জয় মণ্ডল, নিউ জার্সি: নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের উৎসব তখন সবে শুরু হয়েছে। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার উল্লাসে মেতে উঠেছেন স্প্যানিশ ফুটবলাররা। কিন্তু মাঠের ওই ১২০ মিনিটের ফুটবল ছাপিয়ে ডাগআউটের দিকে তাকালে একটা অদ্ভুত সমীকরণ চোখে পড়বে। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে (Luis de la Fuente) এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনির (Lionel Scaloni) এই লড়াইটা ছিল আসলে এক গুরু-শিষ্যের লড়াই। স্কালোনি আর্জেন্টিনার মানুষ হলেও তাঁর কোচিংয়ের হাতেখড়ি কিন্তু স্পেনে। সেখানে উয়েফা প্রো লাইসেন্স করার সময় স্কালোনির অন্যতম প্রশিক্ষক ছিলেন এই দে লা ফুয়েন্তেই। শেষ পর্যন্ত গুরুর কাছেই হার মানতে হল শিষ্যকে। আর সেই সঙ্গেই গোটা বিশ্বকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল, ফুটবলের আসল রিমোট কন্ট্রোলটা এখন কাদের হাতে।
এই রিমোট কন্ট্রোলটা হল স্পেনের কোচিং সিস্টেম। যার বীজ পোঁতা হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। নেপথ্যে ছিলেন এক ডাচ কিংবদন্তি-জোহান ক্রুয়েফ। তিনি একটা কথা খুব বিশ্বাস করতেন, দলের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হলেন একজন কোচ। বিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় স্পেন ফুটবলে সেভাবে দাগ কাটতে পারেনি। প্রচুর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বারবার বড় আসরে তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। ক্রুয়েফ এসে স্প্যানিশ ফুটবলের গোড়ার গলদটা ধরে ফেললেন এবং মূল প্রশ্নটাই বদলে দিলেন। আগে অ্যাকাডেমিগুলোতে মাপা হত, ‘ছেলেটা কতটা জোরে দৌড়তে পারে?’ ক্রুয়েফ জানতে চাইলেন, ‘ছেলেটা কি মাঠে দাঁড়িয়ে ভাবতে পারে?’ খেলোয়াড়দের শুধু কোথায় দাঁড়াতে হবে তা নয়, কেন দাঁড়াতে হবে, সেই অঙ্কটা শেখাল স্প্যানিশ ফুটবল।
আজকের বিশ্বজয়ী দলটা সেই ভাবনারই ফসল। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগের দিকে তাকালে দেখবেন, প্রায় কুড়ি শতাংশ কোচ আজ স্প্যানিশ। মাইকেল আর্তেতা, লুইস এনরিকে থেকে শুরু করে উনাই এমেরি-চারিদিকে শুধু স্প্যানিশ কোচদের দাপট। ভারতের আইএসএলেও অর্ধেকের বেশি ট্রফি জিতেছে স্প্যানিশ কোচরা (Spanish Coac)। মরক্কো থেকে শুরু করে আফ্রিকার দলগুলোও আজ স্প্যানিশ ঘরানায় প্রভাবিত হয়ে নিজেদের কৌশল সাজাচ্ছে।
আর এই কোচিং বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সঙ্গী হল স্প্যানিশ লিগ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো কাড়ি কাড়ি টাকা উড়িয়ে বাইরের দেশ থেকে তৈরি ফুটবলার কিনে আনার সুযোগ স্পেনের ক্লাবগুলোর নেই। লা লিগার কড়া আর্থিক নিয়মের কারণে তাদের বাধ্য হয়ে নিজেদের অ্যাকাডেমির দিকে নজর দিতে হয়। শুধু বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদ নয়, স্পেনের ছোট ছোট ক্লাবগুলোও আজ ফুটবলার তৈরির এক একটা আধুনিক কারখানা। সেখানে সবাই একই ফুটবল ভাষায় কথা বলে। ১৩ বছরের লিওনেল মেসিকে (Lionel Messi) এই স্প্যানিশ অ্যাকাডেমিই ঘষেমেজে তৈরি করেছিল। আজ ১৯ বছরের লামিনে ইয়ামালও সেই একই পরিকাঠামোর ফসল।
ফাইনালে দুই দল মিলিয়ে লা লিগার ২৪ জন ফুটবলারের উপস্থিতিই বুঝিয়ে দিয়েছে, ক্লাব ফুটবলের লড়াইয়ে স্পেন কতটা এগিয়ে। মেটলাইফের সবুজ ঘাসে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের এই ট্রফি জয় কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটা দশকের পর দশক ধরে তৈরি করা একটা নিখুঁত ক্লাসরুম প্রোজেক্টের চূড়ান্ত সাফল্য। ট্রফিটা আজ মাদ্রিদে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, স্প্যানিশ কোচিং দর্শন বিশ্ব ফুটবলকে আজ বুঝিয়ে দিল- শুধু গায়ের জোর নয়, ফুটবল খেলাটা আদতে মাথার।

