মনোজ বর্মন, শীতলকুচি: কথায় বলে, ‘ঠেলায় না পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে না’। এই প্রবাদটির বাস্তব রূপ দেখল শীতলকুচি (Sitalkuchi)। যে ব্লকে তৃণমূলের বাহুবলী নেতাদের দাপটে টুঁ শব্দটি করতে পারে না বিরোধীরা, সেখানে দিনেদুপুরে বাজারের মাঝখানে এক বিরোধী দলের নেতার সামনে হাঁটু গেড়ে, তাঁর পা ধরে ক্ষমা চাইলেন তৃণমূল নেতার তিন ভাই। রবিবার সকালে ঘটনাটি ঘটেছে শীতলকুচি বাজারে।
এদিন ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা আবু বক্কর সিদ্দিকের পা ধরে ক্ষমা চাইতে দেখা গেল তৃণমূল নেতা সায়ের মিয়াঁর তিন ভাইকে। সায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের কিষান খেতমজদুর সংগঠনের ব্লক সভাপতিও বটে। এদিন তাঁর ভাই জিয়ারুল মিয়াঁ এবং খুড়তুতো ভাই সৈয়ব মিয়াঁ ও যশো মিয়াঁ আবু বক্করের পা ধরে ক্ষমা চেয়েছেন তাঁদের পুরোনো কৃতকর্মের জন্য। এদিন ক্ষমাপ্রার্থনার সময় উপস্থিত বাসিন্দাদের মোবাইলে ছবি না তোলার অনুরোধ করেন তাঁরা।
এই ঘটনা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছে স্থানীয় রাজনীতিতে। কারণ, এই ভাইদের বাহুবলের ওপর ভর করেই শীতলকুচি ব্লকজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতেন তৃণমূল নেতা সায়ের। আর আবু বক্করেরও দাপট একসময় কম ছিল না।
হঠাৎ ক্ষমাপ্রার্থনা কেন? এর পিছনে লম্বা কাহিনী রয়েছে। ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটে গোলেনাওহাটি গ্রামে আবু বক্কর তাঁর স্ত্রীকে বামফ্রন্টের প্রার্থী করেছিলেন। তাতে তৃণমূল নেতার ভাইরা তাঁর উপর ক্ষিপ্ত হন। সেসময় একদিন শীতলকুচি বাজারে এসেছিলেন আবু বক্কর। তাঁকে আটকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়া হয়। সেই ঘটনায় মামলা দায়ের হয় শীতলকুচি থানায়। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। তারপর গত প্রায় ১২ বছরে শীতলকুচিতে রাজনৈতিক উত্থানপতন হয়েছে অনেক। এসবের মধ্যে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আবু বক্করের ওপর চাপ দেওয়া হয়। আবু নতিস্বীকার করেননি। কারণ তাঁর দল ক্ষমতায় না থাকলেও ব্যক্তিগত প্রভাব কমেনি আবু বক্করের। তাঁর দুই ছেলে রাজ্য পুলিশে চাকরিরত। তাঁকে অন্তত হুমকি দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করানো যাবে না, সেটা বুঝেছে তৃণমূল। সেজন্য এই রাস্তা বেছে নিয়েছেন নেতার ভাইরা। এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
তৃণমূল নেতার ভাইরা আবু বক্করকে মামলাটি তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আবুর জবাব ছিল, শীতলকুচি বাজারে প্রকাশ্যে তাঁকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তাতে তাঁর সম্মানহানি হয়েছে। তাই যেখানে তাঁকে মারধর করা হয়েছে, সেখানেই অভিযুক্তরা ক্ষমা চাইলে তিনি বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আর আবুর এই শর্তে রাজি হয়ে যান জিয়ারুলরা। রবিবার হাঁটু গেড়ে আবু বক্করের পা ধরে ক্ষমা চান তিন ভাই।
ঘটনার পর কোনও পক্ষই খুব একটা হইচই চাইছে না। আবু বলছেন, ‘আমার বয়স বেড়েছে। মামলার ঝামেলায় থাকতে চাই না। অভিযুক্তরা তাদের ভুলে অনুতপ্ত হয়েছে। আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আদালতে শুনানির পরবর্তী তারিখে মামলা মিটিয়ে নেওয়ার আবেদন জানাব।’
আর তৃণমূল নেতা সায়ের আলির কথায়, ‘এভাবে মামলার নিষ্পত্তি হয় না। বিচারাধীন মামলা নিয়ে কিছু বলতে চাই না।’
