গৌতম সরকার
তিনদিন পার। দলের হারের পর রায়গঞ্জে সেই যে তৃণমূলের (TMC) জেলা দপ্তর বন্ধ হয়েছে, আর খোলার কাউকে পাওয়া যায়নি। কোচবিহারের ভাওয়াল মোড়ে তৃণমূলের জেলা দপ্তরের একই অবস্থা। শিিলগুড়িতে জেলা দপ্তর তালাবন্ধ। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কার্যালয় ইতিমধ্যে ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছে। ফুলবাড়ি, পোড়াঝাড়, অম্বিকানগর, নিউ জলপাইগুড়ি ইত্যাদি এলাকায় রাতারাতি উধাও তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা।
জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারে কেয়ারটেকাররা দপ্তরের তালা খুলছেন বটে। কিন্তু দিনভর খাঁখাঁ করছে অফিসগুলি। না আছে কর্মীদের ভিড়, না আছে নেতাদের উপস্থিতি। জলপাইগুড়ি ও বালুরঘাটে জেলা পরিষদের অফিস শুনসান। সভাধিপতি, কর্মাধ্যক্ষরা আসছেন না। ফলে অতি সামান্য কাজে গিয়েও ফিরে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব ফল প্রকাশের পর বুধবার প্রথম পুরনিগমের দপ্তরে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ কিংবা গঙ্গারামপুর পুরসভায় জনপ্রতিনিধিরা উধাও।
জলপাইগুড়ির থানা মোড়ে নিয়মিত আড্ডা জমত তৃণমূল নেতাদের। তাঁদের মধ্যে জলপাইগুড়ি সদর ব্লক সভাপতি শেখর মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। তিনদিন ধরে তিনি ও তাঁর সতীর্থরা উধাও। বিদায়ি উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহের তাঁর দিনহাটার বাড়ি ছেড়ে অজানা ঠিকানায় উধাও হয়ে যাওয়ার খবর নিয়ে হইচই হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গজুড়ে আরও অনেক জেলা স্তরের নেতার কোথাও দেখা নেই। অনেকের মোবাইল বন্ধ। বাড়িতে সবাই নেই। কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছেন, বলতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও।
বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কর্মীরা আক্রান্ত হলেও তাঁদের পাশে দাঁড়াতে প্রকাশ্যে আসছেন না কোনও নেতা। আক্রান্ত কর্মীরা তাঁদের দুর্দশা জানাতে কোনও নেতাকে খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে কর্মীরা অসহায়। তাঁদের দেখভাল করার কেউ নেই। তাঁরা এতই সন্ত্রস্ত যে, নিজেদের নাম, পরিচয় জানাতে ভরসা পাচ্ছেন না। ফুলবাড়ি মোড়ে তৃণমূল সমর্থক এক শিক্ষকের কথায়, ‘দেখে মনে হচ্ছে না, তিনদিন আগেও তৃণমূল ছিল শাসকদল।’
শিলিগুড়ির সুভাষপল্লিতে পরিচিত তৃণমূলপন্থী দোকানদার আক্ষেপ করলেন, ‘হারার সঙ্গে সঙ্গে যেন নেতাদের কাছে দলটার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গিয়েছে। সকলের এখন আপন প্রাণ বাঁচা অবস্থা।’ টেলিফোনে কোচবিহারের ছাগলবেড় এলাকার এক তৃণমূল কর্মীর কথা হাহাকারের মতো শোনাল। তাঁর কথায়, ‘এই দলটার নির্দেশে কত লাঠি ধরেছি। এখন আমাদের যখন মার খাওয়ার মতো অবস্থা, তখন আমাদের দেখভাল পরের কথা, খোঁজখবর করারও কেউ নেই।’
রায়গঞ্জের কর্ণজোড়া এলাকায় তৃণমূলের সরকারি কর্মচারী সংগঠনের এক কর্মকর্তা বুধবার রাতে টেলিফোনে বলেন, ‘বিজেপি যে সবাইকে মারছে বা সব দপ্তরে কিংবা নেতাদের বাড়িতে চড়াও হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। কিন্তু ভয়ে কোনও নেতা বাড়ির বাইরে পা রাখছেন না। এমনকি চা খেতে দোকানে পর্যন্ত কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আমরা সরকারি কর্মী। অফিস যেতেই হচ্ছে। কী যে হবে, বুঝতে পারছি না!’
তাঁর কথায়, ‘আগে কিছু হলে জানালে পুলিশ পদক্ষেপ করত। এখন পদক্ষেপ ছাড়ুন, তৃণমূলের লোকদের কথায় কানও দিচ্ছে না। উলটে দূর ছাই করছে। পরিচিত পুলিশ অফিসাররাও যে এমন পালটি খেলেন, বিশ্বাস করতে পারবেন না।’ কোচবিহারের কালজানিপাড় থেকে মালদার মহানন্দা তীর পর্যন্ত তৃণমূলে এখন আতঙ্কের পরিবেশ। নেতারা সবাই নিজেদের গুটিয়ে ফেলছেন।
২০১১ সালে নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর সিপিএমের মতো সংগঠন ও ক্যাডারভিত্তিক দল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। সেই তুলনায় তৃণমূলের মতো নির্দিষ্ট মতাদর্শবিহীন দল এই ঝাপটা আদৌ সামলাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গণনার দিন বলেছিলেন বটে, ‘উই উইল বাউন্স ব্যাক’, কিন্তু এই ভীরু, প্রথম আঘাতে আত্মগোপনকারী নেতাদের ভরসায় তা সম্ভব কি না, সেই সংশয় থাকছে।
সিপিএম ভেঙেছিল তােসর ঘরের মতো। অনেক ভোট এবারও বিজেপিতে চলে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও সিপিএম ভোটের হার সামান্য বাড়িয়েছে। কিছু নেতা লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন বলে সেটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু হুড়মুড়িয়ে দেওয়াল ভেঙে পড়ার অবস্থায় তৃণমূল। এখনও দলীয় দপ্তরে আলো জ্বালানোর লোক নেই অনেক জায়গায়। এরপর সাংগঠনিক কাজ করার মতো নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
তিনদিন আগের শাসকদল তৃণমূল এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
