দুর্গাপুজো মানে শুধুই উৎসব আর আলোর রোশনাই নয়। প্রাচীন প্রথা, পুরনো রীতির কাহিনি এই উৎসবকে এক অন্যমাত্রা নিয়ে যায়। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রীতি, ঘরে ঘরে রয়েছে পৃথক গল্প। তবে পুজো আছে কিন্তু মাটির মূর্তি নেই! এ বড়ই অদ্ভুত। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে এভাবে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে বীরভূমের খরুণ গ্রামের রায়বাড়িতে। মাটির প্রতিমার বদলে এখানে পূজিতা হন শোলার তৈরি দুর্গা। শুধু তাই নয়, দশমীর দিন হয় না প্রতিমা বিসর্জনও। মহালয়ার বিকেলেই সম্পন্ন হয় নিরঞ্জনের আচার। অবাক হচ্ছেন! এমনই রীতি এবং ঐতিহ্য মেনেই সাড়ে তিন শতক ধরে পুজো হয়ে আসছে রায়বাড়িতে।
রামপুরহাট ১ ব্লকের এই বিখ্যাত রায়বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাচীন কাহিনিও। পরিবারের সদস্যদের মুখে মুখে চলে আসছে সেই আখ্যান। কথিত রয়েছে, মহাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে রায় পরিবারের এক কুমারী মেয়ে দেবীকে প্রদীপ দিতে মন্দিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ পরও তিনি বাড়ি না ফেরায় পরিবারের মহিলারা তাঁকে খুঁজতে মন্দিরে যান। সেখানে গিয়ে নাকি তাঁরা দেখতে পান, দেবীর মুখে জড়িয়ে রয়েছে ওই কুমারীর শাড়ির আঁচলের অংশ। সেই ঘটনার পর থেকেই মাটির প্রতিমার বদলে পটের দুর্গার আরাধনা শুরু হয়েছিল বলে পরিবারের প্রবীণদের দাবি। পরবর্তীকালে সেই পটের রীতিই বদলে যায় শোলার প্রতিমায়। বর্তমানে গ্রামের শিল্পী বুদ্ধদেব মালাকার নিজ হাতে তৈরি করেন দেবীর শোলার অবয়ব। পুজো শেষ হলেও প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয় না। সারা বছর রায়বাড়ির মন্দিরেই প্রতিষ্ঠিত থেকে নারায়ণের সঙ্গে পূজিতা হন দেবী।
আরও পড়ুন:
পুজোর আচারেও রয়েছে একাধিক ব্যতিক্রম। মহালয়ার পরদিন প্রতিপদ থেকেই নতুন করে শুরু হয়ে যায় দুর্গা আরাধনা। সাদা ছাগ বলির মধ্য দিয়ে পুজোর সূচনা হয়। সপ্তমীর সকালে দোলা আনার পর শুরু হয় সিঁদুর খেলা। এরপর সপ্তমীর পুজো। অষ্টমীর সন্ধিপুজোর পর রয়েছে সাদা ছাগ বলির রীতি। নবমীতে পরিবারের শরিকদের তরফে ১৪টি ছাগ বলির প্রথাও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এখানে দশমীর দিন দেবীর বিসর্জন হয় না। মহালয়ার বিকেলে নিরঞ্জনের আচার সম্পন্ন করার পর ফের পরদিন থেকেই শুরু হয় নতুন বছরের পুজোর প্রস্তুতি। এই বাড়ির মন্দিরে সারা বছরই উমা থাকেন। ফলে রায়বাড়ির দুর্গোৎসবে বিসর্জনের চেনা বিষাদের সঙ্গেও মিশে রয়েছে এক ভিন্ন আবেগ।

রায় পরিবারের সদস্য অমিতকুমার রায়ের দাবি, প্রায় ৩৫০ বছর আগে তৎকালীন জমিদার রামকানাই রায় ও রামনিধি রায় যৌথভাবে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে পুজোর উপকরণ ও প্রতিমার ধরন বদলালেও প্রাচীন আচার ও পারিবারিক রীতিগুলি এখনও অটুট রয়েছে। লোককথা, ইতিহাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে তাই খরুণের রায়বাড়ির দুর্গাপুজো আজও এলাকার অন্যতম আকর্ষণ।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
