মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: পুজোয় বোনাস মেলেনি। বকেয়া মজুরি নিয়েও দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। তার জেরে পাঁচ চা বাগানের ম্যানেজার গ্রেপ্তার হওয়ার পর এবার বাগান পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিতে চাইছেন মেরিকো অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের বাগানগুলির শ্রমিকরা। অস্থায়ী পরিচালন সংস্থার কর্তৃত্ব মানতে নারাজ তাঁরা। বুধবার ধূমচিপাড়া ও হান্টাপাড়া চা বাগানে (Tea backyard) বৈঠক করে শ্রমিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিজেদের তোলা কাঁচা পাতা আর মেরিকোর হাতে তুলে দেওয়া হবে না। সরাসরি অন্য ব্যবসায়ীর কাছে পাতা বিক্রি করবেন তাঁরা। এ নিয়ে এক ব্রোকারের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে বলে খবর। একই পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বীরপাড়া চা বাগানের শ্রমিকরাও। শ্রমিকদের এই সিদ্ধান্তে মাদারিহাট-বীরপাড়া (Birpara) ব্লকের চা শিল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০১৫ সালে ডানকানসের বাগানগুলি বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে তার মধ্যে ছ’টি বাগান পরিচালনার দায়িত্ব পায় মেরিকো অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। বর্তমানে বান্দাপানি বাগান প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ। বীরপাড়া, গ্যারগান্ডা, ধূমচিপাড়া, হান্টাপাড়া ও তুলসীপাড়া বাগানে গত বছরের ১০ শতাংশ এবং চলতি বছরের ১০ শতাংশ বোনাস বকেয়া রয়েছে বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। নিয়মিত মজুরি না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এদিন বৈঠক করে ধূমচিপাড়া ও হান্টাপাড়ার শ্রমিকরা জানিয়ে দিয়েছেন, বৃহস্পতিবার থেকে তাঁদের তোলা কাঁচা পাতা মেরিকোকে দেওয়া হবে না। বিক্রির টাকা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পাওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
তবে শ্রমিকদের এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সহ সভাপতি নারায়ণ খোরা বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট পরিচালন সংস্থা থাকা সত্ত্বেও এভাবে চা বাগানের পাতা কেউ তুলতে বা বিক্রি করতে পারেন না। কারণ তা বেআইনি।’ অন্যদিকে, তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি উত্তম সাহার দাবি, ‘মেরিকো ওই ছ’টি বাগানের একটিরও লিজ পায়নি বলেই জানি। ফলে মেরিকো এখনও পর্যন্ত অফিশিয়ালি ওই বাগানগুলির পরিচালন সংস্থা নয়। লিজ না পেলেও সংস্থাটি বাগানগুলি কয়েক বছর ধরে পরিচালনা করছে। ফলে সরকারের এ নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করা উচিত।’
বাগানগুলির লিজ নিয়ে ধোঁয়াশা আরও বাড়িয়েছে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনা। মেরিকোর কর্ণধার সুরজিৎ বক্সীর ফোন বন্ধ থাকায় সংস্থার বক্তব্য জানা যায়নি। ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা অমিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ‘এই প্রশ্নের সদুত্তর আমার কাছেও নেই। কারণ সংস্থাটির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’ শ্রমিক সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, লিজের প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ হয়নি। শ্রম দপ্তর সূত্রেও এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
ন্যাশনাল লেবার কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং জাতীয় চা মজদুর কংগ্রেসের উত্তরবঙ্গের চেয়ারম্যান মান্নালাল জৈনের বক্তব্য, ‘জেলা শাসকের তত্ত্বাবধানে কমিটি গড়া ছাড়া শ্রমিকরা আইনত পাতা তুলে বিক্রি করতে পারেন না।’ শ্রম দপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকার জেলা শাসকের।’ কিন্তু আইনি জটিলতার অপেক্ষায় থাকতে রাজি নন শ্রমিকরা। ধূমচিপাড়ার শ্রমিক তথা পশ্চিমবঙ্গ চা মজুর সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হেমলতা ওরাওঁ বলেন, ‘এক বছর ধরে নিয়মিত মজুরি পাচ্ছি না। গত বছর এবং এ বছরের মোট ২০ শতাংশ বোনাস বকেয়া। তাই আমরা নতুন ব্রোকারের কাছে কাঁচা পাতা বিক্রি করব।’

