নীতেশ বর্মন ও শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি: হিলকার্ট রোডের দু’পাশে বাঁশের ব্যারিকেড। কোথাও রাস্তার দুই দিকেই, কোথাও এক পাশ আটকে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার শিলিগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ মিছিল ঘিরে (Suvendu Adhikari Rally) গত শনিবার থেকেই প্রশাসন জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। বাঘা যতীন পার্ক থেকে হিলকার্ট রোড ধরে মহাত্মা গান্ধি মোড়, অর্থাৎ এয়ারভিউ মোড় পর্যন্ত মিছিল যাবে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই হিলকার্ট রোডের একাংশে যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তাতেই রাস্তার দু’পাশের ব্যবসায়ীরা কালীপুজোর আগে শেষমুহূর্তের বাজারে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না করলেও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, কালীপুজোর আগে শেষ কয়েকদিন বাজার কিছুটা জমেছে। শহরের ব্যস্ততম রাস্তা এভাবে ব্যারিকেডে আটকে গেলে দোকানে ক্রেতা আসবেন কীভাবে?
সোমবার কলকাতায় একই কর্মসূচিতে মিছিল করেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। দলীয় সূত্রে খবর, মঙ্গলবার শিলিগুড়ির মিছিলে শুভেন্দুর সঙ্গে থাকবেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, উত্তরবঙ্গের একাধিক মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতারা। মিছিলের নানা প্রান্তে ঢাকের বাদ্যের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী, নেপালি ও রাজবংশী সমাজের নৃত্যও দেখা যেতে পারে। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী বলেন, ‘গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য আমাদের লড়াই। মিছিলে মুখ্যমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, নেতারা হাঁটবেন। দলের তরফে নেতা, কর্মীদের আনা হচ্ছে। অনেকে নিজেদের ইচ্ছেতেও হাঁটবেন।’
প্রশাসন সূত্রে খবর, মিছিলের আগে উত্তরকন্যায় বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে রাজবংশী সমাজের একাধিক সংগঠনের নেতারা থাকবেন। বৈঠক শেষে তিনি সরাসরি বাঘা যতীন পার্কে যাবেন। সেখান থেকে মিছিল শুরু হবে। মহাত্মা গান্ধি মোড়ে তৈরি মঞ্চে বক্তব্য রাখবেন মুখ্যমন্ত্রী। বাপি গোস্বামী স্বাগত ভাষণ দেবেন। শেষে শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি অরুণ মণ্ডলের সমাপ্তি ভাষণে কর্মসূচি শেষ হবে।
তবে উত্তরকন্যায় বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্য রিচা ঘোষ এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা মাখনলাল সরকারের বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রী যেতে পারেন বলেও খবর। এদিন দুটি বাড়িতেই পুলিশ গিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টি খতিয়ে দেখে।
শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি জেলার নেতা-কর্মীদের মিছিলে আনার নির্দেশ দিয়েছে দল। তবে পর্যাপ্ত বাস না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে, অন্নপূর্ণা যোজনা সহ সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপকদের মিছিলে নিয়ে আসার তদারকি করতে দেখা গিয়েছে বিজেপি নেতাদের একাংশকে।
মুখ্যমন্ত্রীর কর্মসূচি ঘিরে শহরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, মিছিলের দুই ঘণ্টা আগে বাঘা যতীন পার্ক থেকে এয়ারভিউ মোড় পর্যন্ত বিধিনিষেধ জারি হবে। মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাঘা যতীন পার্ক, বাগডোগরা বিমানবন্দর ও উত্তরকন্যার পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন ৩০০ পুলিশকর্মী। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের পাশাপাশি সংলগ্ন জেলা থেকেও পুলিশ আনা হচ্ছে। রিচা ঘোষ ও মাখনলাল সরকারের বাড়ির সামনেও পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
সোমবার সকাল থেকে দুটি বাড়ি, বাঘা যতীন পার্ক ও এয়ারভিউ মোড় পরিদর্শন করেন পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এডিজি তথা ডিরেক্টর সিকিউরিটি মনোজ ভার্মা। নিরাপত্তা নিয়ে সন্ধ্যায় দফায় দফায় বৈঠক হয়। বাঘা যতীন পার্কে পদযাত্রা শুরুর আগে নামানো হবে পুলিশ কুকুর। মিছিল চলাকালীন ছাদ থেকে নজরদারি চালানো হবে। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট সহ কমিশনারেটের বিভিন্ন শাখাকেও বিশেষভাবে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
এদিকে, ব্যবসায়ীদের ভোগান্তির আশঙ্কা প্রসঙ্গে হিলকার্ট রোড ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সনৎ ভৌমিক বলেন, ‘এটা নতুন নয়। প্রত্যেক মুখ্যমন্ত্রী কিংবা বড় নেতাদের মিছিলে কয়েকদিন ধরে হিলকার্ট রোডের ওপর নানা কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে। আমাদের কিছু বলার নেই।’ কোর্ট মোড় এলাকার এক চায়ের দোকানদার বললেন, ‘দোকান করেই সংসার চলে। দিনের বিক্রি মাটি হবে। এমন ক্ষুদ্র স্বার্থগুলিতে কেউ কি আর নজর দিতে চান?’
অন্যদিকে, ভারী ও মাঝারি পণ্যের গাড়িগুলির ক্ষেত্রে সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শহরে ঢোকার ব্যাপারে বিধিনিষেধ জারি করা হয়। রেস্ট্রিকশন পয়েন্টগুলি হল- পরিবহণনগর মোড়, ফুলবাড়ি বাইপাস, ভক্তিনগর চেকপোস্ট, নেতাজি মোড়, সুকনা টিসিপি মোড়, রেগুলেটেড মার্কেট, খান্না হোটেল এবং পানিঘাটা মোড়। এছাড়াও পরিবহণনগর মোড় থেকে দার্জিলিং মোড় হয়ে হিলকার্ট রোড ও চেকপোস্টগামী সমস্ত ভারী ও মাঝারি পণ্যবাহী গাড়ির ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। ফুলবাড়ি থেকে নৌকাঘাট মোড় হয়ে ফাঁসিদেওয়া আন্ডারপাস পর্যন্তও বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভিনরাজ্য ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের বাস তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাস থেকে ইস্টার্ন বাইপাস হয়ে গোরা মোড় দিয়ে বেরোবে। এছাড়াও বিহার ও কলকাতাগামী বাস পরিবহণনগর থেকে পরিচালিত হবে। সিকিমের বাস এসএনটি-র পরিবর্তে পিসি মিত্তল বাস টার্মিনাস থেকে পরিচালিত হবে।

