অভিষেক ঘোষ, মালবাজার: এবার মণিপুরের এক ঠিকাদারি সংস্থার থেকে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ উঠল মালবাজার পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন সাহার বিরুদ্ধে (Swapan Saha)। মালবাজার (Malbazar) শহরের উন্নয়নের জন্য ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পের মউ স্বাক্ষর হয়েছিল ওই সংস্থার সঙ্গে পুরসভার। তবে, সেই কাজের একটিও হয়নি শহরে। সংস্থার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কাজ শুরুর আগেই বরাত দেওয়ার সময় পুর চেয়ারম্যান ৫০ লক্ষ টাকা দাবি করেছিলেন। সেই টাকা তাঁকে দেওয়াও হয়েছিল।
স্বপনের দাবি, সেই চুক্তি আগেই বাতিল করে সংস্থাকে জানানো হয়েছিল। কাটমানির অভিযোগ সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন স্বপন। তবে, এতবড় বরাত দেওয়ার আগে পুরসভার বোর্ড মিটিংয়ে রেজোলিউশন নেওয়া, অর্থ দপ্তরের কাছে তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো- এসব ব্যাপারে কোনও কথাই বলতে চাননি স্বপন।
সূত্রের খবর, দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে মাল শহরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল মণিপুর স্টেট কোঅপারেটিভ ইউনিয়ন টেকনিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং সেল। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে পুরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান স্বপন সাহা আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২০২২ সালের ৩০ মে ইম্ফলের ওই সংস্থার কাছে ই-মেল করে পুরসভার তরফে সবুজসংকেত দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, পুরসভার বোর্ড মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই সংস্থাকে শহরে পানীয় জলের আম্রুত প্রকল্প, বাংলার বাড়ি, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, গ্রিন সিটি মিশনের কাজের পাশাপাশি শহর ও সংলগ্ন এলাকায় রোপওয়ে সহ ইকো ট্যুরিজম সেন্টার, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, মার্কেট কমপ্লেক্স, ১৫০০ আসনের অডিটোরিয়াম, সুইমিং পুল সহ ইন্ডোর স্টেডিয়াম নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই সমস্ত কাজের বাস্তবায়নের জন্য নোডাল এজেন্সি হিসাবে কাজ করবে তারা। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কাজের বরাত দেওয়া হয় তাদের।
২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পুরসভার অন্যান্য কাউন্সিলারদের অজান্তেই মণিপুরের সংস্থার সঙ্গে মউ স্বাক্ষর হয় পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন সাহা এবং এজেন্সির প্রোজেক্ট ডিরেক্টর আরকে রাজেন সিংয়ের মধ্যে। সংস্থার প্রোজেক্ট ডিরেক্টরের অভিযোগ, ‘৬০০ কোটি টাকার কাজের বিনিময়ে ৫০ লক্ষ টাকার কাটমানি দাবি করেছিলেন চেয়ারম্যান। সেইমতো তঁাকে টাকা মেটানো হয়েছিল। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’
সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, ওইদিন পুরসভার চেয়ারম্যানের কক্ষে মউ স্বাক্ষর হয়েছিল। সেখানে সংস্থার তরফে রাজেন সিং এবং পুরসভা তরফে চেয়ারম্যান সই করেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেখানে সাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর ছিল একমাত্র কাউন্সিলার সুরজিৎ দেবনাথের। ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুরসভায় বেশকিছু প্রকল্পের ডিপিআর জমা করেন রাজেন সিং। যার মধ্যে ছিল কমিউনিটি হল, মার্কেট কমপ্লেক্স, বাংলার বাড়ি সহ কিছু প্রকল্প।
পুরকর্মী থেকে আধিকারিকদের ধারণা, কাটমানির তত্ত্ব সঠিক হলে সুরজিৎ দেবনাথও এর সঙ্গে জড়িত। সুরজিতের দাবি, ‘রাজেন নিজেই উদ্যোগ ও দায়িত্ব নিয়ে পুরসভায় এসেছিলেন। তবে, তিনি কোনও কাজ করেননি।’ সুরজিতের আরও বক্তব্য, ‘উন্নয়নের কাজে আমি সর্বদা এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি। তৎকালীন চেয়ারম্যানের নির্দেশেই আমি ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। কোনও কাটমানি নেওয়ার প্রশ্নই নেই।’
২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরের শিলিগুড়ি পুরনিগমের বাজেট ছিল প্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা। সেখানে ই-ক্যাটিগোরির পুরসভা মালবাজারে ১৫টি প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসায় শোরগোল পড়েছে। পুরসভার আধিকারিকরাই জানাচ্ছেন, ইকো ট্যুরিজম সেন্টার, রোপওয়ে, অডিটোরিয়াম, সুইমিং পুল, ইন্ডোর স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য প্রয়োজন যে বিশাল পরিমাণ জমি প্রয়োজন সেই জমি মাল পুরসভার হাতে নেই। জেলা পরিষদের জমি, চা বাগান, রেল এবং সেনাবাহিনীর জমি দিয়ে ঘেরা এই শহর। সেখানে শহরের এলাকার বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হবে পুর প্রশাসনকে। ফলে এই সমস্ত প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
পুরসভার তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমান চেয়ারম্যান উৎপল ভাদুড়ি বলেছেন, ‘এমন চুক্তির কোনও আলোচনা বোর্ড মিটিংয়ে হয়নি। যা হয়েছিল সবটাই আমাদের অন্ধকারে রেখে।’
