প্রিয়দর্শিনী বিশ্বাস, শিলিগুড়ি: গেরুয়া রঙের একটি ফর্ম। সেখানে মোদির ছবি ছাপানো। বড় হরফে লেখা ‘৩০০০’, তার সঙ্গেই ছোট হরফে লেখা ‘আর্থিক সহায়তা প্রতি মাসে প্রত্যেক মহিলাকে’। নীচে পাঁচটি তথ্য লেখার জন্য শূন্যস্থান। ফর্ম সংখ্যা, তারিখ, নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা।
বিধানসভা ভোটের আগে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি, শিলিগুড়ি (Siliguri) মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকায় ফর্মটি বিলি করা হয়েছিল। অভিযোগ, স্থানীয় বিজেপি নেতা থেকে জনপ্রতিনিধিদের একাংশ দাবি করেছিলেন, ওই কার্ডটি পূরণ করলেই হবে। ভাতা নিয়ে ঝক্কি পোহাতে হবে না আর। এমনকি কিছু কিছু জায়গায় ব্যাংকের পাসবুকের ফোটোকপি সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফর্ম বিলিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ডাবগ্রাম-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম হাতিয়াডাঙ্গা। হাতাহাতি হয় দু’পক্ষের মধ্যে। তৃণমূল-বিজেপি উভয়দল আশিঘর ফাঁড়িতে গিয়ে স্লোগান-পালটা স্লোগান শুরু করে।
হাতিয়াডাঙ্গার স্বপ্না বর্মন থেকে ফকদইবাড়ির শিখা রায়রা ভরসা করেছিলেন। তাতে বড় ধাক্কা লেগেছে বুধবার সন্ধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের (Annapurna Bhandar) ভাতা পেতে হলে সবাইকে সরকার থেকে প্রকাশিত ফর্মটি পূরণ করতে হবে। তথ্য যাচাইয়ের পর অ্যাকাউন্টে ঢোকানো হবে টাকা। টিভির পর্দায় এই কথা শুনে মাথায় হাত পড়ে শিলিগুড়ির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের মল্লিকা ঘোষদের (নাম পরিবর্তিত)। তাঁরা বেজায় ক্ষিপ্ত পদ্ম শিবিরের স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর। ডিবিটি লিংকের জন্য একবার লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, ফের ভিড় ঠেলে ফর্ম পূরণ করতে হবে ভেবে হতাশার সুর শোনা গেল।
স্বপ্না বলছিলেন, ‘তখন যা চাইল দিলাম, যা বলল করলাম। ভোটে জিতে সরকার গড়ল বিজেপি (BJP)। এখন বলল, নতুন করে আবার ফর্ম ফিলআপ করতে হবে। কিছুদিন আগেই তো আধার-ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংযোগ করাতে লাইনে দাঁড়ালাম। আবার!!’
বিজেপিকে কটাক্ষ করছেন বিরোধীরা। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির পদ্ম বিধায়ক অবশ্য যুক্তি দিচ্ছেন, ওটা আদতে ফর্মই ছিল না, প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল স্রেফ।
অন ও অফলাইনে আর ক’দিন বাদেই শুরু হবে ফর্ম পূরণের প্রক্রিয়া। বাংলায় ১৩ পাতার ফর্মে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, বার্ষিক আয়, জমির তথ্য ইত্যাদি নানা বিষয় জানাতে হবে। তাড়াতাড়ি ফর্ম পূরণ করলে দ্রুত আর্থিক সুবিধা মিলবে, এই আশায় বৃহস্পতিবার থেকেই শহর শিলিগুড়ির ক্যাফে, ফোটোকপির দোকানগুলিতে উৎসুকদের ভিড় জমতে শুরু করে। কোথাও ৪০ টাকা, কোথাও ৫৫, আবার কোথাও ৭০ টাকা দিয়ে বিক্রি হয়েছে সেসব। আগামীতে চাহিদা আরও বাড়বে, তাই আগাম প্রিন্ট করে মজুত রাখতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।
’২৬-এর নির্বাচনের আগে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম’ বলেই শহর আর গ্রামাঞ্চলে বিলি করেছিলেন পদ্ম নেতা-কর্মীদের একাংশ। ব্যক্তিগত কিছু তথ্য লিখিয়ে কাউন্টার পার্টটি ছিড়ে নিজের কাছে রেখে দিচ্ছিলেন তাঁরা। অনেকেই কাউন্টার পার্টের সঙ্গে আধার কার্ড ও ব্যাংকের পাসবইয়ের ফোটোকপি জমা দিয়েছিলেন। পূরণ করানোর সময় এমনও আশ্বাস মিলেছিল যে, ‘বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর ভিত্তিতে প্রতি মাসে তাদের অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে ৩০০০ টাকা।’ সরকার এল বটে, তবে কথা রাখা হল না। স্বাভাবিকভাবেই আশাভঙ্গ হতে হল তরুণী-মহিলাদের।
ফকদইবাড়ির শিখার কথায়, ‘এমন তো কথা ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেওয়া ফর্ম পূরণ করে ভেবেছিলাম, কাজ বুঝি হয়েই গেল। এখন প্রথম থেকে সব শুরু করতে হবে। টাকার জন্য এছাড়া উপায়ও নেই আমাদের।’
৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের সেই মহিলার দাবি, তাঁর বাড়িতে এসে ফর্মপূরণ করিয়ে কাউন্টার পার্ট নিয়ে গিয়েছিলেন বিজেপির স্থানীয় নেতা-নেত্রীরা। পশ্চিম হাতিয়াডাঙ্গার পদ্ম শিবিরের পঞ্চায়েত সদস্য দিলীপ রায়ের বাড়িতে তাঁর কার্যালয় থেকে ফর্ম বিলি করছিলেন। নেওয়া হয় অন্য নথিপত্রের ফোটোকপিও। সেই দিলীপ এদিন সুর বদলে দাবি করলেন, ‘যেটা তখন বিলি করা হয়েছিল, সেটা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম ছিল না। ছিল মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড। আমি শুধু নাম-ফোন নম্বর জমা নিয়েছি, যেন পরবর্তীতে প্রকল্পের ব্যাপারে বিস্তারিত তাঁদের ফোনে জানাতে পারি।’ বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায়েরও বক্তব্য, ‘প্রচারে ওটা ব্যবহার করা হয়েছিল। ফর্ম ছিল না।’
তৃণমূল কংগ্রেসের ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি ব্লক সভাপতি দিলীপ রায়ের খোঁচা, ‘বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ওই কার্ড দিয়ে বলা হল, এটাই ফর্ম। পূরণ করলে ভাণ্ডারের টাকা মিলবে। নতুন সরকার গঠন হল, এখন নয়া নিয়ম চালু হল। বহু নাম বাদ যাবে বলেও শুনেছি। মানুষ সবকিছু দেখছে। সমাজমাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ভুল কিছু হলে পুরনিগম, পঞ্চায়েত ভোটে জনতা জবাব দেবেন।’
এপ্রসঙ্গে পুরনিগমের মেয়র গৌতম দেব অবশ্য কৌশলী জবাব দিলেন, ‘একটু অপেক্ষা করতে হবে। কিছু দেখার বিষয় রয়েছে।’
