ইটাহার: সকালে ভাত, ডাল কোনওমতে মুখে গুঁজে বানবোল হাইস্কুলের পথে পা বাড়িয়েছিলেন গ্রুপ ডি পদে কর্মরত বিশু সরেন। স্কুল গেটে ঢোকার মুখে মোবাইলে খবর আসতেই তাল কাটল তাঁর। মন খারাপ করে স্কুটি ঘুরিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে গেলেন তিনি। নিঝুম দুপুরে হঠাৎ বাবাকে বাড়ি ফিরে আসতে দেখে ছোট্ট বৃষ্টির যেন আনন্দ আর ধরে না। বছর তিনের বৃষ্টি দৌড়ে গিয়ে মা মিনতি হেমব্রমকে খবর দেয়, ‘মা, মা, বাবা আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। আজকে বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ খেলতে পারব।’ কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আদেশে সদ্য চাকরিহারা বিশুর মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হচ্ছে না। কান্না বুকে চেপে মেয়েকে কোলে তুলে তিনি খেলতে শুরু করলেন বাড়ির এক চিলতে উঠোনে। ওদিকে স্বামীর চাকরি খোয়ানোর খবর জানতে পেরে দরজা বন্ধ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিনতি। বৃহস্পতিবার এমনই করুণ দৃশ্যে বাতাস ভারী হল সদর ইটাহার থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে মহীনগর গ্রামের আদিবাসী পাড়ায়।
মহীনগরের আদিবাসী পাড়ায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অনেক কষ্টে ও বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পেটে কিছু বিদ্যা অর্জন করে গ্রুপ ডি-র চাকরিটা জুটিয়েছিলেন বিশু সরেন। বিঘা তিনেক জমি চাষ করে বিশুকে পড়াশোনা শিখিয়েছিলেন তাঁর বাবা ধেনা সরেন। পড়াশোনার খরচ জোগাতে কিছু জমি বিক্রিও করতে হয়েছিল তাঁকে। পড়াশোনা শেষে ২০১৪ সালে ইটাহার থানায় সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি পান বিশু। তারপর ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পান গ্রুপ ডি পদে। যোগ দেন বানবোল হাইস্কুলে। কিন্তু চাকরি পেয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠলেও সুখ স্থায়ী হয়নি তাঁর জীবনে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত ও মামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই অন্য অনেকের মতো বিশুরও প্রতিটি পল কেটেছে গভীর উদ্বেগে। ইতিমধ্যে পরপর দুই বছরের মধ্যেই মা ও বাবাকে হারান তিনি। ফলে ছেলের উপার্জনে দু’বেলা দুই মুঠো খাবার মুখে দিয়ে একটু সুখের জীবন যে কাটাবেন, সেই সুযোগ হয়নি তাঁর মা-বাবারও। এখন সর্বস্ব হারিয়ে বিশুর সম্বল শুধু স্ত্রী, একরত্তি মেয়ে ও এক চিলতে জমি।
চাকরি যাওয়ার পর থেকেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আদিবাসী তরুণ। কীভাবে চলবে জীবন? কীভাবে মানুষ করবেন মেয়েকে? এদিন বাড়ির বদ্ধ ঘরে বসে অসহায় বিশু বলেন, ‘আমার কপালে বুঝি সুখ লেখা নেই। চাকরিটা পেয়েছিলাম বলে মা-বাবার মুখে একটু হাসি ফুটেছিল। কিন্তু তাঁরাও বেশিদিন বাঁচলেন না। একুশে মা চলে গেল, বাইশে বাবা। আর পঁচিশে আমার চাকরিটাই চলে গেল। স্ত্রী ও ছোট্ট মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়? তবু আমাকে ওদের জন্য বাঁচতে হবে।’
তবে এতকিছুর পরেও আশার সব আলো নিভে যায়নি বিশুর মনে। আবারও ফিনিক্স পাখির মতোই বেঁচে উঠতে চান তিনি। ছোট্ট বৃষ্টির মুখের দিকে তাকিয়ে বিশু বলেন, ‘আবার পরীক্ষা হলে আমি আবারও পরীক্ষায় বসব। সব ঠিকঠাক থাকলে আবারও পরীক্ষায় পাশ করে ওই বানবোল হাইস্কুলেই চাকরিতে জয়েন করব।’
কথা বলতে বলতেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন বিশু। বাড়ির পাশেই বাবার রেখে যাওয়া ১০ কাঠা জমির দিকে তাকান। জমিতে ভুট্টার গাছগুলো বেশ সবুজ সতেজ হয়ে উঠেছে। এই জমিটুকুই তো এখন উপার্জনের একমাত্র সম্বল। বুকে চাকরি হারানোর কষ্ট মোচড় দিলেও চোয়াল শক্ত হয় বিশুর। দৃপ্ত চোখে ভেসে ওঠে নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ের প্রস্তুতি।
