে লড়ে যায়, তাকেই বলে বিশ্ববন্দিত ফুটবল। আজ লস অ্যাঞ্জেলেসের এই রোদেলা গ্রীষ্মে সেই ফুটবলেরই জয় হল।

